রামরাজ্যে সীতার শেষ-সম্মানটুকুও রইলো কই?
|
—- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ—-
লেখক নিজস্ব মতামত এর জন্য দায়ী নয় সম্পাদকমন্ডলী
Y ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পান না, দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দের প্রাইম ফোকাস পান না, মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার জগতের লাইমলাইট পান না, হতদরিদ্র দেহাতি, দলিত পরিবারের এক মা হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মিডিয়াকে বলছে, “আমার মেয়েটাকে জ্বালিয়ে দিলো এভাবে। এরকম অত্যাচার হলো বিটিয়ার সাথে, এতো কষ্ট পেয়ে মারা গেল মেয়েটা, শেষবার দেখতেও দিলো না। আমার বিটিয়া আমার পাশে শুতো, রোজ গল্প করাম। অন্তত একটু সাজিয়ে গুছিয়ে মেয়েটাকে বিদায় করতে পারতাম। নতুন একটা কাপড় গায়ে মুড়িয়ে দিতে পারতাম। আমাদের হলুদ, ঘি লাগিয়ে বিদায় করার রীতি আছে। ওর বাবা মুখাগ্নি অবধি করতে পারলো না মেয়েটিকে।”
এই বয়ান যারা শুনেছে তাদের গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসার চেয়েও বেশী রাগ হবে। দারুণ ভয়াবহ রাগ। উথাল-পাতাল রাগ। দেবাদিদেব মহাদেবের রুদ্রমূর্তি যেমন।নির্যাতিতাকে উদ্ধার করে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়, তাঁর দুই পা এবং একটি হাত অসাড় ছিল। মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শিরদাঁড়া এবং ঘাড়। আমরা কী রেখে যাচ্ছি আমাদের চারপাশে? এই রামরাজত্ব আমরা চাইছি?
উত্তর প্রদেশকে বলা হয় মর্যাদা পুরুষোত্তম সিয়াপতি শ্রীরাম চন্দ্রের পবিত্রভূমি। তাকে ঘরে ফিরিয়ে দিতে আসমুদ্রহিমাচল এক করে দিলাম আমরা কিন্তু যুদ্ধ শেষে নিজেদের বিটিয়াদের জন্য কী রেখে গেলাম? ঝোপের মধ্য পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত একটা দেহ, কাটা জিব, অমানবিক যন্ত্রনা সহ্য করে শেষে মৃত্যু, রাতের অন্ধকারে তড়িঘড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া কাঠ, পেট্রোল ঢেলে।
হ্যাঁ পেট্রোল, কাঠ, রাবার সহ যা পাওয়া গেছে হাতের কাছে তা ঢেলে দাহ করা হয় বিটিয়াকে। রাত দু’টোর সময় পরিবারের অনুমতি ছাড়া পুলিশ দেহ নিয়ে দাহ করে দিলো। ঘিয়ের জায়গায় পেট্রোল ঢেলে কাজ শেষ করা হলো। হিন্দু রীতিমতো আজও এই গ্রামে সূর্যাস্তের পরে দাহ করা হয়না। কিচ্ছু মানা হলো না। কেন? দলিত বলে কী মৃত্যুকালীন সম্মানটুকুও ভারতে প্রাপ্য নয়?
শুনুন যোগীপুরুষ, মনে করিয়ে দিই ফের। আরএসএস এর একাধিক পাঠ্যে উল্লেখ আছে, রামায়ণ এবং রামচরিত মানসে বর্ণিত হনুমান, সুগ্রীব ও জাম্বুবান ছিলেন বনবাসী ও বঞ্চিত। দলিতদের সাথে একাধিকবার মিল তুলে ধরেছেন আপনারা ভোট কুড়োতে৷ এবার দলিতদের বাঁচান। আমাদের ভারতবর্ষকে আমরা মাতৃরূপে পূজা করি। প্রত্যেকবার ভারত কি বিটিয়াদের এভাবে চলে যাওয়া ভারতমাতাকে ক্ষতবিক্ষত করা।
প্রথমে ধর্ষকদের হাতে, তারপর প্রশাসনের হাতে শেষে পুলিশের হাতে নিগৃহীত হলেন সীতামা আমাদের দেশের। রামরাজ্যে সীতার শেষ-সম্মানটুকুও রইলো কই? কবে মানসিকতা বদলাবো? কবে ঠাকুরেরা ভাবা বন্ধ করবে যে গোটা রাজ্যটা তাদের জমিদারি নয়? কবে দলিত আর মহাদলিতদের নূন্যতম সম্মানটুকু দিতে পারবো আমরা? কবে রামচন্দ্রজীর রামরাজত্ব সত্যি প্রতিষ্ঠা হবে? কবে আমরা সত্যি নিজের মনের রাবণকে মেরে রাম প্রতিষ্ঠা করবো? X Y Z ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ফিরাপত্তা না, স্রেফ সামান্য সম্মানটুকু, সামান্য মৃত্যুকালীন অধিকার, অভিযোগ দায়ের করা, একটু সহানুভূতিশীল হওয়া। রক্তাক্ত অবস্থায় বিনা কাপড়ে একটা মেয়ে পরে ছিল ঝোপে, পুলিশ প্রাথমিক মেডিকেল টেস্টের পরে রেপের অভিযোগটুকু দায়ের করেনি, কারণ মেয়েটি নিজে বলেনি। জিব কাটা অবস্থায় একটি মেয়ে কিভাবে কথা বলবে তৎক্ষনাৎ আপনিই বলুন প্রভু। অগ্নিপরীক্ষা নিচ্ছেন বিটিয়াদের। বারবার। মেয়েদের মাংসপোড়া গন্ধ পাচ্ছে না রাষ্ট্র? একবারও রাষ্ট্র প্রশ্ন করবেনা? জ্বল ক্যা রাহা হে?
©



