মতামত

আজ ভারতবর্ষে ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবসে স্মরণীয় নাম নেতাজি

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

আজ ১৫ ই আগস্ট ভারতবর্ষের ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে দেশজুড়ে।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারত বর্ষ স্বাধীন ও গণতন্ত্র দেশ মর্যাদা পেয়েছে ।তবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৫ ই আগস্ট আমরা পালিত করি কেন? সে নিয়ে নানান ইতিহাস কথা আজ আমি আমার কলমে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ভারতীয় নেতাজির মতন বীর সৈনিক সহিংস আন্দোলনের পথে হেঁটেই সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। স্বাধীনতার আগের মুহূর্তে ব্রিটিশরা শেষ কামড়টি দেয়। ধর্মের ভিত্তিতে সুবিশাল ভারতবর্ষকে ভেঙে দুই ভাগ করে দেয়। তার ফলাফলে গড়ে উঠল ভারত ও পাকিস্তান। দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান। ১ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুহারা হন। তবে এই সংগ্রামের ইতিহাস ভারতের সাক্ষী বহন করে চলেছে। তবে ৭৪ বছর স্বাধীনতা তীরে এসো এখনো আমার নিজের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যি ভারতবর্ষের স্বাধীন নাগরিক।যদি তাই হয়ে থাকতো, তাহলে আমাদের বাকস্বাধীনতা ও লেখার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে কেন?এ প্রশ্নের দিকে তাকালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যেন আজও পূর্ণতা পায়নি বলে মনে করেন অনেকেই! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই ভাবনাটি কোনমতে শোভা পায় না। ইতিহাস বলছে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৫ অগস্ট তারিখটি ভারতে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে অহিংস, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন এবং বিভিন্ন চরমপন্থী গুপ্ত রাজনৈতিক সমিতির সহিংস আন্দোলনের পথে পরিচালিত এক দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। স্বাধীনতার ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হয় এবং তার ফলে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম ঘটে। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণের পর দিল্লির লাল কেল্লার লাহোরি গেটের উপর ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই থেকেই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ৭৩ পেরিয়ে ৭৪-এ পা ভারতীয় স্বাধীনতার। মধ্য রাতের উদযাপনে ঘন নীল আকাশে জ্বলজ্বল করবে তেরঙ্গা। গেরুয়া, সাদা আর সবুজের এক চাঁদোয়ায় ঢাকবে ১৩০ কোটি মানুষ। আর এভাবেই ‘কিশোর’ ভারত একটু করে করে ‘যৌবনে’ উন্নীত করবে নিজেকে। ১৫ অগস্ট, ‘দেশ’ ভারতের বয়স হবে ৭৪। ‘এক মায়ের পেটের ভাই’ প্রতিবেশী পাকিস্তান অবশ্য একদিন আগেই, ১৪ অগস্ট নিজের ৭৩ ৩৪ জন্মদিন পালন করে ফেলেছে। যদিও পাক দেশের প্রথম গভর্নর জেনারেল মঃ আলি জিন্না চেয়েছিলেন ১৫ অগস্টই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত হোক। এমনকি প্রথম বছর ভারত এবং পাকিস্তান দুই দেশই ১৫ অগস্টই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারতের একদিন আগেই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়, আর সেই থেকেই প্রত্যেক ১৪ অগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছে মালালার দেশ। উল্লেখ্য, ‘স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে’র হস্তান্তর হয়েছিল সেদিনই। আর ১৪ অগস্টই পাকিস্তানের করাচিতে প্রথম ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানের আয়োজনও হয়েছিল। এতো না হয় গেল পাকিস্তানের কথা। ভারত কেন ১৫ অগস্টই স্বাধীনতা পেল? উত্তরটা জানা আছে আপনার? এতদিন থাকতে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৫ অগস্টকে ভারতের স্বাধীনতার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কারণ, ওই দিনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। সালটা ছিল ১৯৪৫” (তথ্য সাহিত্যিক মণি শংকর মুখার্জি রচিত প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত)। ইতিহাস বলছে, লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে যখন ভারতের স্বাধীনতার দিন ঠিক করতে বলা হয় তখন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ঘরে বসে রেডিও মারফৎ শোনা জাপানের আত্মসমর্পণের দিনটার কথাই নাকি সবার প্রথম তাঁর মাথায় আসে। এরপর ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই, মাউন্টব্যাটেন ১৫ অগস্ট দিনটির কথা ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে পেশ করেন। সেখানে তিনি জানান, “ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দিন শেষ, ১৫ অগস্ট থেকে ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশেই শুরু হবে নতুন কর্তৃত্ব।ভারতবর্ষে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম যার জন্য তার কথা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। তবে আজকের এই লেখা টি নেতাজি কথা উল্লেখ না করলে আমার এই লেখাটি হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে জাবে পাঠকসমাজের কাছে।প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীন ছিল আমাদের ভারতবর্ষ। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন, কারাবন্দি হয়েছেন, আরও অনেকরকম নির্যাতন-অত্যাচারের শিকার হয়েছেন বহু মানুষ। তবুও নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে অত্যাচারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছেন, অবলীলায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু  ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নেতৃস্থানীয় লড়াকু বীর। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায়  চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন, কিন্তু সরকারের উচু পদের মোহ তাঁকে কখনই আকর্ষণ করেনি। দেশের মুক্তিই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। ভারতকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন, তাবড় রাষ্ট্রনেতাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন, সশস্ত্র সেনাবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছেন ব্রিটিশ শক্তিকে। এই নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্মিলনের ব্যাপারেও ছিলেন দুর্দমনীয়। নিজে হাতেকলমে তিনি এই মহান আদর্শের সফল প্রয়োগ করেছেন। সেই সমকালীন বাংলায় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ১৯২৪ সালে দেশবন্ধু যখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র নির্বাচিত হন, তখন সুভাষচন্দ্র তাঁর অধীনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯২৫ সালে অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে তাঁকেও বন্দী করা হয় এবং মান্দালয়ে নির্বাসিত করা হয়। সেখানে তিনি যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি কলকাতা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হোন। ইতোপূর্বে ১৯২৮ সালেই ব্রিটিশদের হতভম্ব করে দিয়ে তিনি প্রায় দু হাজার কর্মীদের সেনা পোশাকে কলকাতার রাস্তায় মার্চ করিয়েছিলেন!রাজনৈতিক জীবনের আড়াই দশকের মধ্যে নেতাজি মোট ১১ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁকে ভারত ও রেঙ্গুনের বিভিন্ন জায়গায় বন্দী রাখা হয়েছিল। ১৯৩১-৩২ সালে তাঁকে ইউরোপে নির্বাসিত করা হয়।
১৯৩৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য ত্রিপুরা সেশনে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে নেতাজির বিপক্ষে গিয়ে পট্টভি সিতারামায়াকে সমর্থন দেন মহাত্মা গান্ধি। নির্বাচনের ফলাফল শোনার পর গান্ধিজি বলেছিলেন ‘পট্টভির হার আমার হার।’ কিন্তু জয়যুক্ত হলেও নেতাজী সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারছিলেন না। বিরোধীতার একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক (All India Forward Block) গঠন করেন।১৯৩৮ সালে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদের প্রস্তাবনা দেন। ব্রিটিশরা কবে ভারতীয়দের স্বাধীনতার অনুমোদন দেবে তার জন্য বসে না থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুবিধা নেওয়া উচিত বলে প্রস্তাব দেন নেতাজি। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নির্ভর করে অন্য দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের উপর। তাই তিনি ভারতের জন্য একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেন।তবে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের ব্রিটিশদের পক্ষে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নেতাজী নাখোশ ছিলেন। তিনি সে সময় গৃহবন্দি ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ব্রিটিশরা তাঁকে যুদ্ধ শেষের আগে ছাড়বে না। তাই তিনি দুইটি মামলার ফায়সালা বাকি থাকতেই আফগানিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানি পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং ব্রিটিশদের অন্ধকারে রেখেই তিনি পালাতে সক্ষম হোন। কিন্তু আফগানিস্তানের পশতু ভাষা না জানা থাকায় তিনি ফরওয়ার্ড ব্লকের উত্তর-পশ্চিম সিমান্ত প্রদেশের নেতা মিয়া আকবর শাহকে তাঁর সাথে নেন। যেহেতু তিনি পশতু ভাষা জানতেন না, তাই তাঁর ভয় ছিল, আফগানিস্তানবাসীরা তাকে ব্রিটিশ চর ভাবতে পারে। তাই মিয়া আকবর শাহের পরামর্শে তিনি অধিবাসীদের কাছে নিজেকে একজন কালা ও বোবা বলে পরিচিত করেন। সেখান থেকে সুভাষ বসু “কাউন্ট অরল্যান্ডো মাজ্জোট্টা” নামক একজন ইতালির নাগরিকের পরিচয়ে মস্কো গমন করেন। মস্কো থেকে রোম হয়ে তিনি জার্মানি পৌঁছান। তিনি বার্লিনে মুক্ত ভারতীয় কেন্দ্র (Free India Center) গড়ে তোলেন। আর যাই হোক ভারতের স্বাধীনতার জন্য তিনি জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। হিটলারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে হিটলারের উদাসিনতা তাঁকে হতাশ করে। ফলে ১৯৪৩ সালে সুভাষ বসু জার্মান ত্যাগ করেন। হিটলারের তরফে উপহার পাওয়া একটি জার্মান সাবমেরিন তাঁকে সমুদ্রের তলদেশে অন্য একটি জাপানি সাবমেরিনে পৌঁছিয়ে দেয়। সেখান থেকে তিনি জাপান পৌঁছান।জাপানের কাছে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভারতীয় বন্দী সেনাদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবি করেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সংগ্রামে জাপান সরকারের সহযোগীতা কামনা করেন। জাপান তাঁর আর্জিতে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়। ভারতীয় বন্দী সৈনিকদের সঙ্গে করে তিনি সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজ এর পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। এটিই পরবর্তী সময়ে বর্তমান ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী। সেই থেকে
ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (INA-Indian National Army) মূলত গড়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী নেতা রাসবিহারি বসুর হাতে। ১৯৪৩ সালে রাসবিহারি বসু এই সেনাবাহিনীর দ্বায়িত্ব সুভাষ চন্দ্র বসুকে হস্তান্তর করেন। একটি আলাদা নারী বাহিনী (রানি লক্ষীবাঈ কমব্যাট) সহ এতে প্রায় ৮৫,০০০ হাজার সৈন্য ছিল। এই বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল প্রাদেশিক সরকারের হাতে, যার নাম দেওয়া হয় ‘মুক্ত ভারতের প্রাদেশিক সরকার’ (আরজি হুকুমাত-ই-আজাদ হিন্দ)। এই সরকারের নিজস্ব মুদ্রা, আদালত ও আইন ছিল। অক্ষ শক্তির ১১টি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দান করে। আই.এনএ’র সৈন্যরা জাপানিজদের আরাকান ও মেইক্টিলার যুদ্ধে সাহায্য করে।তবে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আশা করেছিলেন, ব্রিটিশদের উপর আই.এন.এ.’র হামলার খবর শুনে বিপুল সংখ্যাক সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে মুখ ফিরিয়ে আই.এন.এ.-তে যোগ দেবে। কিন্তু এই ব্যাপারটি তেমন ব্যাপকভাবে ঘটার আগেই বিপরীত দিক থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে জাপান তার সৈন্যদের আই.এন.এ. থেকে সরিয়ে নিতে থাকে। একই সময় জাপান থেকে অর্থের সরবরাহ কমে যায়। অবশেষে, ব্রিটিশদের কাছে জাপান আত্মসমর্পণ করলে আই.এন.এ. ও আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সৈন্যরা নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগীতার ডাক দিলে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগে বাধ্য হয়।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মি. এটলি, যিনি মূলত ভারতীয় স্বাধীনতা আইনে সই করেছিলেন, তাঁর উক্তিটি বেশ বিখ্যাত। তিনি তাঁর ভারত সফরের সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের জয়লাভের পরও ভারত ত্যাগের কারণ জানতে চেয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করেছিলো শুধুমাত্র তিনটি কারণে। প্রথম, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, দ্বিতীয়, আইএনএ, তৃতীয়, নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত ভারতীয় সৈনিকদের ৪৬ সালের নৌ বিদ্রোহ।”আজ এই কথা লিখতে বসে মনে পড়ে যাচ্ছে শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা লেখলে আজ যেন লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়ে তাসের দেশ নৃত্যনাট্যটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। উৎসর্গপত্রে কবিগুরু লিখেছেন- ‘স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।’
আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযানে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও সুভাষচন্দ্রের শৌর্য ও আপোষহীন রণনীতি ভারতকে স্বাধীনার লাভের অভীষ্ট লক্ষে পৌছে দেয়। নেতাজির জন্মদিন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। স্বাধীনতার পর কলকাতার একাধিক রাস্তা তাঁর নামে নামাঙ্কিত করা হয়।তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষের মাটিতে মহান নেতার কথা আজ আমাদের অনেকেরই মনে পড়ে। সেই কারণে
নেতাজির সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” (হিন্দিতে, তুম মুঝে খুন দো, ম্যায় তুমহে আজাদি দুঙা)। ৪ জুলাই ১৯৪৪ সালে বার্মাতে এক র‌্যালিতে তিনি এই উক্তি করেন। তাঁর আর একটি বিখ্যাত উক্তি হল ‘ভারতের জয়’ (‘জয় হিন্দ’)। উক্তিটি পরবর্তিতে ভারত সরকার গ্রহণ করে নেয়। বর্তমানে এটি ভারতের জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।নেতাজি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং নায়ক। তিনি হিন্দু-মুসলিম-খৃষ্টান-শিখ-বৌদ্ধ সকল জাত-পাতের উর্ধ্বে গিয়ে নিজেকে ভারতীয় বলে সম্বোধিত করতেন এবং তাঁর নেতৃত্বে অভূতপূর্ব গণজাগরন ও সম্প্রীতির জোয়ার উঠেছিলো! তিনি সারা ভারতবাসীকে এক মঞ্চে আনতে চেয়েছিলেন এবং আজও তাঁর নামে উদ্বেলিত হয় লাখো-কোটি ভক্ত প্রাণ!ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নেতাজি অনেকটা বিস্মৃত হতে চললেও তাঁর অবদান কোনোদিনও অম্লান হবার নয় এবং সরকারীভাবে ভারতের পাশাপাশি নানা সংগঠনের উদ্যোগে বর্তমানে বাংলাদেশেও নেতাজিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাঁর অবদানকে প্রচার করা হয়! নেতাজি অবিভক্ত ভারতের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেতে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বীরদর্পে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতাজির আদর্শ অবশ্যই অনুসরণীয়!

Related Articles

Back to top button