বিয়ের মরশুমে বিলাস নয়, প্রয়োজন সচেতনতা — ‘প্রিম্যারেজ হেল্থ স্ক্রিনিং’ এখন সময়ের দাবি
সুখী দাম্পত্য শুধু ভালোবাসা নয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।

✍️ ডাঃ সৌরভ ভক্ত: চারদিকে আলো, রঙ, সাজসজ্জা, মাঘ-ফাল্গুনের হাওয়ায় বিয়ের সানাই বাজছে চতুর্দিক জুড়ে। নতুন সম্পর্ক, নতুন স্বপ্ন, দু’টি পরিবারকে একসুতোয় বাঁধার এক অনন্য অধ্যায়। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই সমাজের চুপ থাকা একটা সত্য—বিয়ে মানে শুধু লাইট-সাউন্ড, সেলিব্রেটি সাজ বা ডেস্টিনেশন অনুষ্ঠান নয়; বিয়ে মানে দু’জন মানুষের সুস্থ ভবিষ্যতের শপথও।
আজকাল বিয়ের আয়োজন মানেই প্রতিযোগিতা—কে কার থেকে বড় মেনু দিচ্ছে, পাঁচতারা হোটেলের শেফ, আন্তর্জাতিক খাবার, সাবেক গয়না, ডিজাইনার পোশাক, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ঝকঝকে আয়োজন…। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়— বিয়ের আগে দু’জনের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
সমাজের ট্যাবু ভেঙে বাস্তবের সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন: ডিগ্রি, চাকরি, আয়, পরিবার দেখে বিয়ে তো হলো। কিন্তু একজনের লুকোনো অসুখ বা দেরিতে জানা জেনেটিক সমস্যার কারণে বহু দাম্পত্য ভেঙে যেতে দেখা গেছে। চিকিৎসা, মানসিক ক্লান্তি ও পরিবারে অশান্তিতে বছরের পর বছর ভুগেছেন অনেকে।
সত্য ঘটনা: কলকাতার রাজারহাটের মেঘা(ছদ্মনাম)–সৌরভের(ছদ্মনাম) ঘটনা তার প্রমাণ।
দু’জনের প্রেম, লুকিয়ে বিয়ে। দুই পরিবার শেষমেশ মেনে নেয়। কিন্তু সঙ্গলাভের কয়েক মাস পর থেকেই মেঘার শরীর ভেঙে পড়তে থাকে। পরে জানা যায়, সৌরভের আড়াল করা হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণ। দাম্পত্যের প্রথম বছরেই হাসপাতাল–ডাক্তারের দৌড়ঝাঁপ, সম্পর্কের ভাঙন, অপরাধবোধ—সবকিছু মিলিয়ে দমবন্ধ অবস্থা। পরীক্ষাটা যদি বিয়ের আগে দু’জনেই করতেন, তাহলে আজ তাঁদের জীবন অন্যরকম হতে পারত!

বিশ্বজুড়ে গবেষণা বলছে,
১) WHO–র মতে, প্রি-ম্যারিটাল STI স্ক্রিনিং করলে দাম্পত্যে যৌনজনিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি ৬০% কমে যায়।
২) থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার হওয়া দু’জন মানুষ যদি বিয়ে করেন, তাঁদের সন্তানের Major Thalassemia হওয়ার সম্ভাবনা ২৫%—আজীবন রক্ত বদলের উপর নির্ভর করতে হয়।
৩) ICMR-এর রিপোর্ট বলছে, ভারতে প্রতি ৬ দম্পতির একটি দম্পতি কোনো না কোনো ফার্টিলিটি সমস্যার মুখোমুখি হন, যার বড় অংশটাই ধরা পড়তে পারে আগেভাগে পরীক্ষা করলে।
৪) লুকোনো ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, ভিটামিন ডি–বি টুয়েলভ ঘাটতি—এসবই সরাসরি প্রভাব ফেলে গর্ভধারণ, মুড, আচরণ এবং দাম্পত্যের স্থিতিতে।
অর্থাৎ, বিয়ের সাজ যতই হোক, দেহ-মন অসুস্থ হলে সম্পর্ক টিকতে পারে না।
বিয়ের আগে যে পরীক্ষাগুলো করানো জরুরি:
১) Blood Group & Rh Typing
AB0 এবং Rh factor
বিশেষ করে কনে যদি Rh Negative হন, Rh incompatibility ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য বিপজ্জনক।
২) Complete Blood Count (CBC)
অ্যানিমিয়া, প্লেটলেট সমস্যা, সংক্রমণ প্রবণতা—সবই জানা যায়।
৩) Blood Sugar (FBS / PPBS / HbA1c)
লুকোনো ডায়াবেটিস থাকলে ভবিষ্যতের গর্ভধারণে ঝুঁকি বাড়ে।
৪) Thyroid Profile (TSH, FT4)
বিশেষভাবে মহিলাদের গর্ভধারণে থাইরয়েড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫) STI Screening
(HIV, HBsAg, Anti-HCV, VDRL, HSV)
এটি লজ্জার নয়, ভবিষ্যত সুরক্ষার প্রথম ধাপ।
৬) Thalassemia Screening
দু’জনেই ক্যারিয়ার হলে জটিলতা তৈরি হতে বাধ্য।
৭) Fertility-Related Tests
ছেলেদের: Semen Analysis
মেয়েদের: AMH, Pelvic Ultrasound
এই পরীক্ষা এড়ায় ভবিষ্যতের “কার দোষ?” প্রশ্ন তুলে সম্পর্কের ভাঙন।
৮) Vitamin D & B12
মুড, স্ট্যামিনা, ফার্টিলিটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।
৯) Mental Health Screening:
Anxiety, Depression, Personality Disorder দাম্পত্যে গভীর প্রভাব ফেলে।
সম্পর্ক মানেই শুধু শরীর নয়—মন, আবেগ, আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এই চেকআপগুলো জরুরি?
বিয়ে মানে শুধু অনুষ্ঠান নয়—দু’জনের ভবিষ্যতের ভিত্তি। দাম্পত্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাস, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্থিরতার উপর।আজকের মেডিক্যাল সায়েন্স অনেক ঝুঁকি আগেই জানিয়ে সতর্ক করতে পারে আমাদের। তাই বিয়ের প্রস্তুতি শুধু সেজেগুজে নয়—সুস্থতা নিয়েও।
একটি ছোট্ট পরীক্ষা মানে বড় বিপদ এড়ানোর সুযোগ।
‘Love is not blind anymore. Love means Responsibility.’
বড় আয়োজন, বড় খরচ—সবই থাকে চার দিনের কিন্তু সম্পর্ক থাকে সারাজীবন। তাই— “Your marriage is not just a ceremony, it’s a lifelong commitment. Prepare your health the way you prepare your hearts.”

যারা বিয়ে করবেন ভাবছেন কিন্তু আপাতত সম্পর্কে আছেন, তাঁদের জন্য বার্তা:
এই পরীক্ষাগুলো লজ্জার নয়। এটি পরিণত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। যারা একে অন্যকে ভালোবাসেন—আজ থেকেই একে অপরের সুস্থতার দায় নিন। যদি জন্যও যায় যে কারোর কোনো সমস্যা আছে। তাহলে এখন সেটা জেনে নিয়ে আগেভাগে চিকিৎসা করলে সমস্যার সমাধান হবে এবং সম্পর্ক টাও বাঁচবে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে যে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু আজকের একটা ভয় বা জরুরি একটা অবহেলা — বহুদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা সারা জীবন একসঙ্গে কাটানোর শপথকে তুরি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। এর চেয়ে সময় থাকতে সচেতনতা ভালো নয় কি?
একটা ছোট্ট পরীক্ষা আপনাদের ভবিষ্যতকে নিরাপদ, সুখী এবং শান্তিময় করতে পারে। সুস্থ দাম্পত্যই সুখী পরিবার। আর সুখী পরিবারই সমাজের ভিত্তি।


