জানা-অজানা
Trending

ক্রোশেতে গাঁথা বড়দিন: গোয়ায় ১৮ ফুটের হাতে বোনা ক্রিসমাস ট্রি

ক্রোশে ক্রিসমাস ট্রি মিউজিয়াম অব গোয়ায় প্রদর্শিত হবে ৯ নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

নিজস্ব প্রতিনিধি: গোয়ার বড়দিন মানেই আলো, গান, প্রার্থনা—আর এবার সেই উৎসবের রঙে যুক্ত হয়েছে এক অভিনব শিল্পকর্ম। সুতো আর সুঁইয়ের ছোঁয়ায় তৈরি ১৮ ফুট উঁচু একটি ক্রোশে করা ক্রিসমাস ট্রি এখন গোয়ার সংস্কৃতির নতুন পরিচয়। ২৫ জন নারী শিল্পীর যৌথ পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শিল্পকর্মটি দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে মিউজিয়াম অব গোয়া-তে।
এই অনন্য উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে গোয়া-ভিত্তিক ক্রোশে কালেক্টিভ—যার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রোশে শিল্পী শীনা পেরেইরা, শর্মিলা মজুমদার ও সোফি সিভারামন। ২০২৫ সালে গঠিত এই কালেক্টিভের প্রথম বড় ইনস্টলেশনটি স্থান পেয়েছে ‘Where We Gather’ প্রদর্শনীতে, যা মিউজিয়াম অব গোয়ার দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত Festivals of Goa-র অঙ্গ।

সুতোয় বাঁধা শান্তি, আশা আর ভালোবাসা
“ক্রোশেকে নিয়ে বহুদিন ধরেই একটি বড় ইনস্টলেশন করার ইচ্ছে ছিল,” বলছেন শীনা পেরেইরা। “ভাবলাম, সারা বছর ধরে কাজ করে এমন কিছু বানানো হোক, যা বছরের শেষে বড়দিনের বার্তাকে তুলে ধরবে—শান্তি, আশা, আনন্দ আর ভালোবাসা।” সেই ভাবনাতেই জন্ম নেয় এই বিশাল ক্রোশে ক্রিসমাস ট্রি।
মাত্র তিন মাসে, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হয়েছে এই শিল্পকর্ম। গোয়ার আর্দ্র আবহাওয়া ও বর্ষার কথা মাথায় রেখে ব্যবহার করা হয়েছে অ্যাক্রিলিক সুতো, যা সাধারণ উলের তুলনায় বেশি টেকসই। মোট ১,০০০টি ‘গ্র্যানি স্কোয়ার’—বৃত্ত থেকে শুরু হয়ে চৌকো আকারে শেষ হওয়া একটি জনপ্রিয় ক্রোশে নকশা—জুড়ে তৈরি হয়েছে এই বৃক্ষ।
গান, গল্প আর গ্র্যানি স্কোয়ার

শর্মিলা মজুমদারের বাড়িতেই বারবার জড়ো হয়েছেন শিল্পীরা। গান, নোনতা খাবার, মিষ্টি আর গল্পের আড্ডার মধ্যেই চলেছে ক্রোশের কাজ। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল আলাদা আলাদা রঙের প্যালেট। কেউ বাড়িতে বসে কাজ করেছেন, কেউ আবার মাসে একবার উত্তর ও দক্ষিণ গোয়ার বিভিন্ন জায়গায় মিলিত হয়েছেন।
শর্মিলা জানালেন, “শুরুর দিকে সব যোগাযোগই ছিল হোয়াটসঅ্যাপ আর জুমে। কিন্তু যখন ট্রিটি জোড়া লাগানোর সময় এল, তখনই ২৫ জন প্রথমবার একসঙ্গে সরাসরি দেখা করলাম। সেই বন্ধনটা ছিল অসাধারণ।”
তবে পথটা মসৃণ ছিল না। ঘূর্ণিঝড় ও টানা বৃষ্টিতে কাজ মাঝপথে থমকে যায়। খোলা জায়গায় কাঠামোর উপর স্কোয়ার বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রেখে আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে।

থ্রি-ডি শিল্পের নতুন ভাষা

প্রথমে ভাবা হয়েছিল স্কোয়ারগুলো জুড়ে প্যানেল বানিয়ে ধাতব কাঠামো ঢেকে দেওয়া হবে। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলায়। প্রতিটি স্কোয়ার আলাদা করে কাঠামোর সঙ্গে বাঁধা হয়, যাতে গাছের ডালের মতো স্তরে স্তরে থ্রি-ডি প্রভাব তৈরি হয়। শীনা নিজে প্রতিটি স্কোয়ার বসিয়ে সেই গভীরতা এনে দেন।
সোফি সিভারামনের কথায়, “ভেবেছিলাম এটা একটা ‘ইজি-পিজি’ ক্রিসমাস ট্রি হবে। কিন্তু প্রথমবার বসানোর পর বুঝলাম, স্কোয়ারগুলো বড় করা দরকার।” পরে ছয় ইঞ্চি থেকে আট ইঞ্চি আকারের স্কোয়ার তৈরি করা হয়, যোগ হয় তুষারফুল আর তারার মতো নকশা।

ঐতিহ্য ও সমবায়ের শিল্প
মিউজিয়াম অব গোয়ার ডিরেক্টর শারদা কেরকার মনে করেন, গোয়ার উৎসব মানেই শিল্প আর কারুশিল্পের সমবায় চর্চা। “ক্রোশে গোয়ায় এসেছিল পর্তুগিজ সন্ন্যাসিনীদের হাত ধরে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে। আজও আমাদের ঘরে ঘরে ক্রোশে ডয়লি, টেবিল লিনেন আছে। কনের ট্রুসোতেও থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসা ক্রোশে সামগ্রী,” বলছেন তিনি। তাঁর মতে, “ক্রোশে নিছক হস্তশিল্প নয়—এটি মননশীল শিল্প। ‘Where We Gather’ দেখায় কীভাবে শিল্প মানুষকে, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে, একত্র করে।”
প্রদর্শনীর সময়ে কালেক্টিভের সদস্যদের গায়েও ছিল হাতে তৈরি ক্রোশে টপ, স্কার্ফ কিংবা গয়না—যা গোয়ায় এই শিল্পের জনপ্রিয়তাকেই তুলে ধরে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই ক্রোশে ক্রিসমাস ট্রি মিউজিয়াম অব গোয়ায় প্রদর্শিত হবে ৯ নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। তারপর কী হবে? শর্মিলা জানালেন, স্কোয়ারগুলো দিয়ে হয়তো কম্বল বানিয়ে দান করা হবে, অথবা কোনও রাস্তায় তৈরি হবে একটি ছাউনির মতো ইনস্টলেশন।
তথ্যের খাতায়
Festivals of Goa প্রদর্শনীটি মিউজিয়াম অব গোয়ার দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত। চারটি আলাদা প্রদর্শনীতে ৯০ জনের বেশি শিল্পী ও ১০০-রও বেশি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে, যেখানে উঠে এসেছে গোয়ার যৌথ ইতিহাস, আন্তঃধর্মীয় চর্চা ও বদলে যাওয়া ঐতিহ্য।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ক্রোশে ভাস্কর্যটি তৈরি হয় স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ভিলামারজান্তে—উচ্চতা ৭৭ ফুট ১.২ ইঞ্চি। সেখানে ব্যবহার হয়েছিল ১০,০০০ ক্রোশে স্কোয়ার, অংশ নিয়েছিলেন ১২০ জন নারী।
গোয়ার এই ১৮ ফুটের ক্রোশে ক্রিসমাস ট্রি হয়তো উচ্চতায় রেকর্ড ভাঙেনি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন, আর সুতোয় গাঁথা সম্মিলিত সৃষ্টির গল্পে সে নিঃসন্দেহে অনন্য।

Related Articles

Back to top button