ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজকুমার “প্রিন্স অফ ওয়েলস” ১৯২১সালে ৪ জানুয়ারি, রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধটির উদ্বোধন করেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গম্বুজের ওপর সূর্যাস্তের আলো যখন পড়ে, তখন মনে হয়—সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্বেতমহল যেন নীরবে বলে চলে, “যুগ বদলায়, শহর বদলায়—কিন্তু স্মৃতি বদলায় না।

কলকাতার ‘তাজমহল’-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
ঔপনিবেশিক স্মৃতির গহিনে দাঁড়িয়ে শ্বেতমহল—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতার আকাশে আজও সাদা গম্বুজ ঝলসে ওঠে—যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। বহু বিতর্ক, প্রশংসা, স্মৃতি ও রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজকুমার, ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’ ১৯২১ সালের ৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন স্মৃতিসৌধটি। এই দিনটি যেন কলকাতার সর্বাধিক পরিচিত স্থাপত্যের জন্মদিনও বটে।
রানি ভিক্টোরিয়া প্রয়াত হন ১৯০১ সালে। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। ১৯০৬ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রায় দেড় দশকের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ১৯২১ সালে সম্পূর্ণ হয় এই স্মৃতিরঞ্জনী স্থাপত্য। সেই হিসেবে শতবর্ষ অতিক্রম করেছে কলকাতার আমাদের এই ‘শ্বেতমহল’।

শ্বেতপাথরে গড়া ইন্দো-সারাসেনিক স্বপ্ন:
রাজস্থান থেকে আনা মাকরানা মার্বেলে গড়া এই স্থাপত্যশৈলীর নাম—‘ইন্দো-সারাসেনিক রিভাইভাল’। প্রধান স্থপতি উইলিয়াম এমারসন এই সৌধে মিশিয়ে দিয়েছিলেন মুঘল, ভেনিসীয়, মিশরীয় ও দক্ষিণ ভারতীয় নান্দনিকতার প্রভাব। কেন্দ্রের বিশাল গম্বুজটি যেন তাজমহলের প্রতিবিম্ব, অথচ স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কারুকাজে মিশে আছে ইউরোপীয় আভিজাত্য।
চূড়ার ওপরে কালো ব্রোঞ্জের ‘অ্যাঞ্জেল অব ভিক্ট্রি’: হাতে ট্রাম্পেট, পায়ের তলায় বল বিয়ারিং ও পারদের যান্ত্রিকতা। হাওয়ার দিশা বদলালেই ঘুরে যায় সেই প্রতীকী পরি। ইতিহাস জানায়—১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে দু’বার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার এই ঘূর্ণন। পরে ফের চালু হয়। কেন্দ্রীয় গম্বুজকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাত প্রতীকী মূর্তি—শিল্প, স্থাপত্য, ন্যায়বিচার, দাক্ষিণ্য, মাতৃত্ব, বিদ্যা ও প্রজ্ঞা—এক অনন্য দর্শন বহন করে।

শুধু স্থাপত্য নয়, এ এক ‘জীবন্ত’ সংগ্রহশালা:
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আসলে একটি জাদুঘর-সংগ্রহশালা। এখানে রয়েছে প্রায় ২৫টি গ্যালারি। টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলের আঁকা কলকাতার প্রাচীন রূপ, রাজনীতি-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক দলিল, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতিকৃতি যেমন রয়েছে, তেমনই মজুত রয়েছে ভারতীয় রাজন্যবর্গের স্মারক নিদর্শনও। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের লেখা গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি, শেক্সপিয়ারের চিত্রিত সংস্করণ—সব মিলিয়ে এখানে ইতিহাস যেন কথা বলে।

১৯৯২ সালে খোলা হয় ‘কলকাতা গ্যালারি’। প্রাক্তন রাজ্যপাল ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ নুরুল হাসানের উদ্যোগে গড়া এই গ্যালারি গোটা শহরের সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবর্তনের নথিবদ্ধ আখ্যান।
সবুজের বুকেই শ্বেত গম্বুজ।
ইতিহাসের গোপন পাতা:
ইতিহাসবিদদের মতে, যেখানে আজ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দাঁড়িয়ে, একসময় সেখানে ছিল প্রেসিডেন্সি জেল। পরে সেটি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুরে। আবার এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণের অর্থ জোগাড় হয়েছিল মূলত ভারতীয় প্রজাদের কাছ থেকেই—অনুদান, কর, চাঁদা। ব্রিটিশ সরকার বরং তুলনায় কম অংশ বহন করেছিল—এ কথাও ইতিহাসেরই অংশ।

উপনিবেশের স্মারক না কি শহরের গর্ব—চর্চা আজও চলছে:
ভিক্টোরিয়ার বহিরঙ্গে ৬৪ একর জমি নিয়ে একটি বাগান বা মুক্তাঞ্চল আছে। বাগানের প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনেই রয়েছে রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তি। এ ছাড়াও বাগান জুড়ে রয়েছে বেশ কিছু ব্রিটিশ রাজপুরুষের মূর্তিও। বাগানের অন্য একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে নজর কাড়বে এক অপূর্ব তোরণ। তার শীর্ষে ধাতু নির্মিত এক অশ্বারোহী মূর্তি। এই তোরণ সপ্তম এডওয়ার্ডের স্মৃতিতে নির্মিত।
এখানে উল্লেখ্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে ব্রিটিশ প্রতিভূদের সাথে স্থান পেয়েছেন এক বাঙালি উদ্যোগপতি। তিনি স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
১৯৮৮-তে রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ নুরুল হাসানী এখানে একটি ‘কলকাতা গ্যালারি’ তৈরির পরিকল্পনা করেন। ১৯৯২-এ সেই গ্যালারি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত হয়।
একদিকে এ সৌধ ঔপনিবেশিক স্মৃতির প্রতীক—যার ভিত শক্ত হয়েছিল ভারতীয় শ্রমে, ভারতীয় টাকায়। অন্যদিকে—শহরের বাসিন্দাদের কাছে এটি আজও নাগরিক পরিচয়ের অন্যতম চিহ্ন। গবেষকরা বলেন, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তাই শুধু একটি স্থাপত্য নয়—এ এক সাংস্কৃতিক পরত, যেখানে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, স্মৃতি, বিরোধিতা ও মমতা—সব মিলিয়ে কলকাতার নিজস্ব ইতিহাস।
সুতরাং, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গম্বুজের ওপর সূর্যাস্তের আলো যখন পড়ে, তখন মনে হয়—সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্বেতমহল যেন নীরবে বলে চলে, “যুগ বদলায়, শহর বদলায়—কিন্তু স্মৃতি বদলায় না।”

ঠিকানা
Victoria Memorial, 1, Queen’s Way, Maidan, Kolkata – 700071, West Bengal, India
Kolkata Tourism
ফোন: 033-2223-1890 / 1891
ইমেল: victoriamemorial-cal.org
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সময়সূচি:
Museum / Gallery (ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল)
খোলা থাকে: সকাল ১০:০০ টা – সন্ধ্যা ৬:০০ টা
বন্ধ থাকে: সোমবার ও সরকারি জাতীয় ছুটির দিন (যেমন গণতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বড়দিন ইত্যাদি) — এই দিনে মিউজিয়াম/গ্যালারি বন্ধ থাকে।
বাগান
খোলা থাকে: সকাল ৬:০০/৫:৩০ টা – সন্ধ্যা ৬:০০ টা
প্রতিদিন খোলা (সোমবারসহ সপ্তাহের সকল দিন).
ওয়েবসাইট: victoriamemorial-cal.org
টিকিট মূল্য:
Museum / Gallery Tickets
ভিজিটর
টিকিট মূল্য:
ভারতীয় নাগরিক
₹৫০ (গ্যালারি সহ)
SAARC দেশের নাগরিক
₹১০০
বিদেশী পর্যটক
₹১০০০
স্কুল ছাত্র/ছাত্রী (ইউনিফর্মে)
বিনামূল্যে
সেনা/পুলিশ কর্মী (ইউনিফর্মে)
বিনামূল্যে
Garden Tickets
দৈনিক: ₹৩০ /- প্রতি জন
বার্ষিক পাস:
সীনিয়রদের জন্য: ₹১,০০০ /-
অন্যান্যদের জন্য: ₹২,০০০ /- �
Light & Sound Show Tickets
সাধারণ মূল্য: ₹১০০ /- (প্রতি জন) — সাধারণত সন্ধ্যা থেকে বিক্রয় শুরু হয় 5:30 PM-এ ইস্ট গেট কাউন্টারে।
টিকেটগুলো সাধারণত গেট কাউন্টারে ক্যাশ/কার্ড/UPI-তে পাওয়া যায়।
Light & Sound Show (লাইট অ্যান্ড সাউন্ড)
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সন্ধ্যায় হয় আকর্ষণীয় Son-et-Lumiere (লাইট ও সাউন্ড শো) যেখানে কলকাতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গল্পের আকারে প্রদর্শিত হয়।
শো দিন ও ভাষা
দিন: মঙ্গলবার, শুক্রবার, রবিবার
শো ভাষা: মঙ্গলবার, শুক্রবার, রবিবা
বাংলা: বৃহস্পতিবার
শনিবার: হিন্দি
বুধবার: ইংরেজি
শো সাধারণত মঙ্গলবার থেকে রোববার পর্যন্ত হয় (সোমবার বন্ধ থাকে)।
শো সময়:
সাধারণত সন্ধ্যার পরে শুরু হয় (সঠিক সময় ঋতুর উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে) — যেমন শীতকালে 6:15 PM-7:00 PM (বাংলা), 7:15-8:00 PM (ইংরেজি) ইত্যাদি।
শরতের বাইরে বা বর্ষায় শো না হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে; খারাপ আবহাওয়া/বৃষ্টিতে শো বাতিল হতে পারে।
বিশেষ নিয়ম/ছুটি সম্পর্কে তথ্য:
সোমবার ও জাতীয় সরকারি ছুটির দিনগুলোতে মিউজিয়াম & গ্যালারি বন্ধ থাকে, কিন্তু বাগান সাধারণত সব দিন খোলা থাকে।
বিশেষ অনুষ্ঠান বা উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠান থাকলে সময়সূচি সাময়িক বদলে যেতে পারে; সে ক্ষেত্রে অফিসিয়াল সাইট বা কাউন্টারে আগে যাচাই করে নিন।
ভ্রমণ-পরামর্শ:
✔️ মিউজিয়াম ঘুরতে সকাল ১০ টার পরে যান।
✔️ টিকেট কাউন্টার সাধারণত 5:30 PM-এর আগে বন্ধ হতে পারে বলে দ্রুত পৌঁছান।
✔️ লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য বিকেল সাড়ে ৫ টার আগে পৌঁছালে টিকেট সহজে পেতে পারবেন।



