‘আমার বোন, ওর তিন সন্তান…’, তুরস্ক-সিরিয়া জুড়ে শুধুই হাহাকার

নিজস্ব সংবাদদাতা: ঘড়িতে তখন ভোর সোয়া চারটে। দক্ষিণ তুরস্কের গাজিয়ানটেপে নিজের বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলেন এরডেম। হঠাৎ, প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। তুরস্কের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও যাঁরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, এরডেম সেই সব ভাগ্যবান মানুষদের একজন। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, “আমার ৪০ বছরের জীবনে কখনও এমনটা অনুভব করিনি। অন্তত তিনবার খুব জোরালোভাবে কেঁপে উঠেছিল পাযের তলার মাটি। মনে হচ্ছিল যেন দোলনায় দোলা শিশুর মতো দুলছি।” তিনি আরও জানিয়েছেন, ধসে যাওয়া বাড়িঘর থেকে বাঁচতে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাদের গাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।এরডেম একা নন, ভূমিকম্প বিধ্বস্ত তুরস্কে যাঁরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই অভিজ্ঞতাটা প্রায় এক। গাজিয়ানটেপের ১৩০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত আদানার বাসিন্দা নিলোফার আসলান। তাঁদের পাঁচতলার অ্যাপার্টমেন্টটা যখন প্রবলভাবে দুলছিল, তখন তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর সপরিবারে মৃত্যু নিশ্চিত।
তবে, শেষ পর্যন্ত সকলেই বেঁচে গিয়েছেন। নিলোফার বলেছেন, “আমি আমার জীবদ্দশায় কখনও এমনটা দেখিনি। প্রায় এক মিনিটের জন্য দুলছিল সবকিছু। আমি আমার পরিবারকে বলেছিলাম, ভূমিকম্প হচ্ছে। চলো, অন্তত এক জায়গায় একসঙ্গে মরি। এছাড়া সেই সময় আমার মনে আর কোনও ভাবনা ছিল না।” কম্পন থামার পর নিলোফার শুধুমাত্র চটি পরে ঘরের পোশাকেই বেরিয়ে এসেছিলেন। আর নিজের ঘরে ফেরার সাহস করেননি। চারপাশে যে শুধুই বড় বড় ভবনের ধ্বংসস্তূপ।
ভূমিকম্পের প্রাথমিক আকস্মিকতা কেটে যাওয়ার পর, সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন উদ্ধারকাজে। ৩০০ মাইল পূর্বের শহর দিয়ারবাকিরের এক বাসিন্দা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “চারিদিকে সকলে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। ওই অবস্থায় আমি হাত দিয়েই পাথর সরাতে শুরু করি। আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে বেশ কয়েকজন আহতকে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে বের করে এনেছিলাম। কিন্তু তারপরও চিৎকার থামেনি। এরপর, কাজে নেমেছিল উদ্ধারকারীরা।” অনেকে নিজেরা বেঁচে গেলেও, পরিবারকে বাঁচাতে পারেননি। সেই আফশোষ কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁদের। দিয়ারবাকিরেরই বাসিন্দা মুহিতিন ওরাক্কি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, “ধ্বংসস্তূপের নীচে আমার পরিবারের সাত সদস্য চাপা পড়েছে। আমার বোন এবং ওর তিন সন্তান সেখানে আছে। চাপা পড়েছে তার স্বামী, শ্বশুর এবং শাশুড়িও।”একই ছবি দেখা গিয়েছে সিরিয়াতেও।
এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে বোমা হামলার কারণে সেখানকার ভবনগুলি কমজোরি হয়ে পড়েছিল। ভূমিকম্পে সেগুলি প্রায় সব ভেঙে পড়েছে। মালতিয়া শহরের বাসিন্দা ২৫ বছরের ওজ়গুল কোনাক বলেছেন, “আফটারশক এবং হিম শীতল আবহাওয়া, পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে। এখানে খুব ঠান্ডা এবং তুষারপাত হচ্ছে। সবাই রাস্তায়। মানুষ কি করবে তা বুঝতে পারছে না।”ভূমিকম্পের পরই তুরস্কের সীমান্তবর্তী সিরিয় শহর সারমাদায় উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সিরিয়ার মানবাধিকার গোষ্ঠী, ‘হোয়াইট হেলমেটস’-এর সদস্য ইসমাইল আল আবদুল্লা। তিনি বলেছেন, “এই ভূমিকম্পে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার বিভিন্ন শহর ও গ্রামের অনেক ভবন ধসে পড়েছে। আমাদের সাহায্য দরকার। আমাদের আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য প্রয়োজন। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়া এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। সিরিয় জনগণকে বাঁচাতে সবার সাহায্য প্রয়োজন।”


