আন্তর্জাতিক
Trending

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে বাংলাদেশকে

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠন হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেখানেই তাঁর মৃত্যু দণ্ডের সাজা ঘোষণা হল

 

চিফ রিপোর্টার: রাজনীতির মঞ্চে চার দশকের বেশি বিচরণ, টানা দেড় দশকের বেশি সময় ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসন, এরপর জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। বাংলাদেশে রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হলেন।
জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও। পাঁচ বছর কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে বাকি আসামি সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের।
৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এই রায় হয়। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে ওঠেন। এখনো এখানেই রয়েছেন তিনি। পলাতক থাকায় এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ তিনি পাচ্ছেন না বলে ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন।
উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের নির্দেশসহ চানখাঁরপুল ও আশুলিয়া হত্যার অপরাধে তাঁর এই সাজা।
বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। দলটির কোনো সক্রিয় তৎপরতা না থাকলেও এই রায় ঘিরে অনলাইনে ‘শাটডাউন’ এর কর্মসূচির প্রচার চালিয়েছিল তারা। তার মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটছে ১৩ নভেম্বর,২০২৫ রায় ঘোষণার পর থেকেই।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় উল্লাস। এই রায়কে ন্যায়বিচার বলেছে “বিএনপি”। জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল “জাতীয় নাগরিক পার্টি”ও বলেছে, শেখ হাসিনার উপযুক্ত বিচারই হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠন হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই ট্রাইব্যুনালেই তার ফাঁসির সাজা হল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা চলছে ট্রাইব্যুনালে। এ ছাড়া আদালত অবমাননার দায়ে তাঁকে এই ট্রাইব্যুনাল এর আগে ছয় মাসের কারাদণ্ডও দিয়েছিলেন।

যে কারণে মৃত্যুদণ্ড:
যে মামলার রায় হয়েছে, এই মামলায় শেখ হাসিনা সহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেগুলো হলো; উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা। ড্র্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি, প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল এবং চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার অপরাধে তাঁকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সব অভিযোগেরই প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আল-মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তিনি জবানবন্দিতে বলেছিলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সরাসরি ‘লেথাল উইপন’ (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার ওই নির্দেশনা তিনি পেয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মাধ্যমে।

আড়াই ঘণ্টা ধরে পড়া হলো রায়, এরপর এল মৃত্যুদণ্ডের আদেশ:
সাড়ে চার’শ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একাধিকক্রমে পড়েন তিন বিচারক। রায়ের সময় শেখ হাসিনা সহ আসামিদের অপরাধের প্রমাণ হিসেবে আমলে নেওয়া ফোনালাপের রেকর্ড শোনানো হয়, জুলাই সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। রায়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি জুলাই শহীদদের পরিবারকে এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতেও বলা হয় এই রায়ে।
বিচারক শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করতেই এজলাসে উপস্থিত অনেকেই হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান তখন ডায়াসে যান এবং সবাইকে ট্রাইব্যুনালের সুষ্ঠু পরিবেশ বজার রাখার অনুরোধ করেন। তারপর যখন আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ঘোষণা করা হয়, তখন কাউকে আর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম: বিশ্বের যেকোনো আদালতে এই অপরাধের একই সাজা হবে। এই মামলার রায় ‘সাজানো’ বলে আগে থেকেই বলে আসছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, তাঁরা যে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়েছেন, পৃথিবীর যেকোনো আদালতে একই শাস্তি হতো।
তিনি আরও বলেন, ‘যে ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ এই আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো আদালতের স্ট্যান্ডার্ডে এই সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো উতরে যাবে এবং পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজ যেসব আসামিকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই একই শাস্তিপ্রাপ্ত হবেন।’
মৃত্যুদণ্ড শেখ হাসিনার উপযুক্ত বিচার: আখতার হোসেন
ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর সন্তোষ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শহীদ পরিবার, যাদের ক্ষতি কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হবে না, তাদের সামনে অন্তত একটা ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছি। এ জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান সংযত থাকতে, ভারতকে আহ্বান শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়টিকে ঐতিহাসিক অভিহিত করে সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
ন্যায়বিচার হয়েছে, এই রায় সামনের দিনের জন্য একটা উদাহরণ: সালাহউদ্দিন আহমদ
সরকারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রায়-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলা, উত্তেজনাপ্রসূত আচরণ, সহিংসতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। জনগণের, বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রায়কে ঘিরে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন কেউ জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে, এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়, সরকার এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে সবাইকে সতর্ক করছে।
‘যেকোনো ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা বা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে,’ এমন হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় বিবৃতিতে।

এদিকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে হস্তান্তরের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়। তাতে বলা হয়, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত এই ব্যক্তিদের দ্বিতীয় কোনো দেশ আশ্রয় দিলে তা হবে অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞার শামিল। আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন অনতিবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।’
দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে দুজনকে হস্তান্তর করাটা ‘ভারতের জন্য অবশ্যপালনীয় দায়িত্বও বটে’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে।
অন্তর্বর্তী সরকার এর আগেও শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে তাতে নয়াদিল্লি সাড়া দেয়নি। এর মধ্যে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। দলীয় নানা কর্মসূচিতে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রচারও চালাচ্ছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু আইনগত অধ্যায় নয় — এটি এমন একটি সংকট ও প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছে যা ভবিষ্যতের ভোট-পরিস্থিতি, অর্থনীতিক গতিপথ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

নিচে বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
ভারত: রায়ের পর ভারত সরকার “রূপকার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া” জানিয়ে বলেছে যে তারা বাংলাদেশে সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে “নির্মাণকারী অংশীদারিত্ব” বজায় রাখতে চায়।
আদেশ ও আইনগত সীমাবদ্ধতা: ভারতের আইনে রাজনীতি-লোভী মামলা বা হত্যা শাস্তি থাকা মামলায় উদ্ধারের ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষত যদি অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত বলে ধরা হয় বা মৃত্যু দণ্ডের সম্ভাবনা দেখা যায়।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থা গুরত্ব: বিশ্লেষকদের মতে, ইউএন ও অন্যান্য মানবাধিকার সমিতি প্রাণদণ্ডের মূহূর্ত এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে। CNA বিশ্লেষণে বলা হয়েছে এটি “দেশের ভাঙ্গন আরও গভীর করতে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।”
ব্যাপক সমালোচনা: এমনও মন্তব্য উঠেছে যে ট্রাইব্যুনাল স্ববংশবিক – যেটি আসলে শেখ হাসিনা নিজের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল – যা এখন তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ: রায়টি যদি কার্যকর করা হয়, তাহলে সেটি শুধু বিচার নয়, রাজনৈতিক ইঙ্গিতও বহন করে — “একজন প্রভাবশালী নেত্রীকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়া” বলে সমালোচকরা দেখতে পারেন।

২. ভবিষ্যতের ভোট-পরিস্থিতি (রাজনৈতিক প্রভাব)
আওয়ামী লীগ ও বিরোধী শক্তি: শেখ হাসিনাকে দেয়া মৃত্যুদণ্ড আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ উস্কে দিতে পারে।
নির্বাচন-চ্যালেঞ্জ: আগামী নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে এই রায় ফেব্রুয়ারি বা পরবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক সংকটকে গভীর করবে। CNA রিপোর্ট অনুযায়ী, “এই মাস গুলোর মধ্যে সহিংসতা বাড়ার সম্ভাবনা আছে, যা নির্বাচনকে কঠিন করে তুলতে পারে।”
আস্থা ও বৈধতা: শেখ হাসিনা দাবি করেছেন ট্রাইব্যুনাল “নিরপেক্ষ নয়” এবং “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তাঁর মতে, আদালত তাঁর স্বার্থান্বেষীদের রাজনীতিকে বন্ধ করার জন্য নিয়োজিত।
রাজনৈতিক শূন্যতা ও ভরাট: তার অনুপস্থিতি (পরিস্থিতি “শাসক-অপ্রাপ্য”) এবং রাজনৈতিক বিধিনিষিদ্ধতার কারণে ভবিষ্যত রাজনীতিতে নেতাদের নতুন চেহারা গঠিত হতে পারে। নতুন নেতৃত্ব, পুনর্গঠন বা জোট তৈরির সম্ভাবনা এখন সক্রিয় আলোচনা।
সাম্প্রতিক ইতিহাস ও প্রতিধ্বনির সাদৃশ্য: কিছু সমালোচক পুরনো রাজনৈতিক ঘটনা এবং শাস্তি-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন এটিকে। যেমন রাজনৈতিক বিচারের ইতিহাসে “শাম ট্রায়াল” বা নেতাদের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করার পথ হিসেবে প্রয়োগ।

৩. অর্থনৈতিক প্রভাব
অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা: শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কাহিনী ছিল শক্ত – বিএ আর জিডি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। কিন্তু তার পরবর্তী পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগ এবং পুঁজি প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক স্থিতিশীলতা: সাম্প্রতিক গবেষণা নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশের আর্থিক ও মুদ্রাগত সেক্টরে চাপ রয়েছে — ঋণ চরমায়, নন-পারফর্মিং লোন বাড়ছে এবং বৈদেশিক রিজার্ভ সংকটে সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
অভিযোগ ও পুনরুদ্ধার: যুক্তি রয়েছে যে শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ-মেয়াদে অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও সম্পদের অবৈধ অপচয় হয়েছিল; নতুন শাসনাবস্থা তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসাবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।
বাণিজ্য ও বৈদেশিক সম্পর্ক: রাজনৈতিক অস্থিরতা রফতানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও লোন-চুক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিবাদ, ব্লকিং বা অবরোধের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আর্থিক শাস্তি এবং প্রতিক্রিয়া: আন্তর্জাতিক দৃষ্টি এবং মানবাধিকার উদ্বেগ আরও বাড়লে অর্থনৈতিক অংশীদাররা অর্থনৈতিক শাস্তি, অবরোধ বা শর্তযুক্ত সহায়তা বিবেচনায় আনতে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ব্যাহত করতে পারে।
৪. সার্বিক গুরুত্ব এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পথ:
এই মৃত্যুদণ্ড কেবল একজন নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর নবায়ন-পরীক্ষা। এটি দেখাচ্ছে যে ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু ভোটে নয়, বিচারব্যবস্থায়ও হতে পারে — এবং তার প্রভাব বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে পারে, যদি পুনর্মিলন, সংলাপ ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায়।
তবে, রায় বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে: শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত এবং ভারতীয় আইনি ও কূটনৈতিক বাধা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিভাজন এবং নাগরিক উত্তেজনা খারাপ হলে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিরোধ ও সামাজিক ধ্বসের আশঙ্কা রয়েছে। নতুন সরকার যদি সফলভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, ন্যায্য বিচার ও রাজনৈতিক পুনর্মিলন পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, তাহলে দারুণ চ্যালেঞ্জ সামনে থাকবে।
অন্য দিকে, যদি নতুন প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দেয় — স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও অর্থনৈতিক সংস্কার — তাহলে এটি একটি সুযোগও হতে পারে: পুরাতন চক্র ভাঙ্গা এবং একটি “নতুন অধ্যায়” গঠন করার, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধ এবং আইনগত প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়।

Related Articles

Back to top button