MY CATAGORYআন্তর্জাতিক
Trending

আদালতের কাঠগড়ায় হাসি, আর চারটি শব্দে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা কক্ষ

পুলিশি থেরাপি ডগের ভেস্ট শ্যাডো-ই হয়ে উঠল রাজসাক্ষী

 

পিটিআই: আদালত কক্ষের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা উত্তেজনা চারদিকে ছড়িয়ে ছিল—চামড়ায় কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো অনুভূতি। পিছনের সারিতে সারিবদ্ধ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা, কলম হাতে, ক্যামেরা নিঃশব্দে চালু রেখে অপেক্ষায়। এ কোনও সাধারণ বিচারপর্ব ছিল না। শহরের সাম্প্রতিক কালের অন্যতম সংবেদনশীল গার্হস্থ্য হিংসার মামলার চূড়ান্ত শুনানি চলছিল।

মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী—মাত্র তিন বছরের একটি শিশু, লিলি। সকালের বিচারপর্ব কোন দিকে গড়াবে, তা বিচারপতি থেকে শুরু করে আদালতের কর্মচারী—কেউই নিশ্চিত ছিলেন না।

শিশুটিকে কাঠগড়ায় তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছিল। এতটুকু বয়সে কি আদালতের পরিবেশ সে বুঝবে? কথা বলবে তো? বিচারপতি হোলোয়ে, যিনি কঠোর অথচ মানবিক বিচারক হিসেবেই পরিচিত, একাধিকবার মামলার নথি উল্টেপাল্টে দেখেছেন। কিন্তু অনিশ্চয়তা থেকেই গিয়েছিল।

মায়ের উপর নৃশংস হামলার সেই রাতের পর থেকে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি লিলি। রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অভিযুক্ত ছিলেন মায়ের বর্তমান সঙ্গী—যাঁর পক্ষে আইনজীবীরা আপাতদৃষ্টিতে নিশ্ছিদ্র অ্যালিবি সাজিয়েছিলেন।

সেই দিন আদালতের পরিবেশ হঠাৎ বদলে গেল।পিছনের ভারী দরজা খুলতেই একযোগে সকলের দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল। ছোট্ট এক মেয়ে, পালক-মায়ের হাত শক্ত করে ধরে আদালতে প্রবেশ করল। নীল রঙের সাদা ছোপওয়ালা ফ্রক, এলোমেলো চুলে বাঁধা ফিতেটা খুলে আসছে। অন্য হাতে আঁকড়ে ধরা একটি নরম খেলনা খরগোশ—ছেঁড়া কান যেন নির্ঘুম রাতগুলোর সাক্ষী।

সে লিলি।

তার ঠিক পিছনে ধীর পায়ে এগিয়ে এল একটি বিশাল জার্মান শেফার্ড। মেঝেতে নখের টোকা ছাড়া কোনও শব্দ নেই। গায়ে পুলিশি থেরাপি ডগের ভেস্ট। নাম—শ্যাডো।

একটি সম্মিলিত নিঃশ্বাস যেন আদালত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। শান্ত, স্থির, অথচ সতর্ক দৃষ্টিতে কক্ষ পর্যবেক্ষণ করছিল শ্যাডো। শিশু সাক্ষীদের মানসিক সুরক্ষার জন্য এই ধরনের কুকুর ব্যবহারের কর্মসূচি সদ্য শুরু হয়েছে। কিন্তু এই কুকুর যে মামলার গতিপথই বদলে দেবে, তা কেউ ভাবেনি।

লিলি হঠাৎ থেমে গেল। চারপাশের অচেনা মুখ, উঁচু বেঞ্চ, বিচারপতির দৃপ্ত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে গেল সে। তারপর তার চোখ গিয়ে পড়ল শ্যাডোর উপর।

কুকুরটি ঠিক কাঠগড়ার সামনে বসে পড়েছিল। নিঃশব্দ আমন্ত্রণ।

কোনও প্রাপ্তবয়স্কের নির্দেশ ছাড়াই লিলি পালক-মায়ের হাত ছেড়ে শ্যাডোর দিকে এগিয়ে গেল। তার গলায় মুখ গুঁজে ধরল সে। আদালত নিস্তব্ধ।

কীবোর্ড থামল, কাশি থামল। বিচারপতি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। সরকারি আইনজীবী র‌্যাচেল টোরেসের চোখে আশঙ্কা আর আশার মিশ্রণ। প্রতিরক্ষা পক্ষের আইনজীবী সংশয়ী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।

তারপর লিলি ফিসফিস করে কিছু বলল।

প্রথমে মনে হল, শিশুর নার্ভাস স্বস্তি খোঁজা। কিন্তু তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে মাথা তুলে অভিযুক্তের দিকে তাকাল।

না, সে চিৎকার করেনি। কাঁদেনি।

কিন্তু তার কণ্ঠস্বর—হঠাৎ স্পষ্ট, ছুরির মতো ধারালো—আদালত কাঁপিয়ে দিল।

গ্যালারিতে শ্বাসরুদ্ধ গুঞ্জন। প্রতিরক্ষা আইনজীবী লাফিয়ে উঠলেন।

বিচারপতি সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করলেন।

“জুরি এই মন্তব্য উপেক্ষা করবেন।”

কিন্তু উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। সবাই দেখেছিল শিশুটির চোখ। শুনেছিল সেই চারটি শব্দ।

“ওই খারাপ লোকটা।”

সহজ। সরাসরি। ভয়ানকভাবে স্পষ্ট।

লিলিকে কাঠগড়ায় বসানো হল। সে সোজা হয়ে বসল না—শ্যাডোর গায়ে হাত রাখার জন্য পাশ ফিরিয়ে বসে রইল। কুকুরটি যেন বুঝতে পারছিল, সে আজ কারও কণ্ঠস্বর।

র‌্যাচেল ধীরে প্রশ্ন শুরু করলেন। কিন্তু লিলি বারবার শ্যাডোর কানে কথা বলছিল।

“ও জানে,” সে বলল। “ও দেখেছে।”

তারপর ছোট্ট পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল। একটি শিশুসুলভ আঁকিবুঁকি—টেবিলের নীচে লুকিয়ে থাকা একটি ছোট মেয়ে, আর সামনে রাগে আঁচড় কাটা বড় অবয়ব।

“ও টেবিলটা ভেঙে দিয়েছিল,” ফিসফিস করল লিলি।

আদালত বুঝে গেল—এই শিশুর কাছে শ্যাডোই নিরাপত্তা, সত্য বলার একমাত্র ভরসা।

বিরতি ঘোষণা করা হল।

বাইরে সাংবাদিকদের কলম চলতে লাগল। অভিজ্ঞ আদালত কর্মীরাও অস্বস্তিতে সরে বসলেন। আর লিলি? সে শ্যাডোর পাশে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। চারপাশের ঝড় যেন তার কাছে পৌঁছতেই পারল না।

পরে বিচারপতি সিদ্ধান্ত দিলেন—শিশুর বক্তব্য নথিভুক্ত থাকবে।

ফিরে এসে র‌্যাচেল এক অভিনব পথ নিলেন। তিনি শিশুকে নয়, কুকুরটিকেই প্রশ্ন করলেন।

লিলির চোখে হাসি ফুটল।

“আমি ওকে বলেছি,” সে ফিসফিস করল। “ও শোনে। ও মিথ্যে বলে না।”

আদালত স্তব্ধ।

এই মামলায় প্রমাণ ছিল ভাঙা আসবাব, নীরবতা আর ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু সেই দিন একটি শিশু, একটি কুকুর, আর চারটি শব্দ—সত্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

Related Articles

Back to top button