জানা-অজানা

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু দিবসে ফিরে দেখা

 

ঝুমা সরকার

প্রতিবেদক: কবি, গল্পকার, ও প্রাবন্ধিক

ফি বছর ৩১ শে অক্টোবর দিনটি আসলেই ভারতবাসীর মনে ভেসে ওঠে সেই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার কথা। ১৯৮৪ সালে ৩১শে অক্টোবর নতুন দিল্লিতে নিজের বাসভবনে নিজের দেহরক্ষীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আজ থেকে ঠিক ৪১ বছর আগে। বাংলার বাউল সম্রাট গোষ্ঠ গোপাল দাস ইন্দিরা গান্ধীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে স্মরণ করে একটি গান রচনা করেছিলেন, ” কি নিদারুণ খবর পেল ভারতবাসী বেতারে…….. “। আজও সেই গানটি শুনলে ভারতবাসী শিহরিত হয়ে ওঠে সেই মর্মান্তিক ঘটনার ভয়াবহতায়। মৃত্যুর ঠিক আগের দিন ৩০ এ অক্টোবর ১৯৮৪ ভুবনেশ্বরে তাঁর জীবনের শেষ জনসভাতে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন, ” আমার জীবন যথেষ্ট দীর্ঘ হয়েছে, আর এই জীবনে আমার গর্ব এটাই যে পুরো জীবনটাই আমি মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পেরেছি। নিজের শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত এই কাজটাই করে যাব। আমার রক্তের প্রতিটা বিন্দু ভারতকে আরও মজবুত করার কাজে লাগবে।”

ইন্দিরা গান্ধীই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম ও একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী যাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, আপসহীন মনোভাব ও ক্ষমতার অভূতপূর্ব কেন্দ্রীকরণের জন্য তিনি আজীবন ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করবেন।

১৯১৭ সালের ১৯শে নভেম্বর শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী “পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু” ও রত্নগর্ভা মা “শ্রীমতি কমলা নেহেরু”। বর্তমান মুম্বাইয়ের পিপলস ওউন স্কুল, ও অক্সফোর্ডের সামারভিল কলেজে তিনি পড়াশোনা করেন। এরপর শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন কিন্তু তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

 ইন্দিরা গান্ধী ফিরোজ জাহাঙ্গীরকে ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন জরা থুষ্ট্রবাদী। তাকে বিয়ে করা নিয়ে পিতা জহরলাল নেহেরুর আপত্তি ছিল। সেই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে মহাত্মা গান্ধী ফিরোজকে দত্তক সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন ফলে ফিরোজের নাম হয় ফিরোজ গান্ধী। তারপরে ইন্দিরা সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং নাম হয় ইন্দিরা গান্ধী। এভাবেই রাজনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে ইন্দিরা, গান্ধী পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠেন।

ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড়ো হওয়ার কারণে তিনি রাজনীতির জগতে খুব সহজে ঢুকে পড়েন এবং কংগ্রেস দলে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৬ সালে রাশিয়ার তাসখন্দ শহরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর “লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর” অকস্মাৎ মৃত্যু ঘটায় শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যভার গ্রহণ করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল আমেরিকা এবং অন্য পশ্চিমী দেশগুলোর প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং পাকিস্তানকে পর্যদুস্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশে সর্বতভাবে সহযোগিতা করা। এই যুদ্ধে শুধুমাত্র বাংলাদেশ জয়লাভ করেছিল তাই নয় সেই সঙ্গে ভারতের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ভারতবর্ষ সেই সময় দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠে। এছাড়াও তাঁর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বহু বহু উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশ ও দেশবাসীর স্বার্থে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ১৯৬৯ সালে ১৯শে জুলাই ১৪ টি বেসরকারি ব্যাংকের জাতিকরণ। ১৯৭১ সালে সংবিধানের ২৬ তম সংশোধনের মাধ্যমে রাজন্য ভাতা বিলোপ ও কুড়ি বছরের জন্য ভারত-রাশিয়া মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর। ১৯৭২ সালে কোল ইন্ডিয়ার জাতীয়করণ ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণীর মানুষদের জন্য “গরিবি হটাও” কর্মসূচি এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নতির জন্য শুরু করেছিলেন “বিশ দফা কর্মসূচি”। ১৯৭৩ সালে ১লা জানুয়ারি ২১২ টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানির জাতিকরণ।

 প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশের জন্য কাজ করেছেন। অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অবলীলায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার ক্ষেত্রে তাঁর যে ভূমিকা ছিল সে সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিস্কনের রক্তচক্ষু তোয়াক্কা না-করে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছিলেন তাঁর দুই আস্থাভাজন সহকর্মী পি এন হাকসার এবং ডিপি ধর। তৎকালীন জনসংঘ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ি (যিনি পরবর্তীকালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন) তিনি লোকসভায় দাঁড়িয়ে ইন্দিরা গান্ধীর এই সাফল্যের জন্য তাঁকে দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

 তবে ইন্দিরা গান্ধী যেমন সাফল্য লাভ করেছিলেন তেমনি বিপর্যয়েরও সম্মুখীন হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে দুর্নীতির অভিযোগে এলাহাবাদ হাইকোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন ভারতীয় লোকদল নেতা রাজনারায়ণ। এর ফলস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ১২ই জুন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী জয়লাভকে বাতিল করে দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি জগমোহন সিং। শুধু তাই নয় তিনি আগামী ছয় বছর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না বলেও রায় ঘোষণা করেন তিনি। যদিও পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্টে এই রায় বাতিল করে দেয়। এরই মধ্যে দেশজুড়ে ন্যায় আন্দোলন ও দেশব্যাপী বিরোধীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের ২৫ শে জুন মধ্যরাতে “অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা চালু” করেন। তাঁর এই কাজে তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়, আর কে ধাওয়ান, দেবকান্ত বড়ুয়া এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ( যিনি ১৯৮০ সালের ২৩ শে জুন এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন)। সেই সময় দেশজুড়ে শুরু হয় প্রেস সেন্সারশীপ। মুলতবি করা হয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো এবং বিরোধী দলগুলির নেতাকর্মীদের আটক করা হয়।

 ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয় ইন্দিরা গান্ধী হেরে যান রায়বেরেলি কেন্দ্রে রাজনারায়ণের কাছ থেকে। ( যিনি ১৯৭৫ সালে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে না হারানো পর্যন্ত তিনি দাড়ি কাটবেন না)। সেই সময় কেন্দ্রে গঠিত হয় মোরাজজি দেশাই-এর নেতৃত্বে জনতা পার্টি সরকার। এরপর ১৯৭৮ সালে কর্নাটকের চিকমাগালুর লোকসভা কেন্দ্রের উপ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী আরও একবার জয়লাভ করেন এবং লোকসভায় ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে জনতা পার্টি সরকার ভেঙে যায় (যে ঘটনা ভারতের রাজনীতিবিদ ইতিহাসে জুলাই ক্রাইসিস নামে চিহ্নিত হয়ে আছে)।

 এরপর ১৯৮০ ৪ ঠা জানুয়ারি আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এরপরেই পাঞ্জাবে শুরু হয় পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে খালিস্থানে আন্দোলন। যার চূড়ান্ত মোকাবিলায় ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালের ৩রা জুন অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর আদেশেই শিখদের পবিত্র ধর্মশালা স্বর্ণমন্দিরে ভারতীয় সেনা হানা দেয়। যার পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ব্লু-ষ্টার’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৮৪ সালের ৩১ শে অক্টোবর নতুন দিল্লির বাসভবনে (১ সাফদরজং রোড) নিজেরই শিখ জাতীয়তাবাদী দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর সুযোগ্য পুত্র রাজীব গান্ধী মায়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন বাংলার অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার এক সাংগঠনিক সভায় এসে। সেই সময় তাঁর সাথে ছিলেন সেই সময়কার অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় ও দেশের রেলমন্ত্রী এবি গণি খান চৌধুরী। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রাজীব গান্ধীকে নিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও গণিখান চৌধুরী অতি দ্রুত নিউ দিল্লি চলে যায়। এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন রাজীব গান্ধী।

 ১৯৯৯ সালে বিবিসি আয়োজিত একটি অনলাইন সমীক্ষায় ইন্দিরা গান্ধীকে “সহস্রাব্দের নারী” আখ্যা দেওয়া হয়। ২০২০ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে টাইম পত্রিকা কর্তৃক বিগত শতাব্দীর সংজ্ঞা নির্ধারণকারি ১০০ শক্তিশালী নারীর তালিকাভুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বহু প্রতিবাদকেই তিনি কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে ভারত অর্থনীতিতে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছিল। ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালেই নতুন দিল্লিতে দক্ষতার সঙ্গে “এশিয়ান গেমস” আয়োজন করা হয়েছিল যা তাঁর সরকারের আরও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলে মনে করা হয়।

তুখোর রাজনীতিবিদ ইন্দিরা গান্ধী তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাঁর কর্মজীবনে। সেই কারণেই আজীবন ভারতবাসী তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবেন।

Related Articles

Back to top button