স্বাস্থ্য ও শিক্ষা

“দুঃখের পরেই আলো আসে — যেমন রাত্রির পর ভোর” 

জীবনের এই সত্যটাই সবচেয়ে সুন্দর — দুঃখ কখনও স্থায়ী নয়, কিন্তু তার পরের আলো চিরস্থায়ী। 

“দুঃখের পরেই আলো আসে — যেমন রাত্রির পর ভোর”

 

ঈশানী মল্লিক

রামকৃষ্ণ দেব বলেছেন, “অন্ধকার যত ঘন হয়, আলো তত কাছাকাছি আসে।” তাই যখন জীবন কঠিন মনে হয়, তখন থেমে যেও না — কারণ তুমি ঠিক আলোর দুয়ারেই দাঁড়িয়ে আছো।

এবার দেখা যাক কিভাবে এক এক করে আলোর দিশা জীবনকে আলোকিত করতে পারে:

১) মুভ! মুভ! মুভ!

ঘরে শুয়ে-বসে থাকা যাবে না। আপনি যত শুয়ে-বসে চুপচাপ থাকবেন, আপনার শরীর তত হতাশাকে গ্রহণ করে নেবে। তাই শরীরের মুভমেন্ট বাড়ান। ব্রেন কে কনফিউজড করে দেন, যে আপনার কিছুই হয় নি। যখন আমরা হতাশ থাকি, তখন আমাদের ব্রেন আমাদের শরীরকে কাজের অনিহার সিগন্যাল দেয়। কিন্তু আপনি তার উল্টোটা করে ব্রেনকে কনফিউজড করে দিচ্ছেন। ট্রেইন করছেন যে হতাশার সময়কে কীভাবে এডপ্ট করে নিতে হবে। তাহলে হতাশা আস্তে আস্তে কেটে যাবে।

২) দৌড়ান:

হ্যাঁ, দৌড় দেন। একটা দৌড় দেন ৩০ সেকেন্ডের জন্য। আচ্ছা, থাক, ১০ সেকেন্ডের জন্য? কেন দৌড় দেবেন? দৌড় দিলে আপনার শরীর থেকে ডোপামিন বের হবে, যেটা আপনার মন ভালো করতে সাহায্য করবে। জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিন, যাতে শরীরে অক্সিজেন ঢোকে। এইটা কাজে দেয়।

৩) প্রচুর জল খান:

দিনে অন্তত ২-৪ লিটার জল পান করার চেষ্টা করুন। আপনার শরীরের প্রায় ৭০% বা তার বেশিই জল। তাই জল পান করতে হবে।

 

৪) ঘাসে খালি পায়ে হাঁটুন:

শেষ কবে খালি পায়ে ঘাসে হেটেছেন মনে পড়ে? এখন শীতকাল আসছে। ভোরের হালকা কুয়াশাতে সুযোগ পেলেই একটু খালি পায়ে ঘাসের মধ্যে হাঁটুন। কিংবা যখন সকালের হালকা রোদ উঠে যায়, তখন একটু হাঁটুন। গা-এ সূর্যের আলো লাগলো, পায়ে ঘাসের ছোঁয়া লাগলো । সব মিলিয়ে ভালো লাগবে।

৫) পিঠা খান:

শীতকালে গরম গরম গুড়ের ভাপা পিঠা নারিকেল দিয়ে বানানো, কিংবা সরিষা আর লাল মরিচের ভর্তা দিয়ে চিতল পিঠা, কিংবা পাটিসাপটা, ফুল পিঠা!! আহা… দেশে যারা আছেন দয়া করে মিস করবেন না!!! আহা, কত রকম পিঠা যে আমাদের দেশে পাওয়া যায়! জীবনকে উপভোগ করুন। এই সুন্দর শীতটা উপভোগ করুন। শীতের মতোই ঠান্ডা আর অনাবিলভাবে।

৬) নেগেটিভিটিকে দূরে রাখুন:

যে কোনো মেসেজ, বন্ধু, স্যোশাল মিডিয়া কমেন্ট, যা কিছু—যেইটা আপনার হতাশা বাড়ায়, সেটাকে জাস্ট জীবন থেকে বাদ দিয়ে দেন। আপনি যখন সামাজিক মাধ্যমে ভালো জিনিসগুলো দেখা শুরু করবেন, ফেসবুক, ইনস্টা, ইউটিউব আপনাতেই আপনাকে অনুপ্রেরণামুলক ভালো কন্টেন্ট গুলো দেখার জন্য সাজেস্ট করবে।

আপনার সকালের ঘুম ভাঙলে স্যোশাল মিডিয়ার স্ক্রলিং জুড়ে থাকবে “পাওয়ারফুল মাইন্ডসেট” আর “পজিটিভ ওয়ার্ড”, ঠিক তেমনি ঘুমানোর আগেও যেন আপনার কন্টেন্ট স্ক্রলিং লিস্টে থাকে “জীবন পরিবর্তনের ইতিবাচক চিন্তা”। আপনি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট-এর কাছে টাকা দিয়ে যেই থেরাপি নেবেন, এইটা আপনি এই অভ্যাসের মাধ্যমেও করতে পারেন।

৭) কাছের বিশ্বাসী মানুষের সঙ্গে কথা বলুন:

খুঁজে বের করেন আপনার জীবন-এর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ কে। হতে পারে এইটা আপনার বাবা – মা, হতে পারে আপনার ভাই-বোন, অথবা আপনার কোনো বন্ধু। যদি আপনি নিজের জীবনে কোনো এমন পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করছেন তবে, এমন কারোর সঙ্গে শেয়ার করবেন যে আপনার প্রাইভেসি-কে মান্যতা করে। এইটা আপনার মনকে একটু হলেও হালকা করবে।

৮) এই খারাপ সময়টা পেরিয়ে যাবে:

ভালো সময়ের খারাপ দিক হলো, এইটাও একসময় কেটে যায়। আবার খারাপ সময়ের ভালো দিক হলো, এইটাও একসময় কেটে যায়। খারাপ সময় অনন্তকালের জন্য আসে না। খারাপ সময় আপনাকে শক্ত হতে, স্বাবলম্বী হতে শেখায়, কে আদৌ কতটা কাছের তা বোঝায়। এই সময়টাতে আঁকড়ে পড়ে থাকতে হবে।

৯) নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করে দিন:

কেউ একজন ভালো চাকরি পেয়েছে? কারও আগে বিয়ে হয়ে গেছে? কেউ আগে পড়াশুনা শেষ করে ফেলেছে? তো কী হয়েছে? আপনি পিছায়ে যাচ্ছেন, এটাই তো আপনার ভয়? জীবনের এই চিন্তা ভাবনা থেকে সরে দাঁড়ান। আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজস্ব যাত্রায় হেঁটে চলেছি। কেউ হয়তো বছর ৩০-এ ব্যাংক ম্যানেজার হয়ে গেছে, আর ৩৫-এ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলো। কেউ আবার ৬৫-তে ব্যবসা শুরু করে বিশাল নাম করল। তাই, আমাদের সকলকে আমাদের জীবনের “টাইম জোন” এর মধ্যে চলতে হবে। অন্যের টাইমার-এর সঙ্গে নিজের সময়কে মেলানো যাবে না।

১০) সবারই হতাশা আছে:

এই পৃথিবীতে এই আলাদা নয়। জীবনের পথে দুঃখকে অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী করতে কেউ চায় না, কিন্তু প্রত্যেকের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে দুঃখ এসে কড়া নাড়ে।

কখনও প্রিয়জনের হারানোয়, কখনও ব্যর্থতায়, আবার কখনও অজানা ভবিষ্যতের ভয়ে। যেই মানুষের হই-হুল্লোড় দেখে কষ্ট পাচ্ছেন, হয়তো আপনি জানেন না সে ভিতর থেকে কতটা ভঙ্গুর। আমি এমনও মানুষ দেখেছি যে নাকি বাঁচবে মাত্র ৩ মাস, কিছু খেতে পারে না। তার পরও শেষ ৩ মাস সে কখনো বলে নি যে সে খারাপ আছে। সে কষ্ট পেয়ে মারা গেছে, কিন্তু কষ্ট তার মানসিক শক্তির কাছে হার মেনেছে।

মনে হয় — সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এক গভীর শিক্ষা দেয় — যেমন দীর্ঘ অন্ধকার রাতের পরেই সূর্যের আলো ফুটে ওঠে, তেমনি দুঃখের পরেই জীবনে আসে নতুন আলো, নতুন আশার ভোর।

দুঃখ আমাদের শেখায় ধৈর্য, সাহস আর আত্মবিশ্বাস। যেমন গাছ ঝড়ে নুয়ে পড়ে, কিন্তু ভেঙে যায় না — তেমনি মানুষও কষ্টে ভেঙে না পড়ে যদি শক্ত থাকে, তবে একদিন সে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। জীবনের প্রতিটি কষ্ট আসলে এক একটি পরীক্ষা, যা আমাদের ভিতরকার শক্তিকে জাগিয়ে তোলে।

১১) সাহসী হতেই হবে:

৪-৩০ কোটি শুক্রাণুর সাথে দৌড় দিয়ে, যুদ্ধ করে আপনিই একমাত্র মায়ের গর্ভে পৌঁছাতে পারছেন, যে নাকি দুনিয়াতে আসতে পেরেছে। আর এখন আপনার চোখ, কান, বিবেক আছে… চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। তাহলে এত ভয় কিসের? যে মানুষ জীবনের অন্ধকারকে সাহসের সঙ্গে মেনে নিতে পারে, সে-ই একদিন আলোর পথে হাঁটে। কারণ দুঃখ ছাড়া সুখের মূল্য বোঝা যায় না।

আজ যে চোখে জল আছে, আগামীকাল সেই চোখেই হাসি ফুটবে — যদি আমরা বিশ্বাস রাখি, আশা না হারাই।

তাই প্রতিটি ব্যর্থতা, প্রতিটি কষ্টের মধ্যেও একটা কথা মনে রেখো — “রাত্রি যত গভীর, ভোর তত কাছে।”

এই কথাগুলো আমার আপনার সবার জন্য। একদম মাথায় ঢুকায়ে ফেলতে হবে! কোনোভাবেই হতাশ হওয়া যাবে না।

Related Articles

Back to top button