জানা-অজানা

কবি,লেখক ও সাংবাদিক মৃত্যুঞ্জয় সরদার : এক সমৃদ্ধ জীবন–যাত্রার সাহিত্যিক প্রতিচিত্র

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং-২ ব্লকের আঠারোবাঁকি অঞ্চলের হেদিয়া গ্রাম—সবুজ অরণ্য, জোয়ার-ভাটার নদী, কাদামাটির দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর আর মানুষের শ্রমের ঘামের গন্ধে মোড়া এই ভূখণ্ড যেন জন্ম থেকেই তৈরি করে সাহিত্যিকের মন। সেই প্রকৃতির বুকেই ১৯৮৬ সালের ১লা নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন লেখক ও সাংবাদিক মৃত্যুঞ্জয় সরদার। তাঁর জন্মের মতোই বেড়ে ওঠাও ছিল প্রকৃতির সাথে সংলাপের, জীবনযাপনের প্রতিটি ধাপেই সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যের। এই সবকিছু মিলেই তাঁর মনোজগতে গড়ে ওঠে মানবিকতার এক গভীর, স্থির ও নিরপেক্ষ দর্শন—যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
শৈশব : মাটি, নদী ও মানুষের হাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক পৃথিবী
হেদিয়া গ্রাম, যেখানে ভোরের আলো জন্ম নেয় নদীর বুকে, যেখানে দুপুরের মাঝে মাঠের উপর কাজের শব্দ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, আর সন্ধে নামে কুয়াশার নরম চাদরে—এই গ্রামেই মৃত্যুঞ্জয় সরদারের শৈশব নির্মিত। তাঁর পিতা লালু সরদার কৃষিকাজ এবং মৎস্যজীবী পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পিতার শ্রমে ভেজা হাত, জীবনের সাথে লড়াই করে চলা মানুষের গল্প—এসবই শিশু মৃত্যুঞ্জয়ের মনে গেঁথে দেয় বাস্তবতার প্রথম চিত্রপট।
খুব অল্প বয়সেই তিনি বুঝেছিলেন, জীবন শুধু আরাম বা স্বপ্ন দিয়ে গড়া নয়; জীবন মানেই সংগ্রাম, পরিশ্রম, সততা ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। গ্রামের মানুষ, তাদের হাসি-কান্না, সম্পর্ক, অভাব-অনটন এবং আনন্দ–বেদনার টানাপোড়েন তাঁকে শেখায়—লেখক হতে গেলে মানুষের মাঝে থাকতে হয়, তাদের কথা শুনতে হয়, তাদের জীবনকে নিজের অন্তরে উপলব্ধি করতে হয়। এই তরুণ বয়স থেকেই তিনি পরিবেশ, মানুষ এবং জীবনের পরিবর্তনশীল দৃশ্য দেখে নিজেকে ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত করতে থাকেন।
গ্রামে বেড়ে ওঠা শিশুরা যেমন মাঠে দৌড়োয়, নদীতে সাঁতার কাটে, গাছের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখে, মৃত্যুঞ্জয়ও তাই করতেন; তবে তার সঙ্গে ছিল শব্দের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ। বই, খাতা, কলম—এগুলো ছিল তাঁর শৈশবের খেলনা। কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি তা মনে মনে গল্পের মতো সাজিয়ে ফেলতেন; কোনো মানুষ কথা বললে তার ভঙ্গি, তার কষ্ট, তার আনন্দ তিনি মনে মনে লিখে ফেলতেন। যেন জন্ম থেকেই তাঁর চোখ পৃথিবীকে দেখেছে লেখকের চোখে, আর মন দেখেছে সাংবাদিকের বিশ্লেষণে।
কৈশোর ও শিক্ষা : শব্দের সঙ্গে প্রথম বন্ধুত্ব
কৈশোরে প্রবেশের সাথে সাথে তিনি নতুনভাবে বুঝলেন—মানুষকে জানতে হলে, সমাজকে বুঝতে হলে, শব্দকে নিজের সঙ্গী করতেই হবে। বিদ্যালয়জীবনে তিনি লেখালেখির প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। প্রবন্ধ, রচনা, ছোটগল্প—যা-ই লিখতেন, শিক্ষকরা তা প্রশংসা করতেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ কিন্তু গভীর; শব্দ ছিল সাধারণ কিন্তু অনুভূতি ছিল বিশাল।
কৈশোরের সেই সময়টিতে তিনি উপলব্ধি করেন যে সংবাদপত্র বা বই মানুষের মন গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ। সংবাদ মানুষকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আর সাহিত্য তাকে নিজের ভেতরের আলো খুঁজে নিতে সাহায্য করে। এই দুই শক্তির সমন্বয়ে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম লেখকসত্তা।
যৌবন : সাংবাদিকতার পথে প্রথম পদক্ষেপ
জীবনের বাস্তবতার জগতে পা রাখার পর তিনি খুব শিগগিরই দেখতে পেলেন—সমাজের উন্মুক্ত রূপ শুধু গল্প নয়, বরং সংগ্রাম, অবহেলা এবং অসমতার ইতিহাসে পূর্ণ। একজন সাধারণ গ্রাম্য যুবক হিসেবেই তিনি প্রতিদিন দেখতেন—অনেক সত্য খবর শোনার অযোগ্য থেকে যায়, অনেক অবিচার পত্রিকার পাতায় আসে না, অনেক মানুষের কষ্ট কেউ তুলে ধরে না।
এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ঠেলে দেয় সাংবাদিকতার দিকে।
তাঁর কাছে সাংবাদিকতা মানে শুধু তথ্য পরিবেশন নয়; সাংবাদিকতা মানেই সমাজকে দেখা, শোনা, বুঝে নেওয়া এবং সত্যকে সামনে আনা। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কলম হবে তাঁর অস্ত্র—অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, অমানবিকতার বিরুদ্ধে।
তাঁর লেখা শুরুতেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। কারণ তাঁর ভাষায় ছিল বাস্তবতার নিষ্ঠা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, আর সত্যের প্রতি অনড় বিশ্বাস। মাঠের মানুষের জীবন, প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, সমাজের অসংগতির ছবি—সবই নিখুঁতভাবে উঠে আসতে থাকে তাঁর রিপোর্টে।সম্পাদকের আসনে : দায়বদ্ধতার নতুন অধ্যায় সাংবাদিক হিসেবে অভিজ্ঞতা বাড়তে বাড়তে মৃত্যুঞ্জয় সরদার বুঝতে পারেন—সংখ্যাতীত তথ্যের ভিড়ে সত্যকে বেছে নেওয়া, তা যাচাই করে প্রকাশ করা, এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক বিশাল দায়িত্ব। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
‘রোজদিন’, ‘বিশ্ব বার্তা প্রেস’, এবং ‘আত্মা শুদ্ধির সন্ধানে’—এই তিনটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সংবাদ, সমাজচিন্তা এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের এক বিশেষ পরিসর তৈরি করেন। তাঁর সম্পাদনার বৈশিষ্ট্য ছিল—
নিরপেক্ষতা
সত্য যাচাইয়ের কড়াকড়ি
মানুষের কথা গুরুত্ব দেওয়া
জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর প্রতি অনুরাগ
সহজ কিন্তু হৃদয়স্পর্শী ভাষা
এই সবকিছুর মিশ্রণে তিনি অনেক পাঠকের আস্থা অর্জন করেন। মানুষ তাঁর লেখায় খুঁজে পেতে থাকে বাস্তবতার প্রতিধ্বনি, আবার কখনো আধ্যাত্মিক প্রশ্নের উত্তর।
লেখকসত্তা : অনুভূতি থেকে দর্শনে যাত্রা
সাংবাদিকতার পাশাপাশি মৃত্যুঞ্জয়ের লেখকসত্তা সমান তালে এগোতে থাকে। শব্দ তাঁর কাছে শুধু প্রকাশের মাধ্যম নয়, শব্দ তাঁর কাছে অনুভূতির নদী, অভিজ্ঞতার আলো, এবং আত্মার সঙ্গে কথোপকথনের সেতু।
তাঁর সাহিত্যিক রচনায় আমরা পাই—
গ্রামবাংলার ছবি
মানুষের অন্তর্গত বেদনা
জীবনের প্রশ্ন
সময়ের নিষ্ঠুরতা
সমাজের অন্ধকার
মানবিকতার আলোকরেখা
এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের ছায়ামূর্তি
তাঁর কবিতায় থাকে মানবজীবনের অনিত্যতা, সম্পর্কের জটিলতা, প্রেমের গভীরতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণে দেখা যায় সমাজের প্রতি তাঁর দূরদৃষ্টি। তিনি মনে করেন—
“লেখক মানেই সময়ের সাক্ষী; সত্যকে লিপিবদ্ধ করা তাঁর জন্মগত দায়িত্ব।”
মানুষ ও সমাজ : তাঁর লেখার চিরন্তন কেন্দ্রবিন্দু
মৃত্যুঞ্জয় সরদার কখনোই নিজেকে ভাসিয়ে দেননি জনপ্রিয়তার জোয়ারে। তাঁর লেখার কেন্দ্রবিন্দু সবসময় ছিল মানুষ—বিশেষত সেই মানুষ যারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও নীরবে সংগ্রাম করে চলে।
তাঁর মতে—
একজন কৃষকের ঘামে দেশের রুটি তৈরি হয়
মৎস্যজীবীর পরিশ্রমে শহরের বাজার ভরে ওঠে
শ্রমিকের কঠোর প্রয়াসেই গড়ে ওঠে সভ্যতা
এইসব অকৃত্রিম মানুষদের জীবন-সংগ্রাম তিনি নিজের লেখায় তুলে ধরেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাই তাঁর রচনায় শুধু সৌন্দর্য নয়, আছে সংগ্রাম; শুধু অনুভূতি নয়, আছে বাস্তবতা।
সত্য ও নৈতিকতা : তাঁর জীবনের পরম নীতি
সত্যের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা কখনোই নড়বড়ে হয়নি। সাংবাদিকতা হোক বা সাহিত্য—তিনি সর্বদা মনে করেন, সত্যকে বিকৃত করা মানে সময়কে, সমাজকে এবং ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা।
তাই তিনি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে অনুসরণ করেন—
তথ্য যাচাই
নৈতিক নিরপেক্ষতা
প্রভাবমুক্ত বিশ্লেষণ
মানবিকতা
এই নীতিগুলো তাঁকে মানুষের কাছে আরও বিশ্বস্ত করে তোলে।
আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিক অনুসন্ধান
মানুষের জীবন তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে—অভাব, বেদনা, মৃত্যু, সংগ্রাম, সুখ, স্বপ্ন—সবকিছুতে তাঁর অন্তর স্পর্শ পেয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে গেছে।
তিনি বিশ্বাস করেন—
“মানুষের অন্তরের গভীরে একটি শুদ্ধ আলো আছে, সেই আলোই সত্যকে দেখতে সাহায্য করে।”
তাঁর অনেক রচনায় এই দর্শন ধরা পড়ে।
সময়ের সঙ্গে যাত্রা : পরিচিতিতে নয়, কর্মে প্রতিষ্ঠিত এক মানুষ
অসংখ্য অভিজ্ঞতার ভাঁজ পেরিয়ে, নিরন্তর পাঠ ও লেখার পথ ধরে, সমাজের সঙ্গে গভীর সেতুবন্ধন তৈরি করে তিনি হয়ে উঠেছেন দক্ষিণবঙ্গের সংবাদ–সাহিত্য পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। পরিচিতি তাঁর জন্য লক্ষ্য নয়—লক্ষ্য সত্যের সেবা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এবং কলমকে মানবতার রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা।
আজ মৃত্যুঞ্জয় সরদার শুধু একজন লেখক বা সাংবাদিক নন—তিনি সময়ের সাক্ষী, সমাজের চোখ, এবং মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবনের পথ এখনও নির্মাণাধীন; এই পথের পরতে পরতে রয়েছে আত্মসমালোচনা, দায়িত্ব, সংগ্রাম, এবং সত্যের প্রতি অবিচল প্রতিজ্ঞা।
যতদিন তিনি লিখবেন, ততদিন তাঁর কলম সমাজের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে যাবে।
আর তাঁর লেখার মূলমন্ত্রও একটাই—
“সত্যের পথে হেঁটে মানুষের পাশে থাকা—এই পথেই জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।”

Related Articles

Back to top button