মতামত

এবার ভেবে দেখতে হবে

ঝুমা সরকার

এই সুন্দর পৃথিবীতে প্রাণিজগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো মানুষ। বুদ্ধিদীপ্ত কর্মকৌশল ও অন্যান্য কার্যকারণের ভিত্তিতেই এই সর্বোচ্চ শিরোপা। তবুও যত দিন যাচ্ছে বেশ কিছু মানুষ তাদের কর্মকান্ডে নিজেদের মাপকাঠিকে যেন হারিয়ে দিচ্ছে বা পিছিয়ে দিচ্ছে বারেবারে।
চিত্রশিল্পী, যাঁদের অপূর্ব তুলির টানে মনমুগ্ধকর চিত্র যেন কথা বলে ওঠে, জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু যে তুলির টানে এত প্রাণ জাগে, তার উৎস কোথা থেকে! সাধারণ মানুষ কিন্তু তার খোঁজ রাখে না। ছবি আঁকার জন্য যে তুলি ব্যবহার করা হয়, তা কোন না কোন প্রাণীর লোম থেকে তৈরি করা হয়। কিছু অসৎ মানুষ, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে লোম সংগ্রহ করবার কারণে অনায়াসেই সেইসব প্রাণীকে হত্যা করে।
যে যে প্রাণীকে হত্যা করে তার লোম থেকে তৈরি তুলি বাজারে বহু দামে বিক্রি হয়। সেই সব প্রাণীদের মধ্যে আজকে যার কথা বলতে চলেছি, সেই প্রাণীটিকে শহরে ঝোপঝাড় বিশিষ্ট এলাকায় ও গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশেপাশে প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায়। সে হলো বেজি বা নেউল। সুন্দরবন অঞ্চলেও সাপ থাকার কারণে সেখানেও বেজিকে দেখতে পাওয়া যায়।
এদের লোমশ শরীর, মাঝারি মাপের, খুব তাড়াতাড়ি চলাফেরা করতে পারে। সাধারণত দিনের বেলাতেই এদেরকে দেখতে পাওয়া যায়, কারণ তখন এরা খাবার সংগ্রহে বের হয়। রাতে মাটির নিচে গর্ত করে সেখানেই বাস করে। মাঝারি মাপের এই প্রাণীটি মাংসাশী ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা মূলত সাপ, ইঁদুর খেয়েই এই সমস্ত প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এ যাবৎ পর্যন্ত।
বেজিকে সাধারণত সাপের শত্রু বলে গণ্য করা হয়। তবে এরা খুব তাড়াতাড়ি এবং খুব সহজেই সাপকে পরাস্ত করতে পারে। বেজির শরীরে এক ধরনের গ্লাইকোপ্রোটিন থাকে, যা সামান্য পরিমাণ সাপের বিষকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে সাপ যদি বেশি পরিমাণে বিষ বেজির শরীরে প্রবেশ করায় সেক্ষেত্রে বেজির মৃত্যুও ঘটতে পারে। কিন্তু বেজির রিঅ্যাকশন স্পিড অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সাপ বারবার ছোবল মারতে গিয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বেজির সঙ্গে সাপের সম্পর্ককে এই কারণেই ‘ওহি নেউল’ বলা হয়। বেজি সাধারণত মানুষকে কামড়ায় না। তবে অন্যান্য প্রাণীর মতো উলটো দিকের প্রাণীর থেকে বিপদ আশঙ্কা করলে সবাই যেভাবে আক্রমণ করে বেজিও তেমনটাই করে থাকে।
তার লোমে বানানো তুলিতেই চিত্রকরেরা ক্যানভাসে ছবি ফুটিয়ে তোলে। বেশ অনেকবছর ধরেই বেজির শরীর থেকে সংগ্রহ করা লোম দিয়েই চলছে অবৈধ ব্যবসা। এর ফলে সেই দিন দূর নয় যেদিন আরও অন্যান্য অনেক প্রাণীর মতো বেজিও প্রকৃত অর্থে বিরল প্রাণী হয়ে উঠবে।
বেজির লোম দিয়ে তৈরি হয় উৎকৃষ্ট ও উচ্চমানের তুলি। যে তুলির দাম সাতশ থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু এতদিন ধরে প্রমাণ করা যাচ্ছিল না যে, বেজির লোম দিয়েই তৈরি হয় তুলি। এবার জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া তুলির চুল থেকে বেজি শনাক্তকরণের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করল। যুগান্তকারী এই গবেষণায় জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গসন্তান। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ডিরেক্টর ডঃ ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ” নয়া গবেষণা বন্যপ্রাণী ফরেনসিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করল। বাজেয়াপ্ত করা তুলির লোম থেকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষণ করে তদন্তে সাহায্য করবে। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় তুলি তৈরি করতে খুন হয়েছে বেজি সেক্ষেত্রে দোষীর সর্বোচ্চ ছয় বছরের পর্যন্ত জেল হতে পারে”। ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২ এর সিডিউল ওয়ানে ঠাই দেওয়া হয়েছে ছয় ধরনের বেজিকেই। যার মধ্যে রয়েছে ছোট ভারতীয় বেজি, গ্রাম বাংলার জলার ধারে কাঁকড়া খেকো বেজি, ডোরা গলা বেজি, শহরাঞ্চলে দেখতে পাওয়া ধূসর রঙের বেজি ইত্যাদি।
বর্তমানে এই প্রাণীটি জীবন সংকটে রয়েছে। চোরাচালানকারীরা উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু,দিল্লি, মুম্বাই,ভারতবর্ষ,নেপাল ও বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে বেজির লোমকে পাচার করে চলেছে অবলীলাক্রমে বলে জানা যায়।
তুলির জন্য এক কেজি ব্যবহারযোগ্য লোম পাওয়া যায়, প্রায় ৫০ টি বেজি থেকে। তাই বিনা দ্বিধায় লোম সংগ্রহ করবার কারণে প্রত্যেক বছর প্রায় এক লক্ষ নিরীহ বেজিকে খুন করা হয়।
পৃথিবীতে প্রত্যেকটা প্রাণই মূল্যবান। পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রত্যেকেরই একটি অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে বলেই আমরা জানি। আমরা সবকিছু জেনেও প্রত্যেকদিন প্রকৃতির সাথে অন্যায় করে চলেছি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে প্রকৃতিও বিভিন্ন রকম ভাবে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে মাঝেমাঝেই। সবকিছু জেনে বুঝে তবু আমরা কেমন নির্বিকার থাকি। আর বোধহয় চুপ করে থাকার সময় নেই। মানুষের লোভ থেকে এইসব নিরীহ প্রাণীদেরকে বাঁচাতে না পারলে আগামী দিনে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো এদেরকে ছবিতে বা মিউজিয়ামে দেখবে। আর রোজ রোজ এইভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য ব্যাহত হলে প্রকৃতির আক্রমণ থেকেও তো আমরা কেউ নিস্তার পাবো না।
ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে থাকা “সাপ বেজি ও ব্রাহ্মণের” গল্প আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। শৈশবে যাদেরকে ঘিরে বা গল্প শুনে বেড়ে ওঠা আজকে আমাদেরই কিছু মানুষের লোভের কারণে তাদেরকে যদি হারিয়ে ফেলতে হয়, এর থেকে দুঃখের বা মর্মান্তিক ঘটনা আর কিছু নেই বোধহয়। তাই আরও একবার ভুল করবার আগে আমরা না-হয় একটু ভেবে দেখি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল।

প্রতিবেদক : কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক।

Related Articles

Back to top button