পুরুষ দিবস

ড.সোহিনী চক্রবর্তী
পুরুষ সে তো সর্বদা কঠোরতার প্রতীক। সমাজ যেমন নারী মানে কোমলতা, তেমনি পুরুষ মানে রুক্ষতা—চোখে জল না আসার এক প্রতীকী। সে হাসে কম, কথা বলে কম, অনুভব করে কম। শক্ত পেশি, দৃঢ় কাঁধ, দৃঢ় মশাল হাতে—পুরুষের সেই চিত্র সমাজের চেনা এক প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আদতে পুরুষের হৃদয়েও নরম একটি অংশ লুকিয়ে থাকে, যেটা প্রায় সময় অদেখা থেকে যায়। গত ১৯ নভেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস।পুরুষ দিবস প্রতিদিনের পুরুষকে এক অন্য চোখে দেখার সুযোগ দেয় — যে পুরুষ শুধুমাত্র শাসক নয়, কোমল হৃদয়েও তার ঘর রয়েছে। ।
আজকের পৃথিবীতে পুরুষত্বের সংজ্ঞা বদলেছে। শুধুই বল নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কোমলতা, দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং মানবিক বোধ। আর সেই বদলে যাওয়া পুরুষত্বের এক উজ্জ্বল মুখ হলো—আদিত্য তিওয়ারি। সালটা ছিল ২০১৪।আদিত্য তিওয়ারি তখন পুণের এক বহুজাতিক IT কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত।আর ৫জন সাধারণ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের মত তারও জীবন কাটছিল অফিসে প্রজেক্টে ব্যস্ততায়। একদিন অফিসের একটি CSR প্রোগ্রামে আদিত্য ও তার কিছু সহকর্মী যান একটি অনাথাশ্রমে শুধুই আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে, কর্মীদের সামাজিক দায়িত্ব কর্মসূচির একটি দিন।
সেই অনাথাশ্রমেই তাঁর জীবন বদলে যায়।সেখানে শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে একটি কোণে বসে থাকা ছোট্ট ছেলে—মুখে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, চোখে জল মাখা ভয়, আর ভেতরে অচেনা কৌতূহল।যেন ঘরভর্তি শব্দের মাঝে একা একটি নক্ষত্র জ্বলছে নিজের মতো করে।
আশ্রমের কর্মীদের থেকে তিনি জানলেন—ছেলেটির নাম বিন্নি।জন্ম থেকেই Down Syndrome আক্রান্ত বাচ্চাটি।তার এই জন্মগত ত্রুটির জন্য তার নিজের পরিবার তাকে গ্রহণ করেনি। বিশেষ চাহিদা থাকার কারণে কেউ তাকে দত্তক নিতেও আগ্রহ দেখায়নি। তাই সে পড়ে ছিল অনাথাশ্রমের চার দেয়ালের মধ্যে, যত্নের অভাবে নয়—কিন্তু ‘পছন্দ না হওয়ার’ তকমায়।
আদিত্য সেই দিনের কথা বহুবার বলেছেন—
“অনেক শিশু ছিল, কিন্তু এই এক শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, আমি ওকে ফেলে যেতে পারব না।”
যদিও তখনও তিনি ভাবতে পারেননি, এই শিশুটি তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।
কিন্তু সেই প্রথম দেখা—ছিল ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বাঁক। পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে অদ্ভুত টান অনুভব করলেন তিনি। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই সপ্তাহ শেষে আবার চলে গেলেন অনাথাশ্রমে।বিন্নি তাঁকে দেখে প্রথমে চমকে উঠেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ছোট্ট হাত বাড়িয়ে তাঁর কাছে এগিয়ে এল। সেই মুহূর্তটিই আদিত্যর ভেতরে জন্ম দিল এক অদ্ভুত অনুভূতির—
“আমি এই শিশুর জন্য কিছু করতে চাই। শুধু today নয়—forever.”ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে উঠতে লাগল।বিন্নি তাকে চিনে নিতে লাগল।
আদিত্য অনুভব করলেন—এই শিশুটি পৃথিবীর কাছে ‘অপ্রিয়’, কিন্তু তার কাছে সে অমূল্য।
চাকরি, ব্যস্ততা, জীবনের প্রতিযোগিতা—সব কিছুর মাঝে তিনি বুঝলেন, এই শিশুর একমাত্র দরকার একটি পরিবার, একটি বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর ঘর, আর নিঃশর্ত ভালোবাসা।এই উপলব্ধিই তাকে দাঁড় করায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের সামনে—তিনি শিশুটিকে দত্তক নেবেন।
এরপর শুরু হলো তার এক অসম্ভব লড়াই।ভারতে একক পুরুষের জন্য শিশু দত্তক নেওয়া সহজ জিকাজ নয়। আইন অনুযায়ী _সিঙ্গেল পুরুষ ২১ বছরের নিচে কোনো মেয়ে শিশুকে দত্তক নিতে পারে না,
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পৃথক নথি, স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, আদালতের অনুমোদন আর অনাথাশ্রমের অভ্যন্তরীণ অনেক বাধা পেরোতে হয় তাকে।
আদালতে তার দেওয়া প্রথম আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো।কারণ?“একক পুরুষ হওয়া”, “অতিরিক্ত দায়”, “শিশুটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় অতিরিক্ত ঝুঁকি”, এমনকি বলা হল—
“আপনি তরুণ, ভবিষ্যতে বিয়ে করলে স্ত্রী গ্রহণ করবে তো?”এই সব প্রশ্ন শুনে একসময় হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।কিন্তু আদিত্য থামলেন না।বরং লড়াই আরও জোরালো করলেন।
তিনি একের পর এক দরজায় কড়া নাড়লেন—
সরকারি অফিস, আদালত, দত্তক সংস্থা, শিশু কল্যাণ সমিতি—যেখানে দরকার তিনি গেছেন।
এ সময় তাঁর পরিবারও প্রথমে দ্বিধায় ছিল ছেলের এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তে যা প্রথাগত সমাজের থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন। আর তার ওপর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে বড় করা সহজ কথা নয়।কিন্তু আদিত্যর অদম্য সিদ্ধান্ত দেখে সবার মন বদলাতে শুরু করল। আইনি লড়াই দীর্ঘ হল পুরো দেড় বছর।এই দেড় বছরের মাঝে তিনি কিন্তু অনাথাশ্রমে গিয়ে বিন্নিকে দেখতে ভুলতেন না,অফিস থেকে বেরিয়ে সরাসরি আদালত, সিভিল অফিস, কাউন্সেলিং সেন্টারে ছুটে যেতেন,শিশুটির স্বাস্থ্য ইতিহাস, থেরাপি রিপোর্ট, মেডিক্যাল প্রোগনোসিস—সব সংগ্রহ করলেন,Down Syndrome কেয়ার সম্পর্কে নিজেকে প্রশিক্ষিত করলেন,
নিজের জীবনযাত্রা পাল্টে ফেললেন—নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর ডায়েট, সঞ্চয়—সবই একক অভিভাবকত্বের প্রস্তুতিতে। এমন সময় কিছু মানুষ তাঁকে উপহাস করেছিল—“ছেলে হয়ে বাচ্চা পালবে?”
“এত দায়িত্ব নেবে কেন?”
“নিজের জীবনের বারোটা বাজিয়ে দেবে।”
কিন্তু তিনি জানতেন—এ দায়িত্ব তাঁর কাছে বোঝা নয়—ঈশ্বরের দেওয়া সুযোগ। অবশেষে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি—নতুন বছরের প্রথম দিনে—হল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।আদিত্য তিওয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিন্নিকে দত্তক পেলেন।বিন্নির নতুন নাম রাখা হলো—অবনিশ।একক পুরুষ হিসেবে Down Syndrome আক্রান্ত শিশুকে দত্তক নেওয়া—ভারতে এটি প্রথম দৃষ্টান্তগুলোর একটি।যে দেশে এখনো পিতৃত্বের সংজ্ঞা ‘মায়ের পর সহযোগী’ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আদিত্য জানালেন—পুরুষও পারেন—ভালোবাসতে, লড়তে, পরিবার গড়তে, সমাজ বদলাতে।
অবনিশকে নিয়ে যখন প্রথম বাড়ি ফিরলেন, তখন তার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন অনেকগুলি চ্যালেঞ্জ চিকিৎসার খরচ,নিয়মিত থেরাপি,মানসিক বিকাশের প্রশিক্ষণ,সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সমস্যা এবং সবচেয়ে কঠিন—বাবা হওয়ার অবিরাম পরীক্ষাতবে তিনি পিছিয়ে যাননি।রাত জেগে অবনিশকে ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে তাকে নিজের হাতে খাওয়ানো, স্কুলে ভর্তি করা, স্পিচ থেরাপির ক্লাস করানো—সব করেন নিজের হাতে।একসময় তিনি তাঁর স্থায়ী চাকরিও ছেড়ে দেন—শুধু পূর্ণ সময় অবনিশের পাশে থাকার জন্য।পরবর্তীতে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ, অভিভাবক কাউন্সেলিং এবং সামাজিক কাজ শুরু করেন। ভারত জুড়ে বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা শোনান, বাবা-মায়েদের অনুপ্রাণিত করেন।
এই গল্প শুধু একটি শিশুকে দত্তক নেওয়ার গল্প নয়।এটি এক নতুন পুরুষত্বের পথ দেখায়—যে পুরুষ কোনও দম্ভ ছাড়াই ভালোবাসে, দায়িত্ব নেয় এবং সমাজের চোখে চোখ রেখে বলে—“মানবিক হওয়াই সবচেয়ে বড় পুরুষত্ব।”আজকের সমাজে পুরুষ মানেই শাসক, কঠিন, ঠান্ডা—এই ধারণা বদলাতে আদিত্যদের মতো মানুষরাই পথ দেখাচ্ছেন।পুরুষ দিবসের মূল কথা এটাই—শুধু পুরুষের অধিকার নয়,পুরুষের মানবিকতার গল্পও সামনে আনা।আদিত্য তিওয়ারি সেই গল্পের একটি উজ্জ্বল, জীবন্ত অধ্যায়। সমাজ আজও বলে—
“মা-ই সন্তানকে বড় করে।”কিন্তু আদিত্য তিওয়ারির কাছে অবনিশের প্রথম শব্দ ছিল—“বাবা।”



