মতামত

আজকের দিনের স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে ভাবিত সমাজ

 মৃত্যুঞ্জয় সরদার 

মানবসমাজের বিবর্তন, ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকেই, কিছু মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে—যাঁরা শুধু যুগকে পরিবর্তন করেন না, যুগকে পথও দেখান। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁদেরই একজন। তাঁর চিন্তা, বাণী ও আদর্শ আজও সেইরকমই দীপ্ত, যেমন ছিল দেড় শতাব্দী আগে। সময় বদলেছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে, সমাজ সংকটের নতুন নতুন রূপ সামনে আসছে; কিন্তু স্বামীজির শিক্ষা যেন এক চিরকালীন দিশারি, যা আধুনিকতার ঝড়ের মাঝেও মানবচিত্তকে স্থির ও সুদৃঢ় রাখতে পারে।
আজকের দিনের সমাজ—উৎকণ্ঠা, দ্বন্দ্ব, বিভাজন, আয়-বৈষম্য, অশিক্ষা, অস্থিরতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে ভরা। এমন এক সময়ে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী কেবল গ্রন্থে আবদ্ধ কোনো দর্শন নয়; বরং সমাজের সুস্থতা ও পুনর্গঠনের জন্য এক প্রাণতরঙ্গ, এক অপরিহার্য শক্তি।
১. আত্মশক্তি ও আত্মবিশ্বাস—আজকের প্রজন্মের প্রেরণা
স্বামীজির সর্বাধিক আলোচিত বাণী—“উঠো, জাগো”—কেবল একটি আহ্বান নয়; এটি এক মনোজাগতিক বিপ্লব। বর্তমান সমাজে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মাঝে, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, ব্যর্থতার ভয়, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মানসিক অবক্ষয় ক্রমশ বাড়ছে।
আজকের সমাজে চাকরির সংকট, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে একাকিত্ব, পরিবার ও সম্পর্কের বদলে যাওয়া মানসিকতা—সবই মিলিয়ে মানুষ যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। এমন সময়ে স্বামীজির বাণী তরুণদের মনে সাহস জাগায়—
“তোমার ভেতরেই অসীম শক্তির ভাণ্ডার। নিজেকে বিশ্বাস করো, তুমি পারবে।”
যুবসমাজ যদি এই আত্মবিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে, তবে যে কোনো পরিবর্তনের ভিত গড়ে উঠবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—সব বড় পরিবর্তন এসেছে যুবশক্তির হাত ধরে।
২. মানবিকতা ও সহমর্মিতার অভাব দূরীকরণ
স্বামীজির আদর্শের অন্যতম ভিত্তি হল—মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা।
আজকের সমাজে মানুষ ক্রমে যন্ত্রমানব হয়ে উঠছে। ব্যস্ততার চাপে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ও ইচ্ছাই হারাচ্ছে।
ধর্মীয় বিভাজন, জাতপাত, রাজনৈতিক সংঘাত, লোভ, হিংসা—এ সবই সমাজকে দুর্বল করছে। স্বামীজির মানবধর্ম এইসব সংকটের সর্বোত্তম প্রতিষেধক। তাঁর বাণী স্পষ্ট বলে—
“জীবের মধ্যে শিব, দরিদ্রের মধ্যে নারায়ণ। মানুষের সেবা না করলে কোনও ধর্মই সম্পূর্ণ হয় না।”
আজ যখন সমাজ ভেদবুদ্ধিতে ক্ষতবিক্ষত—স্বামীজির এই মানবপূজার দর্শনই আমাদের পুনরায় এক করে দিতে পারে। যদি সমাজ মানবধর্মে ফিরে আসে, তবে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার ভিত আরও দৃঢ় হবে।
৩. শিক্ষা—মানবমনের মুক্তির চাবিকাঠি
স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা নিয়ে যে ভাবনা দিয়েছিলেন, তা আজকের সমাজে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন—
“শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্পূর্ণতার বিকাশ।”
আজকের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানত নয়, পরীক্ষানির্ভর; চরিত্র গঠনের বদলে চাকরি পাওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বই-পড়ুয়া তরুণ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু মানবধর্মে পরিপূর্ণ, দায়িত্ববান নাগরিক তৈরি হচ্ছে না।
স্বামীজির আদর্শে শিক্ষার তিনটি মূল দিক—
নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ
অভ্যাস ও চরিত্র গঠন
জীবন-উপযোগী বাস্তব শিক্ষার বিস্তার
যদি আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় স্বামীজির এই আদর্শ বাস্তবায়িত হয়, তবে সমাজ শুধু শিক্ষিত হবে না; হবে সুসংহত, নৈতিক, শক্তিশালী এবং প্রগতিশীল।
৪. নারীশক্তির উন্মেষ—সমাজগঠনের মূল ভিত্তি
স্বামীজির যুগে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এমন সাহসী বক্তব্য খুব কমই শোনা যেত। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন—
“যে জাতি তার নারীকে সম্মান করতে পারে না, সে জাতি কোনোদিন বড় হতে পারে না।”
আজকের সমাজে নারীশক্তির উত্থান হচ্ছে সত্যি, কিন্তু একই সঙ্গে নারী নির্যাতন, অসমতা, নিরাপত্তাহীনতা—এগুলিও বাড়ছে।
স্বামীজির আদর্শ আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়—নারী শুধু পরিবারের ভিত্তি নন, সমাজের অগ্রগতিরও প্রধান শক্তি। নারী যদি শিক্ষিত, ক্ষমতায়িত ও আত্মবিশ্বাসী হয়, সমাজও তত দ্রুত বদলায়।
৫. ধর্মের প্রকৃত ব্যাখ্যা—অসহিষ্ণুতার অবসান
আজ ধর্মের নামে সংঘাত, হিংসা, বিভাজন দিন দিন বাড়ছে। অথচ স্বামীজির ধর্মবোধ ছিল গভীর, উদার ও সার্বজনীন। তাঁর শিক্ষা—
“ধর্ম মানে উন্নতি, স্ব-বিকাশ। ধর্ম মানে ভালোবাসা; ভেদবুদ্ধি নয়।”
তিনি হিন্দুধর্মকে উচ্চস্থানে রেখেও সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি সমাজ ধর্মকে মানুষের কল্যাণের বাহন হিসেবে দেখে, তবে বিভেদ নয়, ঐক্যই জন্ম নেবে।
৬. কর্মযোগ—অলসতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান
আজকের সমাজে অসংখ্য মানুষ কাজ না করে ফল পাওয়ার আশায় থাকে। সামাজিক দায়িত্ববোধ কমছে, ব্যক্তিস্বার্থ বাড়ছে। স্বামীজি বলেন—
“কর্মই জীবন। কর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার শক্তি প্রকাশ করে।”
স্বামীজির কর্মযোগের মতবাদ আমাদের শেখায়—
নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা
পরের উপকারের জন্য কাজ করা
নিজের মধ্যে শৃঙ্খলা আনা
অলসতা ও নির্ভরতার মনোভাব ছেড়ে দেওয়া
আজ যদি আমরা কর্মযোগকে সমাজজীবনে ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে ব্যক্তি যেমন উন্নত হবে, সমাজও তেমনি উৎপাদনশীল ও সুসংগঠিত হবে।
৭. জাতীয়তাবোধ—স্বার্থের ঊর্ধ্বে বৃহত্তর দেশপ্রেম
স্বামীজির দেশপ্রেম ছিল আধ্যাত্মিক আদর্শে ভরা। তিনি দেশকে ভালোবাসাকে কোনো রাজনৈতিক সীমানায় বাঁধেননি; তিনি বলেছেন—
“ভারতকে ভালোবাসো। ভারত তোমার মা।”
আজকের দিনে দেশপ্রেম কখনও কখনও রাজনৈতিক স্লোগানের মতো ব্যবহৃত হয়। কিন্তু স্বামীজির আদর্শ বলে—
দেশপ্রেম মানে দেশকে উন্নত করার চেষ্টা
দারিদ্র্য, অসাম্য ও অশিক্ষা দূর করার সংগ্রাম
সমাজের প্রতিটি দুর্বল মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়ানো
এমন জাতীয়তাবোধ সমাজকে সংহত করে, বিভক্ত নয়।
৮. বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
স্বামীজিকে অনেক সময় শুধু আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তিনি ছিলেন আধুনিকতার প্রতীক।
তাঁর চিন্তায় ছিল—
বিজ্ঞানকে গ্রহণ
যুক্তিবোধকে সম্মান
অন্ধবিশ্বাসের বিরোধিতা
শিক্ষায় বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচার
আজকের দিনে ভুয়ো খবর, কুসংস্কার, অন্ধভক্তি—সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
স্বামীজির আধুনিক দর্শন সমাজকে পুনরায় যুক্তিবোধে ফিরিয়ে আনতে পারে।
৯. দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়—স্বামীজির আহ্বান
সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো দারিদ্র্য ও বৈষম্য।
স্বামীজি দারিদ্র্যকে শুধু সামাজিক নয়, আধ্যাত্মিক সমস্যা হিসেবেও দেখতেন। তিনি বলেছিলেন—
“দরিদ্রই হচ্ছে নারায়ণ। তাকে সাহায্য করো—এটাই ধর্ম।”
আজ আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, গ্রামীণ পশ্চাৎপদতা—এসব সমস্যার সমাধান করতে গেলে স্বামীজির মানবতাভিত্তিক সামাজিক নীতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
১০. সামগ্রিকভাবে—স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে সমাজের পুনর্জাগরণ
আজকের সমাজ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত হলেও, স্বামীজির বাণীতে সেই অপ্রতিরোধ্য আলোকরেখা রয়েছে, যা সমাজকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে।
তাঁর দর্শনের মূলমন্ত্র—
মানুষকে ভালোবাসো
নিজেকে জানো
নিজের শক্তিতে বিশ্বাস রাখো
নিঃস্বার্থভাবে কাজ করো
ধর্মের নামে বিভেদ নয়, ঐক্য গড়ো
নারীকে শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখো
শিক্ষাকে চরিত্রগঠনেরূপে গ্রহণ করো
এই আদর্শ যদি ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজে বিস্তার লাভ করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ, উদার, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ পাবে।
উপসংহার
স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ কেবল অতীত নয়—এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। তাঁর বাণীর শক্তি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি মানুষের আত্মমহিমার কথা বলেছিলেন।
আজকের দিনে সমাজ যত অস্থির হয়ে উঠছে, স্বামীজির পথনির্দেশ ততই জরুরি হয়ে পড়ছে।
মানুষের শক্তি, কর্ম, মানবিকতা ও ঐক্যের মধ্যে তিনি যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন—আমরা যদি সেই পথে চলতে পারি, তবে এই পৃথিবী শুধু উন্নত নয়, আরও সুন্দর ও মানবিক হয়ে উঠবে।

Related Articles

Back to top button