বিপদে পড়লে স্মরণ করো রক্ষা করবে ব্রহ্মচারী বাবা লোকনাথ।

মৃত্যুঞ্জয় সরদার: মানুষ একমাত্র ভরসা করে ভগবানকে, এই মানুষ তার কর্মক্ষমতা আর ত্যাগ কারনে জগতে ঈশ্বর হয়ে ওঠেন!রণে বনে জলে জঙ্গলে যেখানে বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিবে আমি তোমাকে রক্ষা করিব।জয় বাবা লোকনাথ এই মন্ত্র জীবনের পথকে আরও সুদৃঢ. করে জীবনকে এক উন্নত ও আলোর পথের ঠিকানা দেয় ৷ প্রতিটি কাজ করার আগে বাবা লোকনাথের নাম স্মরণ করলে সেই কাজ ভাল হয়ে থাকে ৷ বারদীর ব্রহ্মচারী বাবা লোকনাথ একই অঙ্গে অনোন্য রূপ তিনি স্বয়ং ভগাবান মহেশ্বরের অবতার ৷ যাঁকে মনে মনে ডাকলে ভক্তের সকল আশা ও মনবাঞ্ছা পূরণ হয়ে থাকে ৷
তবে বাবা লোকনাথ শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন জন্মাষ্টমীতে; ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট (১৮ ভাদ্র, ১১৩৭ বঙ্গাব্দ) কলকাতা থেকে কিছু দূরে; উত্তর ২৪ পরগণার চৌরাশি চাকলা গ্রামে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতা কমলাদেবী। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ৪র্থ পুত্র।লোকনাথের জন্মস্থান নিয়ে; শিষ্যদেরও ভেতরে বিতর্ক আছে। নিত্যগোপাল সাহা এ বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা করেন ও আদালতের রায় অনুযায়ী; তার জন্মস্থান কচুয়া বলে চিহ্নিত হয়। যদিও অনেকে মনে করেন তার জন্মস্থান; বর্তমান উত্তর ২৪ পরগণার চৌরাশি চাকলা গ্রামে; যা এখন চাকলাধাম নামে লোকনাথ ভক্তদের নিকট পরিচিত।পার্শ্ববর্তী গ্রাম (কাঁকড়া) কচুয়া গ্রামে বাস করতেন; ভগবান গাঙ্গুলী নামে ভারতবর্ষের নামকরা এক পন্ডিত। এগার বছর বয়সেই গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর কাছে; একমাত্র বন্ধু বেনীমাধব সহ সন্ন্যাস গ্রহণ এবং তারপর গৃহত্যাগ করেন লোকনাথ।
বাবা লোকনাথকে নিয়ে আছে অনেক গল্প। ধর্মপ্রচারক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গাছের নীচে ধ্যানমগ্ন ছিলেন; হঠাৎ চোখ খুলে দেখেন চারিদিকের আগুনের লেলিহান শিখা; প্রচন্ড ধোঁয়ায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অজ্ঞান হবার মুহুর্তে দেখতে পান; এক দীর্ঘদেহী উলঙ্গ মানুষ তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন। যখন জ্ঞান ফিরে পান দেখেন; আসে-পাশে কোন জনমানব নেই । তিনি একা পাহাড়ের নিচে শুয়ে আছেন।পরবর্তীকালে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী নামি ধর্মপ্রচারক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।
ভারত এবং বাংলাদেশে তার অসংখ্য ভক্ত ছিল। তিনি যখন নারায়নগঞ্জ এর বারদী আসেন; তখন বাবা লোকনাথকে দেখে চিনতে পারেন। বুঝতে পারেন, ইনিই তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন।এরপর সারা ভারত এবং বাংলাদেশে প্রচারবিমুখ বাবা লোকনাথের অসামান্য যোগশক্তির কথা; প্রচার করে বেড়ান এই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তখন থেকেই মানুষ বাবা লোকনাথ সম্পর্কে জানতে পারেন।লোকনাথ বাবার বারদী আসা নিয়েও আছে গল্প। সীতাকুন্ডু থেকে বাবা লোকনাথ চলে আসেন দাউদকান্দি। এখানেই পরিচয় হয় বারদী নিবাসী- ডেঙ্গু কর্মকারের সাথে। তিনি জোর করা বাবাকে নিয়ে আসেন বারদী।বাবা লোকনাথ বলেছিলেন, “ডেঙ্গু তুই আমাকে নিয়ে যেতে চাইছিস, আমি তোর সাথে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু এই লেংটা পাগলাকে তুই কিভাবে ঘরে রাখবি।
লোকে তোকে ছি ছি করবে। সহ্য করতে পারবি। ভেবে দেখ ?”। ডেঙ্গু উত্তরে বলেছিলেন; “আমি কিছু বুঝি না, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে। লোকে যা বলে বলুক। শুধু আপনি কথা দেন – বারদী ছেড়ে কোথাও যাবেন না”।ডেঙ্গুর সাথে বাবা লোকনাথ চলে আসেন বারদী। ছোট ছোট ছেলেরা বাবাকে পাগল ভেবে; পাথর মারতে থাকে। ডেঙ্গুর পরিবারে বাবাকে নিয়ে শুরু হয় অশান্তি। বারদীর ধনী জমিদার নাগ-পরিবার; তারা বাবাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাবা থাকার জায়গা বেছে নেন; ছাওয়াল বাঘিনীর নদীর পাড়ের শ্মশানভূমি।ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই শ্মশানভূমি। দিনের বেলায় গ্রামের মানুষ যেতে ভয় পেত। এইখানেই বাবা নিজ হাতে নিজের জন্য তৈরি করেন কুটির। যা আজ সারা বিশ্বের বাবা লোকনাথ ভক্তদের কাছে; এক মহান তীর্থভূমি।
লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এই পূণ্যভূমিতে। কেঁদে, মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে; অসংখ্য মানুষ নিজেদের দুঃখের কথা জানায় বাবা লোকনাথের কাছে।বাবা বলতেন -“ওরা বড় দুঃখী, ওরা বড় অসহায়। ছোট ছোট ওদের চাওয়া গুলো পূরণ করে দেওয়ার কেউ নেই; তাই তো ওরা আমার আছে ছুটে আসে; ওদের দুঃখের কথা; কষ্টের কথা আমাকে বলতে। ওদের দুঃখের কথা আমি শুনি বলেই; আমার কাছে ওদের যত আবদার, অধিকার। সংসারের কঠিন পথ চলতে চলতে ওরা ক্ষতবিক্ষত; ওদের বিশ্বাস আমিই ওদের দুঃখ দূর করে দিতে পারি”।বাবার শিষ্যদের নিয়েও আছে অনেক গল্প। ফরিদপুর জেলার পালং থানার মহিসা গ্রামে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর জন্ম। ঢাকা ওয়ারীতে তিনি ব্রহ্মচারী যোগাশ্রম প্রতিষ্টা করেন। পরে তা ফরিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তিনি বাবা লোকনাথের স্মরণে আসেন; ১৮৮৬ থেকে ১৮৯০ সালের দিকে। বাবার একজন যোগ্য শিষ্য হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।বারদীর আশ্রমের কাছেই এক বৃদ্ধা, নাম-কমলা। সম্বল বলতে এক গরু ছাড়া কিছুই ছিল না। দুধ বিক্রি করে দিন চালাতেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের প্রশংসা শুনে; এক বাটি দুধ নিয়ে বাবাকে দেখার জন্য চলে আসেন।
বাবা লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকে কাছে টেনে নেন। লোকনাথ বাবা তাঁকে “মা” ডাকতেন বলে; পরবর্তীতে তিনি ‘গোয়ালিনী মা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি লোকনাথ বাবার আশ্রমেই কাটান।ব্রহ্মানন্দ ভারতী ঢাকার বিক্রমপুরের পশ্চিমপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক নাম – তারাকান্ত গাঙ্গুলী। আইন পেশায় ও শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের কথা শুনে; কৌতুহলবশতঃ দেখতে আসেন। পরে সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি দান করে; বাবার আশ্রমে চলে আসেন। বাবা নতুন নামকরণ করেন-ব্রহ্মানন্দ ভারতী। তাঁর হাতেই প্রথম রচিত হয়- লোকনাথের জীবন কাহিনী ও দর্শন।পরবর্তীতে কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বিজয়কৃষ্ণের শিষ্যের লিখিত ” সদগুরু সঙ্গ” প্রামান্য সাধনগ্রন্থ রূপে সমাদৃত হয়। বাবা লোকনাথের অন্যতম প্রধান শিষ্য ছিলেন মথুরা মোহন চক্রবর্তী।
“শক্তি ঔষধালয়” -এর প্রতিষ্টাতা। প্রথম জীবনে ঢাকার রোয়াইল গ্রামে; হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে করতে আয়ুর্বেদ ঔষধের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকার দয়াগঞ্জে স্বামীবাগ-এ ” শক্তি ঔষধালয়ের” ভিতরে; প্রথম লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির নির্মাণ করেন।ব্রহ্মানন্দ ভারতীর মতন আরেক ঢাকার জজকোর্টের উকিল হরিহরণ চক্রবর্তীও; বাবার দর্শন করতে এসে বারদী থেকে যান। হরিহরণের গুরুভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে; বাবা লোকনাথ নিজের ব্যবহৃত পাদুকা দান করেন। তিনি কাশীতে বাবা লোকনাথের নামে মন্দির প্রতিষ্টা করেন।সোনারগাঁর গোবিন্দপুর নিবাসী অখিলচন্দ্র সেন; উচ্ছৃখল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক জমিদার পুত্র। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কেন নিঃস্ব এক শ্মশানে থাকা মানুষের কাছে আসেন; তা জানার জন্য তিনি দেখতে আসেন। দূর থেকে দাড়িয়ে প্রায় মাঝে মাঝে এসে দেখে যান।একদিন বাবার কাছাকাছি এসে নিজের অশান্তির কথা জানান। নিজের কারনে যেসব মানুষকে কষ্ট দিয়েছে; তাদের সে কষ্টের মোচন করার উপদেশ দেন লোকনাথ বাবা। অখিলচন্দ্র বাড়ি ফিরে গিয়ে; সব সম্পত্তি গ্রামের দুঃখী মানুষের নামে দান করে দেন; এবং নিঃস্ব এক কাপড়ে বাবা লোকনাথের আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। বাবার আশীর্বাদে ও সাধনায় তিনি; “সুরথনাথ ব্রহ্মচারী” নামে খ্যাতি লাভ করেন।
বারদী নিবাসী কবিরাজ রামরতন চক্রবর্তীর ছেলে জানকীনাথ।
যৌবনে দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন । পিতা সন্তানকে আর বাঁচানোর আশা না দেখে; বাবা লোকনাথের আশ্রমে ছেলেকে দান করে যান। বাবা জানকীনাথকে বারদী আশ্রমের দেখাশুনার দায়িত্বp প্রদান করেন। গুরুকৃপায় জানকীনাথ ব্রহ্মচারী এক উচ্চ সাধক হিসাবে প্রতিষ্টিত হন। বাবার নয়নের মনি ছিলেন তিনি, অসম্ভব স্নেহ করতেন জানকীনাথকে। বাবা লোকনাথের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ হন জানকীনাথ ব্রহ্মচারী।



