আদি অনন্ত কাল হইতে শিব ও মনসা জঙ্গল অধিপত্য দেব ও দেবী

মৃত্যুঞ্জয় সরদার:সৃষ্টির অনন্তকাল হইতে মানুষ একাধিকবার পরিস্থিতির উপরে শিকার হয়ে পড়ে,সবকিছু বাধার অতিক্রম করেও মানুষ তার লক্ষ্যভেদে পৌঁছায় একটা সময়।চিরন্তন সত্য কথাগুলো আজ যেন কেমন বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে,শত বেদনা ও অসহায় যন্ত্রণা সমাজের কুসংস্কার ব্যাধি অপপ্রচার হাত থেকে বের করে নিয়েছিলাম নিজেকে।মিথ্যাচারী ভাওতাবাজ সমাজের বিশিষ্ট দের কথা ছোটবেলা থেকে বিরোধিতা করতাম। ছোট থেকেই সবকিছু জানার ইচ্ছাছিল প্রবল, সত্যটাকে খুঁজে বের করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথ চলেছি।চলার পথে বহু আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ছিলাম,আমার জ্যাঠামশাই এর ছোটবেলার বন্ধু স্বপন সরদার একজন সরকারি কর্মচারী তিনিও ছিলেন আদিবাসী। ছোট বেলায় থেকে তার সংস্পর্শে আসার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, তিনি সোনারপুর বসবাস করতেন একাধিকবার রাত্রে তাঁর বাড়িতে আমার নিশিযাপন হয়েছিল।স্বপন সরদার এর নামের পদবী ছিল সরদার আমার নামের পদবী ছিল সরদার।উনার সংস্পর্শে আসার পর আমি পড়াশুনার মাঝে আদিবাসীদের কে নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে লাগলাম বাংলা সহ বাংলার বাইরে বিভিন্ন রাজ্যে।
একপ্রকার সুন্দরবনের আদিবাসীদের কে নিয়ে গবেষণা করে চলেছি, আর সেই সূত্র ধরেই বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক ও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় আমার যাতায়াত ছিল, ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিকবার পা দিয়েছে সেই কারণেই।অজয় নদ পেরিয়ে প্রবেশ করলাম দুমকা জেলায়। ঝাড়খণ্ড রাজ্যে অসংখ্য আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস। তবে নাম যেহেতু সাঁওতাল পরগনা, তাই সাঁওতালদের নিয়ে কিছু বলা যাক,আর যেন এসব ইতিহাস আমার কাছে অজানা হতে চলেছে। সাঁওতাল আদিবাসীরা বিশ্বাস করে এদেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন একলব্য, যাঁকে অত্যন্ত অন্যায় ভাবে দ্রোনাচার্য তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুল গুরুদক্ষিণা হিসাবে চেয়েছিলেন। তাই জানেন কিনা জানিনা, আজকেও সাঁওতালরা তীর ছোড়ার সময় বুড়ো আঙুল ব্যবহার করে না। অবশ্য এরকম অন্যায় কাজের উদাহরণ তো আমাদের দেশে ভুরি ভুরি ঘটেছে- শত শত একলব্য, শম্বুকদের কথা আর কেই বা মনে রাখে !সাঁওতালরা কিসকু, মুর্মু, হাঁসদা, সরেন, টুডু,মানডি, বাস্কে এই সাতটি গোষ্ঠী বা গোত্রে বিভক্ত।তবে সুন্দর বনে র আদিবাসীরা সাঁওতালরা তারা সাঁওতাল ভাষাভাষী নয়, তারা সাদরি ভাষার আদিবাসী, এই সাদরি ভাষায় গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করছিলেন আদিবাসীর সাদরি সুষার এসোসিয়েশনের সম্পাদক ছিলেন স্বপন সরদার। বলাই তীরখী সাদরি ভাষার অক্ষর তৈরি করেছিলেন আদিবাসীদের। তবে এসব কথা আমার বলার বিষয়বস্তু নয় আদিবাসীদের দেবতা প্রসঙ্গে লেখার বিষয়বস্তু আজ।সাঁওতাল নামে এঁদের পরিচিতি পরে হয়েছে, আদিতে সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, মাহালি সবাই এরা পরিচিত ছিল খেরওয়াল গোষ্ঠী হিসাবে। পরে অনেক ছোট ছোট গোষ্ঠী খেরওয়াল গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে, অনেকে হিন্দুও হয়ে যান। কেউ কেউ মুসলমান ও হয়ে যান, যেমন দুমকা পাহাড়ের সাঁওতাল জাদুপটিয়া পটচিত্র শিল্পীরা।শুধু ঝাড় খণ্ডের কথাই যদি ধরি তাহলে দেখতে পাচ্ছি সাঁওতাল ছাড়াও ঝাড়খণ্ডে সর্বমোট ৩২ টি জন জাতির বাস।
এদের মধ্যে পুরোপুরি কৃষিজীবী জন জাতি হচ্ছে সাঁওতাল, মুন্ডা, হো,ওঁরাও , খারিয়া, ভূমিজ ইত্যাদি। পক্ষান্তরে বিরহর, পাহাড়ি খারিয়া ইত্যাদি জাতির আদিতে শিকার করাই ছিল মুখ্য জীবিকা। শিল্প এবং দৈনন্দিন ব্যাবহারের সামগ্রী তৈরি করত মালহার, লোহার, কারমালি, অসুর ইত্যাদি জনজাতি। পাহাড়িয়া জনজাতির লোকেরা ঘুরে ঘুরে কৃষিকাজ করতেন।এসেছি সিধে দুমকার এক পাহাড়তলীতে।ঘন কালচে সবুজে মোরা দুমকা পাহাড়ের কোলে বাবা চুটোনাথ মন্দিরে। ছমছম করা পরিবেশের মধ্যে দিয়ে নামছি মন্দির দর্শনে। এই মন্দির আদিতে ছিল কেবলমাত্র আদিবাসীদের পুজো স্থল, যেখানে শিবলিঙ্গের মতনই দেখতে একটি শিলা পূজিত হয়। লোকমুখে প্রচলিত যে একদা নাকি এখানে নরবলিও হত। তবে হয়তো এসবই গল্প কথা, ভয় জাগানোর জন্য। কিম্বা অনার্য সরল মানুষ গুলির বদনাম করার জন্য, শহুরে মানুষদের রটনা।সে যাই হোক, এই দেবতার থানের অপার মহিমায় বাঙালি, বিহারী, আদিবাসী সবাই বিশ্বাসী। তাই পরে চুটোনাথ থানের আদি শিলাপুজোর স্থলের একদম পাশেই একটি নতুন মন্দির ও দুধ সাদা শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করা হয়, নাম দেওয়া হয় চুটোনাথ শিবমন্দির । এছাড়াও এক বৃহৎ বাঁধানো পুষ্করণীও নির্মিত হয়। মন্দিরের গোড়ায় এক কিশোরী পুজোর ডালি বিক্রি করছে।শিবমন্দিরটি এবং দুধসাদা শিবলিঙ্গ দেখে মন ভরে গেল।এখানের নিয়ম হচ্ছে প্রথমে চুটোনাথ শিবমন্দির দর্শন করে শেষে আদিবাসীদের পূজিত চুটোনাথ বাবার পুজোর থানে পুজো দিতে হবে। আদিবাসী পুরোহিতের নাম প্রকাশ পুচর। এরা সবাই প্রায় ঝাড়খণ্ডের পাহাড়িয়া উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষ, সাঁওতাল নয়। আসলে ঝাড়খণ্ডের অধিকাংশ জনজাতির মতই সাঁওতালরা প্রকৃতির উপাসক, মূর্তি পুজো করেনা। জানেন কি জানিনা- ঝাড়খন্ড শুধু নয়, সারা ভারতের অধিকাংশ আদিম জনজাতি কিন্তু মা দুর্গার একেবারে বিপক্ষে, মা দুর্গা এঁদের প্রিয় রাজা ঘোরাসুর বা মহিষাসুরকে অন্যায় ভাবে বধ করেছেন বলে এঁদের বিশ্বাস। অবশ্য ওদের কথা ব্রাহ্মণ্যবাদী সংখ্যাগুরু সমাজ অর্থাৎ আমরা শুনতেই চাই না। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র যা হয়- সমাজের ক্ষমতাবান গোষ্ঠী তাদের আধিপত্য দেখিয়ে পরাজিত, দুর্বল গোষ্ঠীর কথা শুনতেই চায় না, বাধ্য করে পরাজিত গোষ্ঠীর ওপর নিজের বিশ্বাস, নিজের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার।তবে মহাদেও বা শিব ঠাকুর কিন্তু এঁদের প্রিয় দেবতা। আদতে শিব ঠাকুর তো এঁদেরই পূজ্য দেব ছিলেন। অনেক পরে চালাক চতুর আর্যরা শিবকে বৈদিক দেবতায় উন্নীত করে। তাই চুটনাথ বাবার থানেও শিবলিঙ্গের মতন দেখতে একটি পাথর এবং একটি বৃহৎ ত্রিশূল ছাড়াও আরো অসংখ্য ছোট ত্রিশূল গাঁথা আছে । পুরো পুজোর জায়গাটা লাল কাপড়ে ঘেরা।
এছাড়াও যে কোন হিন্দু মন্দিরের মতন অসংখ্য ঘন্টা ঝুলছে।শিবলিঙ্গের মতন দেখতে পাথরটির উপর চাল দিয়ে তৈরি দেশি মদ বা হাঁড়িয়া, ঢালা- ই এই পুজোর প্রধান উপাচার। পুজোর জন্য এই মদ আদিবাসীরা নিজেরাই তৈরি করে, শিশিতে ভরে রাখেন।রাস্তার ধারের দোকানে এই শিশি বিক্রিও হচ্ছে।বলিও হয় বলে শুনলাম। এই বলি-ও নাকি অন্যরকম, কোন রকম হাঁড়িকাঠ নেই।একজনই একহাতে পুজোর পশু ধরে, অন্যহাতে কাস্তের মতন ছুরি চালায়। খড়গ ব্যবহার করা হয়না। তবে আমরা যাবার আগেই তিনটি বলি সম্পন্ন হয়েছে, তাই সৌভাগ্য যে বলির দৃশ্য দেখতে হল না।সুজাতা অবশ্য বাবার মাথায় ঘটি করে জলই ঢালল। কিন্তু ছেলেদের জন্য হাঁড়িয়ার শিশি থেকে হাঁড়িয়া ঢালাই লোকাচার বা নিয়ম। তাই আমাকেও পুরোহিতের সঙ্গে সঙ্গে বাবার মাথায় হাঁড়িয়া ঢালতে হোল। এ যেন এসেছি শিব ঠাকুরের আপন দেশে অর্থাৎ এই শিবলিঙ্গের মতন শিলা খন্ডটি এঁদের কাছে কেবলমাত্র ঠাকুরই নন, একদম নিজের ঘরের আপন লোক।মদ ঢালা ভেজা বেলপাতা এবং বাতাসা ভক্তিভরে গ্রহণ করলাম। কিন্তু পুরোহিতের আদেশে এই প্রসাদ প্লাস্টিক ব্যাগ বা কোন থলিতে নেওয়া যাবেনা। পাঞ্জাবি বা শাড়ির খুঁটে বেঁধে আনতে হবে। আমার পরনে যদিও পাঞ্জাবি ছিল কিন্তু দেশি গামছা শাড়ির আঁচলেই বাঁধা হোল, আদিবাসী লৌকিক দেবতার প্রসাদ।মা দুর্গাকে সহ্য না করতে পারলেও, মা কালী কিন্তু অনেক আদিবাসীদের কাছে পরম প্রিয় পূজ্য দেবী। তাই চুটোনাথ বাবা গাছের নিচে অবস্থান করলেও, মন্দিরের হাতায় একটিমাত্র বাঁধান মন্দিরে মা কালী বিরাজমান। আমরা ভগবান বা ঈশ্বরকে বহু প্রাচীনকাল থেকে মান্যতা দিয়ে এসেছি আজও দিচ্ছে। আমরা ঈশ্বর কাকে বলি ঈশ্বরের সৃষ্টি বা কিভাবে, সে কথাগুলো লিপিবদ্ধ না করলে আজ হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাই অনিষিক্ত রূপে সে কথা স্বীকার করাটাই অনিবার্য।পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন সেই ঈশ্বর যিনি সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আছেন এবং থাকবেন এবং তিনিই প্রকৃত আরাধ্য। ঈশ্বর, পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন নিরাকার, কিন্তু তিনি চাইলেই যে কোন সাকার রুপ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমব্রহ্মের এক সাকার রূপ ধরা হয় এবং পরমেশ্বর মানা হয়। এখন কেউ যদি বলেন শ্রীকৃষ্ণ না শিবই আমার কাছে পরমেশ্বর তাতেও ভুল নেই কারণ তিনি যাঁকেই ডাকুন না কেন, সেই পরেমশ্বর কেই ভজনা করছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কৃষ্ণ বড় নাকি শিব বড়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের সৃষ্টিখন্ডে ঈশ্বর শিবকে বলছেন ” যে তোমার ও আমার মাঝে বিভেদ করবে তার মত পাপী আর পৃথিবীতে নেই”।মূল কথা হচ্ছে ঈশ্বর একজন তিনি নিরাকার বা সাকার, আমরা যাকেই ভক্তি বা পূজা করিনা কেন তা সেই ঈশ্বরকেই করা হয়। আমারা বিভিন্ন রুপের মূর্ত্তিকে পুজা করি তা কিন্তু ঈশ্বর থেকে আলাদা মনে করে না, মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকেই পূজা করা হয়। ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপ কল্পনা করে আমরা পূজা করেলেও ঈশ্বর কিন্তু সেই একজনই। অনেকে প্রশ্ন করেন ভাত সোজা করে না খেয়ে এত ঘুরিয়ে খাও কেন? গীতায় ঈশ্বর বলেছেন — “যে আমাকে যেভাবে ডাকবে আমি তাকে সেভাবেই ফলদান করব”। হিন্দু ধর্ম যে কতটা উদার তার প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। আমি যেভাবে, যেরুপে তাকে ডাকব তিনি সেভাবেই আসবেন তা সে ৩৩ কোটির যে কোন একটা হোক না কেন।আমাদের দেহে যে আত্মা আছে, তা সকল ধর্মেই বিশ্বাস করে। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল আত্মার উৎস অর্থাৎ পরমাত্মা। আর প্রতিটি জীবের শরীরে যে আত্মা আছে তা হচ্ছে জীবাত্মা। সকল ধর্ম কর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়া অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মুক্ত হওয়া।
পুরষ্কার অথবা শাস্তির শেষ আছে, মানে ভাল কাজের জন্য স্বর্গভোগ আর খারাপ কাজের জন্য নরকভোগ আছে। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, দুই টাকায় ভালো করে ১০ টাকার মিষ্টি খাবেন তা হবে না। পাকা হিসাবে যতটুকু ভাল ততটুকুই মিষ্টি। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য কিন্তু স্বর্গ নয় সেই পরমাত্মার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া, এর আর কোন শেষ নাই।আত্মার কোন ধ্বংশ বা শেষ নাই। এটা এক দেহ হতে অন্য দেহে গমন করে মাত্র। দেহের পরিবর্তন হয়, শিশু হতে কিশোর আবার কিশোর হতে যুবক, কিন্তু আত্মার পরিবর্তন নাই। গীতা অনুযায়ী মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা ও পুরাতন জীর্ন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে গমন করে। একটু আধুনিক ভাবে বলা যায়, দেহ হচ্ছে প্রোগ্রাম করা কোন যন্ত্র আর আত্মা হচ্ছে এর ব্যাটারী যখন এই দুই একত্রিত হবে তখনই যন্ত্র সচল হবে এখানে ব্যাটারী দিয়ে কথা তা যে যন্ত্র বা শরীরে সেট করা হোক না কেন, এর চালনা শক্তি থাকলেই চলে। সে কারণে এক স্ট্রার দুই সৃষ্টি, এই মহাশক্তি কি আমরা ভিন্ন রূপে আরাধনা করি। কখনো দেবী দুর্গা, কখনো মা মনসা, কখনো তারা মা, আবার কখনো শিব, কখনো সভ্যতার প্রাকৃতিক রূপে। তবে মনস’ শব্দের স্ত্রী লিঙ্গে ‘আপ’ প্রত্যয় করে মনসা শব্দের ব্যুৎপত্তি। সুতরাং এই দিক থেকে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দেবী ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ পুরান বলেন – সর্প ভয় থেকে মনুষ্যদের উদ্ধারের জন্য পরম পিতা ব্রহ্মা কশ্যপ মুনিকে বিশেষ মন্ত্র বিশেষ বা বিদ্যা আবিস্কারের কথা বলেন। হয়তো এখানে বিষের ঔষধ আবিস্কারের কথা সেই সাথেও বলা হয়। কশ্যপ মুনি এই বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। তখন তাঁর মন থেকে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। তিনটি কারনে দেবীর নাম হয় মনসা।
সা চ কন্যা ভগবতী কশ্যপস্য চ মানসী ।
তেনৈব মনসা দেবী মনসা বা চ দীব্যতি ।।
মনসা ধ্যায়তে যা চ পরমাত্মানমীশ্বর ম্ ।
তেন যা মনসা দেবী তেন যোগেন দীব্যতি ।।
আত্মারামা চ সা দেবী বৈষ্ণবী সিদ্ধযোগিনী ।’ —- ( দেবীভাগবত পুরাণ )প্রথমতঃ মনসা কশ্যপ মুনির মানস কন্যা, কেননা চিন্তা ভাবনার সময় মুনির মন থেকে উৎপন্না। দ্বিতীয় মানুষের মন তদীয় ক্রীড়া ক্ষেত্র, তৃতীয়তঃ নিজেও মনে মনে পরমাত্মার ধ্যান করেন বলে দেবীর নাম মনসা। মন মানুষের শত্রু আবার মন মানুষের মিত্র হতে পারে। “মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ।” মন যদি শুদ্ধ, একাগ্র চিত্ত, নিজ বশীভূত, ভগবৎপরায়ণ হয় – ত সেই মন মোক্ষের কারন। তাই এই মনকে ‘মিত্র’ বলা যাবে। কিন্তু মন যদি অশুদ্ধ, চঞ্চল, ইন্দ্রিয় পরায়ণ, ভগবৎ বিমুখ হয়- ত সেই মন নরক গমনের হেতু। এই মন হল শত্রু মন। কশ্যপ মুনি মানব কল্যাণের জন্য ঔষধ আবিস্কারের কথা ভেবেছিলেন – তাই তাঁর মন থেকে দেবীর সৃষ্টি হল। তাই শাস্ত্রের এই শিক্ষা যে, আমাদের সর্বদা কল্যাণকর, হিতকর, ভগবানের কথা-ইত্যাদি মনে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।মনসা আদিবাসী দেবতা। পূর্বে শুধু নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। মনসার সাথে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের আত্মীয়তা কীভাবে গড়ে উঠলো সেই কথাটা একটু বলি। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন, বরং তিনি একজন হিন্দু দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। হিন্দু দেবী হিসেবে তাঁকে নাগ বা সর্পজাতির পিতা কশ্যপ ও মাতা কদ্রুর সন্তান রূপে কল্পনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ্ মনসাকে শিবের কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সময় থেকেই প্রজনন ও বিবাহ রীতির দেবী হিসেবেও মনসা স্বীকৃতি লাভ করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শিব বিষপান করলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন; সেই থেকে তিনি বিষহরি নামে পরিচিতা হন। তাঁর জনপ্রিয়তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মনসার পূজকেরা শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও অবতীর্ণ হন। শিবের কন্যারূপে মনসার জন্মকাহিনি এরই ফলশ্রুতি। এর পরেই হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। শ্রী আশুতোষ ভট্রাচার্য তার মনসামঙ্গল নামক সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘’এখন দেখিতে হয় পশ্চিম-ভারতের ‘মনসা’ নামটি কখন হইতে জাঙ্গুলী দেবীর পরিবর্তে ব্যবহৃত হইতে আরম্ভ হয়। পূর্বেই বলিয়াছি জাঙ্গুলির সঙ্গে বৌদ্ধ সমাজের সম্পর্ক ছিল, তিনি তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবী ছিলেন। পাল রাজত্বের অবসানে সেন রাজত্বের যখন প্রতিষ্ঠা হইল, তখন এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিলোপ ও তাহার স্থানে হিন্দুধর্মের পুনরাভ্যুত্থান হইয়াছিল, সেই সময়ে যে সকল বৌদ্ধ দেবদেবীকে নুতন নাম দিয়া হিন্দুসমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হইয়াছিল, এই সর্পদেবী তাহাদের অন্যতম। বৌদ্ধ সংস্রবের জন্য তাঁহার জাঙ্গুলী নাম পরিত্যাক্ত হয় এবং তাহার পরিবর্তে মনসা নামকরণ হয়। বাংলার পূর্বোক্ত অর্বাচীন পুরাণগুলি ইহার কিছুকাল মধ্যেই রচিত হয় এবং তাহার মধ্য দিয়া মনসাকে শিবের কন্যারুপে দাবী করিয়া হিন্দু-সমাজের মধ্যে গ্রহণ করা হয়।’’
মনসা দেবী বা সর্প দেবী হিসাবে পুজা বোধ হয় বৌদ্ধ ধর্ম থেকে এসেছে বৌদ্ধ গ্রন্থেই সর্প দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় । ‘বিনয়বস্তু’ ও ‘সাধনমালা’ নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে সর্পের দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে সর্পের দেবীর বর্ণনা আছে। ‘সাধনমালা’ গ্রন্থে সর্প দেবীকে ‘জাঙ্গুলি’ বা ‘জাঙ্গুলিতারা’ বলে উল্লেখ করা আছে। প্রাচীন যুগে সাপের ওঝাকে বলা হতো জাঙ্গুলিক (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস — ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় জাতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ‘মঞ্চাম্মা’ বা ‘মনোমাঞ্চী’। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর মতে মঞ্চামা নাম থেকেই ‘মনসা’ নামের উৎপত্তি। আবার ডাঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য বৌদ্ধ সর্প দেবী জাঙ্গুলিকেই ‘মনসা’ বলে মানেন। তাঁর মতে — “অত্যন্ত প্রাচীনকাল হইতেই এই পূর্ব ভারতীয় বৌদ্ধ সমাজে জাঙ্গুলীদেবীর পূজা প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার সূত্র গ্রন্থ ‘সাধনমালা’-তে এই জাঙ্গুলী দেবীর পূজার প্রকরণ ও তাহার মন্ত্রের সম্বন্ধে বিস্তৃত উল্লেখ আছে। তাহা হইতে সহজেই অনুমতি হইতে পারে যে, এই জাঙ্গুলীদেবী বর্তমানে সমাজে পূজিতা সর্প দেবী।” গবেষকদের মতে মনসা অনার্য দেবতা, পরে আর্য দের পুরানে স্থান পেয়েছেন। গবেষকরা বলেন বঙ্গদেশ ছিল জঙ্গলে ভরা। সাপের উপদ্রব ছিল বেশী। বাংলা ছিল কৃষি প্রধান। এই বিষাক্ত সাপেদের সাথেই তাঁদের বসবাস ও দ্বন্দ্ব। একটি বিষাক্ত প্রানী, যার ছোবোলেই মৃত্যু। তাই ‘মনসা পূজা’ বঙ্গদেশে বিশেষ প্রসার পায়। ত্রিপুরা, ওড়িশা, আসাম, দুই বঙ্গ, বিহারে এই পূজোর প্রচলন বেশী। হিমালয়ের পাদদেশে জঙ্গলে ছিল সাপেদের অবাধ বিচরণ ভূমি। মানুষের বসতি বাড়লো, সাপেদের সাথে সংঘাত বাড়লো। প্রথমে নিম্ন জাতির মধ্যে এই পূজোর প্রসার থাকলে কালক্রমে ব্রাহ্মণ্য দেবী হয়ে ওঠেন মা মনসা।



