বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসাবে আমেরিকাকে ছাপিয়ে গেছে চীন
অতিমারীতে বিধ্বস্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুরনো দুনিয়ার গর্ভ থেকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন দুনিয়া। সবার অলক্ষ্যে।
কিন্তু সেই খবর পুরোপুরি আড়াল করে রাখছে পুঁজিবাদী দুনিয়ার সংবাদপত্রগুলি। খবরটা এরকম। বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসাবে বিতর্কহীন ভাবে উঠে আসছে চীন। সেই চীন যা গত ৭০ বছর ধরে শাসন করছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। যাঁরা গত শতকের মার্কসবাদের তত্ত্বকে একেবারে গীতার শ্লোকের মতো, ঋগ্বেদের মন্ত্রের মতো অনড়, অপরিবর্তনীয় বলে মনে করেন, সোভিয়েত মডেলের বাইরে সমাজতন্ত্রের অন্য কোনও মডেল হতে পারে— এমন ভাবনার সাহসটুকুও যাঁরা দেখাতে পারেন না, তাঁদের কাছে এই চীন পুঁজিবাদী, মতাদর্শগতভাবে অধঃপতিত।
আর দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নায়ক যে দেশ, সেই আমেরিকা কিন্তু চীনকে কমিউনিস্ট চীন বলেই মনে করে। হঠাৎ করে হুঁশ ফেরার পর তারা নানা যুদ্ধজোট গঠন করে চীনকে সামরিকভাবে ঘেরাও করে যুদ্ধে জড়াতে চাইছে। মোদির ভারতকেও তারা এই ষড়যন্ত্রে সামিল করে ফেলেছে। এভাবে চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যকে আটকে দিতে চাইছে।
২। আইএমএফ ও চীনের অর্থনীতি
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আইএমএফ-এর ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটপুট ২০২০ রিপোর্ট। তাতেই দেখা যাচ্ছে, চীন আমেরিকাকে টপকে এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি।
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। এখন আইএমএফ ব্যবহার করছে আরও নির্ভরযোগ্য এবং আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে স্বীকৃত মাপকাঠি। সেটা হল পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি)। সেই মাপকাঠিতে এখন চীনের অর্থনীতির মোট পরিমাণ হল ২৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং একই মাপকাঠিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মোট পরিমাণ ২০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অঙ্কের ফারাকটা এখানে খুবই স্পষ্ট।
আইএমএফ যে পিপিপি পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদিয়ে জানা যায় কোনও একটি দেশ তাদের নিজস্ব মুদ্রায় বিভিন্ন দেশে কত পরিমাণ পণ্য কিনতে পারে। এর আগে অর্থনীতিবিদেরা জিডিপির হিসাব কষার জন্য এমইআর বা মার্কেট এক্সচেঞ্জ রেট ব্যবহার করতেন। তবে তাতে আসল সংখ্যার হদিশ পাওয়া কঠিন। এমইআর পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত একটা সন্দেহও রয়েছে কারণ এতে কোনও একটা দেশের মুদ্রায় অন্য দেশের পণ্য যতটা কেনা যায়, সাধারণত তা কমিয়ে দেখানো হয়। ফলে ডলারের বিনিময়ে অনেক দেশের মুদ্রার মূল্যই এমইআর পদ্ধতিতে কমিয়ে দেখানো হয়।
পিপিপির ভিত্তিতে হিসাব কষার পর আইএমএফ-এর বলছে, চীনের অর্থনৈতিক উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বহুল পরিমাণে ছাপিয়ে গেছে। আইএমএফ তাদের রিপোর্টে স্পষ্ট বলেছে, পিপিপি ‘বিভিন্ন অর্থনীতির মধ্যে দামের মাত্রার ফারাকটা মুছে দেয়’, এবং এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিগুলিকে এমনভাবে বিচার করে যাতে হিসাব কষা হয় একটা দেশ তাদের নিজেদের দেশের মুদ্রা ব্যবহার করে অন্য দেশের পণ্য কতটা কিনতে পারে। ওই সব দেশে সব পণ্য যে দামে বিক্রি করা হয়, সেই দামেই কেনার পরিমাণের হিসাব কষা হয়।
আইএমএফ এই পদ্ধতি গ্রহণ করার পর, সিআইএ-ও এমইআর থেকে পিপিপি মডেলে চলে গেছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির বার্ষিক পরিমাপের সময় সিআইএ এখন পিপিপিই ব্যবহার করে। সিআইএর ফ্যাক্টবুকে বলা হয়েছে যে, জিডিপির সরকারি বিনিময় হারের পরিমাপ (the official exchange rate measure of GDP) চীনের উৎপাদনের পুরোপুরি নিখঁুত হিসাব নয়। সরকারি বিনিময় হারে জিডিপি (এমইআর জিডিপি) গোটা বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে চীনের উৎপাদনের প্রকৃত মাত্রাকে কমিয়ে দেখায়। চীনের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের উৎপাদনের তুলনা করার জন্য পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটিতে জিডিপির হিসাব করাটাই সেরা উপায়।’
প্রচলিত পদ্ধতির বৈষম্য দূর করার জন্য দ্য ইকনমিস্ট পত্রিকা তৈরি করেছে একটা নতুন পদ্ধতি। এর নাম দ্য বিগ ম্যাক ইনডেক্স। কোনও দেশের মুদ্রার মান সঠিক কিনা তা বুঝতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ঘটনা হল, এক মার্কিন ডলারে আমেরিকায় যত পরিমাণ পণ্য কেনা যায়, সেই এক মার্কিন ডলারে চীনে কেনা যায় তার দ্বিগুণ পরিমাণ পণ্য। অথচ এখন চালু রয়েছে মার্কেট এক্সচেঞ্জ রেট তাতে এই ব্যাপারটা আদৌ স্পষ্ট হয় না।
দ্য ইকনমিস্টের বক্তব্য হল, ‘২০১৯ সালে চীনের শ্রমিকেরা উৎপাদন করেছিলেন ৯৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি মূল্যের পণ্য ও পরিষেবা। ওই বছর আমেরিকা উৎপাদন করেছিল ২১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য ও পরিষেবা। যেহেতু গত বছর এক ডলারের দাম ছিল ৬.৯ ইউয়ান, তাহলে ডলারের বাজার দরে গড়ে চীনের জিডিপির মূল্য ছিল মাত্র ১৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা আমেরিকার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু আমেরিকায় এক ডলারে যতটা পণ্যে কেনা যায়, চীনে ৬.৯ ইউয়ানে কেনা যায় তার চেয়ে বেশি পণ্য। একটা উদাহরণ হল ম্যাকডোনাল্ডের বিগ ম্যাক। চীনে একটা বিগ ম্যাকের দাম ২১.৭০ ইউয়ান অথচ আমেরিকায় এর দাম ৫.৭১ ডলার। এটা দ্য ইকনমিস্টের সংগ্রহ করা তথ্য। এই হিসাবে দেখলে এক মার্কিন ডলারে যা কেনা যায় সেই একই পরিমাণ পণ্য কিনতে লাগে ৩.৮ ইউয়ান। যদি হিসাবটা এরকমই হয়, তাহলে চীনের ৯৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান দিয়ে কেনা যাবে ২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য। (অথচ আমরা আগেই দেখেছি, পিপিপি পদ্ধতির হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মোট পরিমাণ ২০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।) এর মানে আসলে চীনের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই আমেরিকার চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
৩। অবিশ্বাস্য অগ্রগতি
এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য ঘটনা যে, গত টানা ৩০ বছর ধরে চীনের অর্থনীতির বিকাশের হার প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে চোখধাঁধানো অগ্রগতি ঘটিয়েছে চীনএবং চীনের অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নতির পিছনে রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সামরিক শক্তি, বিশ্বমানের প্রতিরক্ষা যন্ত্রপাতি তৈরি করা এবং সংগ্রহ করা — সবকিছুতেই অপ্রিতরোধ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছে চীন।
আইএমএফ-এর ডেটা নিয়ে আলাদা করে কাজ করেছে ব্লুমবার্গও। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির যে অগ্রগতি, তাতে চীনের অনুপাত ২০২১ সালে ২৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়াবে ২৭.৭ শতাংশ। ব্লুমমার্গ তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, এটা হল ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বিন্দু বেশি যা গোটা বিশ্বের প্রত্যাশিত উৎপাদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারের চেয়ে অনেক বেশি (higher than the US share of expected global output)।
আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী আগামী বছর চীনের আর্থিক বৃদ্ধির হার হবে ৮.
২ শতাংশ। এটা এবছরের এপ্রিলে পেশ করা আইএমএফ-এর হিসাবের চেয়ে পুরো ১ শতাংশ বিন্দু কম। তবুওআগামী বছর চীনের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এক-চতুর্থাংশ।
৪। নীরব কেন মিডিয়া?
তাহলে প্রশ্ন মিডিয়া কেন এই খবর সামনে আনছে না। বিতর্কের উর্ধে্ব থাকা এই সব তথ্যকে কেন অর্থনীতিবিদরা সামনে আনছেন না।? এই নীরবতা থেকে কারা লাভ হচ্ছেগোটা বিশ্ব একথা আর অস্বীকার করতে পারবে না যে চীন এখন সুপার পাওয়ার। চীন যে এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি, এই সত্যকে আর কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখা যাবে না। একেবারে শীর্ষে উঠে আসবে চীন এটা অবধারিত ছিলই। কিন্তু গোটা ঘটনা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটে যাবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। তাহলে কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে ট্রাম্পের পেটোয়া সংবাদ মাধ্যম চীনের এই সাফল্য সম্পর্কে নীরব?
৫। সমাজতন্ত্র, সোভিয়েত ও এখনকার রাশিয়া
এক সময়ে সমাজতান্ত্রিক শিবির রক্ষার স্বার্থে সামরিক শক্তির বিচারে আমেরিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিকাশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি সোভিয়েতের পার্টি। দীর্ঘকালীন অবহেলাজনিত সেই সঙ্কট থেকে পরে তারা রেরোতেও পারেনি। এর চড়া দাম চোকাতে হয়েছিল ১৯৯০ সালে যখন লক্ষ লক্ষ সোভিয়েত জনতা, সেনাবাহিনী ও পার্টির সামনেই ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছিল বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর জেরে বিশ্বজুড়ে ফের আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যায় পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ। তারই চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা দেখছি এখনকার নয়া উদারবাদী দুনিয়ায়, যেখানে মানবসম্পদ, জল , জঙ্গল সহ বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ লুন্ঠন চলছে। তৈরি হয়েছে সীমাহীন বৈষম্য।
ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভের সোভিয়েতকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী বলেছিলেন মাও। বিপরীতে এনেছিলেন তিন দুনিয়ার তত্ত্ব। এনেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তত্ত্ব ও অনুশীলন। সোভিয়েত ভাঙার পর প্রমাণ হয়েছিল যে সে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে উৎপাদনের উপকরণের সামাজিকীকরণের চরিত্র বদল করা হয়নি ক্রুশ্চভ বা ব্রেজনেভের আমলে। নিয়ন্ত্রণ অনেক সমস্যা ছিল। তবে সমাজতন্ত্রেরর মূল কথা, উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা বিসর্জন দেওয়া হয়নি। ১৯৯০ এর পর সেই কাঠামোকে জোর করে ভেঙে সোভিয়েতে নিখাদ বাজার অর্থনীতি চালু করতে চেয়েছিল আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ। সেই প্রচেষ্টা তিরিশ বছর পরেও সফল হয়নি। পুতিনের রাশিয়া নিশ্চয়ই সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়। আবার খুল্লমখুল্লা বাজারি অর্থনীতিও নয়। সাবেক সোভিয়েতের সর্বত্র, বিশেষত বৃহৎ কৃষি ও বৃহৎ শিল্পে রাষ্ট্রীয় মালিকানার আড়ালে রয়ে গেছে অ-ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিপুল আধার। এখনও যে আমেরিকা কথায় কথায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে কিংবা কমলা বিপ্লব ঘটিয়ে একেবারে রুশ সীমান্তের দোরগোড়ায় ন্যাটোর সমরাস্ত্র বসাতে চায়, তার মূল কারণ রাশিয়া এবং অধিকাংশ সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র আনখশির বাজারি অর্থনীতি চালু করেনি। সেখানেই যত রাগ আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের। সেজন্য নরডিক গ্যাস সরবরাহের অবরোধ জারি করে আমেরিকা কিংবা ইউক্রেনে বা বেলারুশে কমলা বিপ্লব ঘটিয়ে তারা সেখানে বাজার অর্থনীতির শক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। সোভিয়েতের ভাঙন তাই অসমাপ্ত। চলছে তিরিশ বছর পরেও। ইতিমধ্যে সামরিক শক্তিতে প্রায় শক্তিধর হয়ে উঠেছে পুতিনের রাশিয়া। প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া ও ইরান। সেকারণে পুনঃশক্তিধর রাশিয়াকে নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই সিআইএ সহ মার্কিন ডিপ স্টেটের।
৬। বিশ্বযুদ্ধহীন সাম্রাজ্যবাদের পর্বে চীনের উত্থান
এরই মধ্যে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়ে বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হিসাবে উঠে এসেছে চীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই পৃথিবীতে বহু স্থানিক যুদ্ধ, প্রতিবিপ্লব, নয়া উপনিবেশবাদী অভ্যুত্থান ঘটলেওতৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়নি। ফলে উপনিবেশ দখল ও পুনর্দখলের জন্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের অবশ্যম্ভাবিতা, লেনিন সূত্রায়িত সাম্রাজ্যবাদের বহুতর সংজ্ঞার মধ্যে এই একটি সংজ্ঞার খুঁটিয়ে বিচার বিশ্লেষণও এই সময় পর্বের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে নতুন করে ভাববারর সময় এসেছে। একথা বলছি কারণ, ১৯৭০ থেকে ২০২০, এই ৫০ বছরের আরও একটা বিশ্বযুদ্ধ যে হল না, স্থানিক যুদ্ধ সত্ত্বেও জারি রইল অর্ধশতক ব্যাপী বিশ্বযুদ্ধহীন পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্র্রের বিকাশের একটা দীর্ঘ পর্ব, সেই পর্বেই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বাজার ও পরিকল্পনার নিয়মকে যুগপৎ কাজে লাগিয়ে উঠে এল চীন, যে এখন সর্বক্ষেত্রে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত (ঘোষিত মতাদর্শগত যুদ্ধকে চীন সুকৌশলে দুটি বিকল্প অর্থনৈতিক পথের লড়াইয়ে পরিণত করেছে। এর একদিকে রয়েছে চূড়ান্ত শোষণ ও বৈষম্যমূলক নয়া উদারবাদ, অন্যদিকে বাজার ও পরিকল্পনার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া (আধা সামন্ততান্ত্রিক, অাধা ঔপনিবেশিক, অ-পুঁজিবাদী) দেশে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক বিকল্প মডেল যা আবার স্তালিন যুগের অর্থনীতির হুবহু অনুকরণ নয়)। সাম্রাজ্যবাদ এবং সমাজতন্ত্র — এই দুই ব্যবস্থার লড়াই জারি থেকেছে বিশেষ করে সোভিয়েত মডেলের পতনের পর থেকে। এবং সেই লড়াইয়ে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাকে কোণঠাসা করে অর্থনৈতিক সাফল্যের শীর্ষে উঠে এসেছে চীন। এখন চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, ভেনেজুয়েলা, ইরান, সিরিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দে — এই ধরনের দেশগুলি মিলে গড়ে উঠতে পারে একটা আমেরিকা বিরোধী বিশ্ব মঞ্চ। জার্মাানি ও ফ্রান্স যদি নিজেদের বাজারের স্বার্থে এই জোটের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং আমেরিকার সঙ্গে হাত না মেলায়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন ও ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন দুনিয়ার বদলে উঠে আসতে পারে একটা মাল্টিপোলার বা বহু মেরু বিশিষ্ট বিশ্ব, যেখানে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার একাধিক সুযোগ থাকবে। আর এভাবেই আগামী এক দশকের মধ্যে উবে যেতে পারে আমেরিকা ও ইউরোপ কেন্দ্রিক দুনিয়া যা গত শতকের গোড়ায় জন্ম নিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির গর্ভ থেকে। তার বদলে আমরা পেতে পারি একটা বহপাক্ষিক বিশ্ব যা বিকল্প দিশায় সভ্যতার উন্নয়নের পথ দেখাতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে যদি অস্ত্রের জোরে ধ্বংস করতে চায় আমেরিকা, তবে তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, কারণ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে ইতিমধ্যে গো হারান হেরে বসে আছে আমেরিকা। শুধু সামরিক শক্তির আগ্রাসনে সাম্রাজ্যবাদ যে নিজেদের পরাজয় ঠেকাতে পারবে না , হিটলারের জার্মানিই তার প্রমাণ।
(চীনের অর্থনীতির তথ্য সূত্র —EurAsian Times, ১৮ অক্টোবর, ২০২০)
©দেশকাল ভাবনা


