কলকাতাজেলারাজ্য

অগ্নিনির্বাপণ বিধি না মানায় লাইসেন্স বাতিল কামালগাজির আরতি হাসপাতালের

স্বাস্থ্য দফতরের কঠোর সিদ্ধান্তে চাঞ্চল্য, উদ্বিগ্ন রোগী-পরিজন

 

স্টাফ রিপোর্টার,কামালগাজি: হাসপাতালে ভরসা নিয়ে মানুষ আসে চিকিৎসার আশায়। অথচ সেই হাসপাতালেই যদি ন্যূনতম অগ্নি নিরাপত্তার পরিকাঠামো না থাকে, তবে ভয়—আতঙ্ক হওয়াই স্বাভাবিক। ঠিক সেই কারণেই কামালগাজির আরতি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করল স্বাস্থ্য দফতর। নির্দেশে জানানো হয়েছে, আগামী ২৫ নভেম্বর,২০২৫ থেকে এই হাসপাতাল একটিও নতুন রোগী ভর্তি করতে পারবে না। ২৪ নভেম্বর সোমবারের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি থাকা সমস্ত রোগীদের ছেড়ে দিতে হবে—সরকারি নির্দেশে এমনই কঠোর বার্তা এসেছে।

হাসপাতালের অভিযোগ, “আড়াই বছরের হাসপাতাল, তবু অগ্নিনির্বাপণের ছাড়পত্রের জন্য দফতরে দফতরে দৌড়তে গিয়ে বারবার হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। কাগজপত্র জমা দিয়েও অনুমোদন মেলেনি।”

স্বাস্থ্য দফতর কিন্তু যুক্তিকে নস্যাৎ করে স্পষ্ট জানিয়েছে, সবার আগে রোগী সুরক্ষা। এই বিষয়ে কোনো গাফিলতি আপোষ করা যাবে না।

হঠাৎ এহেন সিদ্ধান্তে বিশৃঙ্খলা, রোগী-পরিজনের দুশ্চিন্তা, হাসপাতালের সামনে দেখা যায় উদ্বিগ্ন রোগী ও পরিজনদের ভিড়। কেউ গাড়ি ডাকছেন তো কেউ হন্যে হয়ে বেড খুঁজছেন অন্য হাসপাতালে। চিকিৎসক-আয়া-নার্সদের মুখেও চাকরির হারানোর আতঙ্কের ছাপ।

প্রশাসন তরফে জানা গেছে, অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স ছাড়াই টানা আড়াই বছর চালানো—বিপদের উপর বিপদ ডেকে আনা। তাই সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও সঠিক ও প্রয়োজনীয় ছিল।

 

পাশাপাশি, জেনেসিস হাসপাতালের লাইসেন্সও ঝুলন্ত অবস্থায়। কসবার জেনেসিস হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মাস দুই আগেই। চিকিৎসায় গাফিলতি ও বাড়তি বিল নেওয়ার অভিযোগে ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়।

১১ মাস কেটে গেলেও রোগীর পরিবার সেই ক্ষতিপূরণ পায়নি। শুনানির দিনও আদালতে হাজিরা দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে কমিশনের কঠোর মন্তব্য —

“ক্ষতিপূরণের নির্দেশ মানেনি, তাই নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ করা হবে।” লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিকর্তার কাছে। এখনও পর্যন্ত জেনেসিস হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

এখনো পর্যন্ত যে জায়গায় দাঁড়িয়ে শহরের এই দুটি হাসপাতালের হাল:

১) দক্ষিণ ২৪ পরগনা স্বাস্থ্য জেলার অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে বলা হয়েছে—আরতি হাসপাতালকে একাধিকবার নোটিস পাঠানো হয়েছিল অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার এক্সিট, দু’মুখো সিঁড়ি, স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিন্কলার—সবকিছুই মানদণ্ডের তুলনায় অপর্যাপ্ত। কিন্তু হাসপাতাল সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি।

২) স্বাস্থ্য দফতরের একটি সূত্র বলছে—হাসপাতালের ফায়ার অডিট রিপোর্ট শূন্য। প্রয়োজনীয় মেশিন বা জরুরি বহির্গমন পথ কোথাও সঠিকভাবে নেই। ফলে শীতের মরশুমে আগুন লাগার প্রবণতা বাড়ায় দফতর আরও সতর্ক হয়েছে।

৩) স্থানীয় প্রশাসনেরও অভিযোগ—হাসপাতাল সম্প্রসারণের নাম করে অতিরিক্ত বেড বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা নথি আপডেট করা হয়নি।

৪) আরতি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ পাল্টা বলেছেন—

“ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ছাড়পত্রের জন্য কাগজে সই, সংশোধন, পুনরায় জমা—অসংখ্য দফায় আমাদের দৌড়তে হচ্ছে। আমরাও চাই নিয়ম মানতে। কিন্তু প্রশাসনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সময় লেগে যাচ্ছে।”

এর পাল্টা জবাবে দফতরের বক্তব্য,

“অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স নেই—এটা ‘প্রক্রিয়া চলছে’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। রোগীর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কোনও হাসপাতালকে ছাড় দিচ্ছি না।”

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাজ্যের সংবেদনশীলতা বেড়েছে

২০১১ পার্ক স্ট্রিটের আগুন থেকে শুরু করে ধূপগুড়ি, হাসপাতালে ছোট-বড় আগুন লাগার ঘটনায়—স্বাস্থ্য দফতর এখন স্পষ্টতই আরও কঠোর।

হাসপাতালগুলিকে নিয়মিত ফায়ার অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আরতি হাসপাতালের ক্ষেত্রে নিয়ম না মানাতেই এই কড়া পদক্ষেপ।

কামালগাজির আরতি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে মুখ থুবড়ে পড়েছে গোটা ব্যবস্থা।

একদিকে দফতরের দাবি—নিরাপত্তা সবার আগে,

অন্যদিকে হাসপাতালের দাবি—প্রশাসনের জটিলতা ও দেরির কারণে এই পরিস্থিতি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— রোগীদের জীবন-মরণ যেখানে জড়িয়ে, সেখানে কোনও শিথিলতা চলবে কি? স্বাস্থ্য দফতরের আজকের সিদ্ধান্ত যেন সেই প্রশ্নের উত্তরই স্পষ্ট করে দিল।

Related Articles

Back to top button