জেলা

মৃত ব্যক্তির নামে দুই ডেথ সার্টিফিকেট! ভুয়া ওয়ারিশ দেখিয়ে জমি রেকর্ড পরিবর্তনের অভিযোগ”

নিজস্ব প্রতিবেদন | দক্ষিণ ২৪ পরগণা
মৃত্যুর সাত বছর পর এক অবিবাহিত ব্যক্তির ‘স্ত্রী’ আবিষ্কার—এ কি কেবল প্রশাসনিক ভুল, না কি সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও দুর্নীতির চক্র? দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং-২ ব্লকের জীবনতলা থানার অন্তর্গত হেদিয়াবাদ মৌজায় এমনই এক বিস্ফোরক অভিযোগে তোলপাড় স্থানীয় প্রশাসন।
অভিযোগকারী মৃত্যুঞ্জয় সরদার জানান, তাঁর জ্যাঠামশাই দুঃখীরাম সরদার ছিলেন আজীবন অবিবাহিত। ১৮ মে ২০১৮ সালে তিনি হেদিয়াবাদে নিজ বাসভূমিতে পরলোক গমন করেন এবং আমঝাড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার আমঝাড়া শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেই অনুযায়ী আঠারোবাঁকী গ্রাম পঞ্চায়েতের বার্থ অ্যান্ড ডেথ সাব-রেজিস্ট্রার ৬ জুন ২০১৮ তারিখে যথাযথভাবে ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেন।
পরবর্তীতে সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে আঠারোবাঁকী গ্রাম পঞ্চায়েতের তৎকালীন প্রধান লীলা মণ্ডল ৮ জুন ২০২৩ তারিখে একটি ওয়ারিশান সার্টিফিকেট ইস্যু করেন, যেখানে মৃত দুঃখীরাম সরদারের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর ভাই লালু সরদারের নাম উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, জীবনতলা থানার অধীন হেদিয়াবাদ মৌজার ২৩০৪ নং খতিয়ানে ১৪৯১/১৪৯৩ দাগে মোট ৭৫ শতক শালি জমি দীর্ঘদিন ধরে দুঃখীরাম সরদারের নামেই রেকর্ডভুক্ত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ২৬ মে ২০২৫ তারিখে সেই জমি অভিযোগকারীদের অগোচরে জনৈকা বাসন্তী সরদারের নামে নতুন ২৩২৯ নং খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হয়ে যায়।
এই ঘটনায় বিস্মিত হয়ে ২৮ মে ২০২৫ তারিখে অভিযোগকারী ক্যানিং-২ বিয়েলআরও দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানান। তার পরিপ্রেক্ষিতে ৪৭/২৫ নং মিস কেস রুজু হয় এবং ১০ জুন ২০২৫ তারিখে শুনানির দিন ধার্য হয়।
শুনানিতে অভিযোগকারী পক্ষ সমস্ত বৈধ নথি পেশ করে দাবি করেন—দুঃখীরাম সরদার অবিবাহিত ছিলেন, অতএব তাঁর কোনো স্ত্রী থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অপরপক্ষে বাসন্তী সরদার দুটি ওয়ারিশান সার্টিফিকেট ও একটি ডেথ সার্টিফিকেট পেশ করেন, যেগুলিকে অভিযোগকারী পক্ষ সম্পূর্ণ ভুয়ো ও জাল বলে দাবি করেছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী যেখানে একবারই মৃত্যুর নিবন্ধন হওয়ার কথা, সেখানে দুঃখীরাম সরদারের নামে আঠারোবাঁকী গ্রাম পঞ্চায়েতের বাইরে তাম্বুলদহ-১ গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ২৮ মে ২০১৮ তারিখে আরেকটি ডেথ সার্টিফিকেট কীভাবে ইস্যু হল—তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, এটি স্বাস্থ্য দপ্তরের একাংশ ও পঞ্চায়েত স্তরের যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়।
ওয়ারিশান সার্টিফিকেট নিয়েও বিস্তর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। বাসন্তী সরদার একদিকে ২০ মে ২০২৫ তারিখে পত্রসংখ্যাবিহীন একটি ওয়ারিশান সার্টিফিকেট জমা দেন, আবার ২৯ মে ২০২৫ তারিখে ইস্যু হওয়া আরেকটি সার্টিফিকেটে তাঁকে মৃত দুঃখীরাম সরদারের ‘স্ত্রী’ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ ওই দ্বিতীয় সার্টিফিকেট ইস্যুর আগেই, ২৬ মে ২০২৫ তারিখে জমি নতুন খতিয়ানে তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত হয়ে যায়।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যে ব্যক্তি জীবদ্দশায় অবিবাহিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর হঠাৎ ‘স্ত্রী’ আবির্ভাব কি নিছক প্রশাসনিক বিভ্রান্তি, না কি পরিকল্পিত প্রতারণা?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের ভূমিকাকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রেভিনিউ ইনস্পেক্টর সরেজমিন তদন্ত না করেই সন্দেহজনক সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে একটি মনগড়া রিপোর্ট দেন, যার ফলে জমির রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়। এমনকি বাদী ও বিবাদী—উভয় পক্ষেই একই ব্যক্তির নাম থাকা সত্ত্বেও পরিবারকে নোটিশ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শুনানির পর সার্টিফিকেটগুলির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সিআইডি বা উপযুক্ত সংস্থার তদন্ত চেয়ে লিখিত আবেদন করা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
এই ঘটনায় প্রশাসনিক দুর্নীতি, জাল নথি প্রস্তুত ও সরকারি জমি রেকর্ডে কারচুপির গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, জাল সার্টিফিকেট প্রস্তুতকারী ও সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং দুঃখীরাম সরদারের জমি পূর্ব খতিয়ানে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
এখন দেখার—এই ‘মৃতের স্ত্রী’ রহস্যের জট খুলতে প্রশাসন আদৌ সক্রিয় হয়, নাকি নথির আড়ালে চাপা পড়ে যাবে আরেকটি বড় দুর্নীতির অধ্যায়।

Related Articles

Back to top button