MY CATAGORYআত্মাশুদ্ধি

কাকুরগাছীর অলৌকিক আশ্রয়

শহরের কোলাহলের মাঝেও বিশ্বাসের নীরব ঠিকানা
স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠা, মানতে ভরসা—কাকুরগাছীর মা মনসা (২১, মতিলাল কলোনি)

ঈশানী মল্লিক


“মনসা পূজা এক দিনে থেমে থাকে না—বাংলার বহু পরিবারে তা একটি ‘ঋতুচক্র’: নাগপঞ্চমীর প্রতীক-স্থাপন থেকে শুরু করে ভাদ্রের কৃষ্ণা পঞ্চমীতে সমাপন—লোকাচার আর স্মৃতির ভিতরে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ আরাধনা।”

কলকাতার কাকুরগাছী মানেই আজ ফ্লাইওভার, হাসপাতাল, ব্যস্ত বাজার আর নিরন্তর যাতায়াত। কিন্তু এই আধুনিকতার ভিড়ের মাঝেই, ২১ নম্বর মতিলাল কলোনির এক শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাসের এক লোকায়ত আশ্রয়—কাকুরগাছী মা মনসা মন্দির। এখানে মা মনসা কোনও জাঁকজমকপূর্ণ তীর্থনগরীর দেবী নন; তিনি পাড়ার মেয়ে, বিপদের সময় ডেকে নেওয়া আপনজন।
এই মন্দিরের মাহাত্ম বোঝাতে কোনও শাস্ত্রপাঠের প্রয়োজন পড়ে না। এখানে অলৌকিকতা লেখা আছে মানুষের মুখে-মুখে ফেরত আসা গল্পে, স্বপ্নাদেশে, মানত-পূরণের নিঃশব্দ অভিজ্ঞতায়।

স্বপ্নাদেশেই সূচনা
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, এই মন্দিরের জন্ম কোনও পরিকল্পিত উদ্যোগে নয়। বহু বছর আগে এই এলাকার এক ভক্ত স্বপ্নে মা মনসার দর্শন পান। স্বপ্নেই মা তাঁকে নির্দেশ দেন—এই স্থানেই তাঁর সেবা শুরু করতে হবে। ঘুম ভাঙার পর সেই স্বপ্নকে অবহেলা করা যায়নি। প্রথমে খোলা জায়গায় একটি ছোট ‘থান’ বসানো হয়। ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়ে পড়ে পাড়ায়। কেউ দুধ নিয়ে আসেন, কেউ প্রদীপ জ্বালান, কেউ শুধু মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেন।
এইভাবেই একটি স্বপ্ন থেকে জন্ম নেয় বিশ্বাসের কেন্দ্র। পরে পাড়ার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বর্তমান মন্দির কাঠামো। ভক্তদের বিশ্বাস—স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠিত বলেই এখানে মায়ের কাছে বলা কথা অন্যভাবে পৌঁছয়।
থান থেকে মন্দির: এক সামাজিক ইতিহাস
এই মন্দির কোনও বড় ধর্মীয় সংস্থা বা ট্রাস্টের নয়। এটি গড়ে উঠেছে পাড়ার মানুষের শ্রম, দান ও বিশ্বাসে। শুরুতে ছিল কেবল একটি প্রতীকী স্থাপনা, পরে ভক্তের সংখ্যা বাড়ায় ছাউনির ব্যবস্থা, তারপর পাকাপোক্ত কাঠামো। এই বিবর্তন আসলে শহুরে লোকায়ত ধর্মচর্চার এক জীবন্ত দলিল।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এমন মন্দিরগুলো কেবল উপাসনালয় নয়—পাড়ার সামাজিক স্মৃতিভাণ্ডার। এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসে নিজের গল্প রেখে যায়।

কে কে মায়ের শরণ নেন
এই মন্দিরে আসা ভক্তদের মধ্যে যেমন রয়েছেন স্থানীয় গৃহস্থ পরিবার, তেমনই আছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ, সেলিব্রিটি, আধিকারিক, কর্মকর্তা অনেকেই।

বিশেষ করে—
সাপে কাটা বা সর্পভয়ের আশঙ্কা
দীর্ঘদিনের অসুখ
সন্তানকামনা
ব্যবসা বা জীবিকার জটিলতা
মানসিক অস্থিরতা
এই সব কারণেই মানুষ মায়ের কাছে মানত করেন।
শ্রাবণ মাস, নাগপঞ্চমী ও মনসা পূর্ণিমায় ভিড় বাড়ে। তবে মঙ্গলবার ও শনিবারেও নিয়মিত ভক্তসমাগম চোখে পড়ার মতো।

  • নারীকেন্দ্রিক লোকবিশ্বাসের কেন্দ্র
    এই মন্দিরে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। সংসারের নিরাপত্তা, সন্তানের মঙ্গল, পরিবারের শান্তির জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন বহু নারী। লোকধর্মের ধারায় মা মনসা বরাবরই নারীকেন্দ্রিক দেবী—এই মন্দিরে সেই সামাজিক বাস্তবতা স্পষ্ট।

  • সেবাপদ্ধতি: আড়ম্বর নয়, আস্থা
    এখানে পুজো মানেই জটিল আচার নয়।
    দুধ, দূর্বা, কলা, বেলপাতা, ফুল, প্রদীপ ও ধূপ—-
    এই সামান্য উপাচারেই সম্পন্ন হয় মায়ের সেবা। অনেকে নির্দিষ্ট দিন উপবাস রাখেন, কেউ বা কেবল নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।

 

ভক্তদের কথায়, “মা এখানে বড় কিছু চান না—বিশ্বাসটাই আসল।”
অলৌকিকতার গল্প, বিশ্বাসের ভাষা

  • মন্দির ঘিরে বহু অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়। মা কে ফুল মালা পরানো হলে যতক্ষণ না মা আশীর্বাদ দিয়ে ফুল ভক্তদের জন্য ফেলেন ততক্ষণ মায়ের সকালের আরতি শুরু হয় না।
  • কেউ মাকে মনের কথা বলে মানত করে যান। মানত পূর্ণ হলে দণ্ডি রাস্তা থেকে দণ্ডী খেটে মায়ের মন্দিরে আসেন।
  • কেউ বলেন, সাপে কাটা রোগী দ্রুত সুস্থ হয়েছেন
  • কেউ বলেন, বহুদিনের আটকে থাকা কাজ হঠাৎই মিটে গেছে।
  • বহু মানুষ মাকে দূর দূরান্ত থেকে সোস্যাল মিডিয়া আর মাধ্যমে মাকে মানত করেন। মা পূর্ন করলে মাকে এসে পুজো দিয়ে যান।

  • একজন ভক্ত কানাডা থেকে সন্তান লাভের জন্য মানত করে পূর্ণ হওয়ায় কানাডা থেকে সন্তান নিয়ে মন্দিরে এসে পুজো দেন।
  • কারোর চাকরি হচ্ছে না, শরীরের রিপোর্ট ভালো আসছে না মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না।
  • দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তো বহু মানুষ আসেন।
  • কেউ আবার স্বপ্নে মায়ের নির্দেশ পেয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন।

  • বহু মহিলার দীর্ঘদিন ধরে বাচ্চা হয় না। মায়ের কাছে এসে সন্তান লাভ হয়েছে। গোপাল দিয়ে গেছেন।

  • ক্যান্সার হলে মায়ের জল আর ডাক্তারের চিকিৎসায় অনেক মানুষ ভালো হয়েছেন।
    —– এই সব ঘটনার কোনও লিখিত নথি নেই। কিন্তু ভক্তদের বিশ্বাসেই এগুলি বাস্তব। এখানে অলৌকিকতা প্রমাণের অপেক্ষায় থাকে না—অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ।

চিকিৎসা ও বিশ্বাস—দুটি পথ পাশাপাশি

এই মন্দিরে পুজো মানে আধুনিক চিকিৎসা অস্বীকার নয়। বরং বহু ভক্তই বলেন, তাঁরা ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি মায়ের কাছে মানত করেছেন। লোকধর্মে এই দ্বৈত বিশ্বাস নতুন নয়—আধুনিকতা ও আধ্যাত্মিকতা এখানে পাশাপাশি হাঁটে।

  • স্থানীয় ভক্তের কথায়:

বাইট ১
“আমার ছেলের ছোটবেলায় সাপের ভয় ছিল খুব। এখানে মানত করার পর থেকে আর কোনও সমস্যা হয়নি। তাই প্রতি বছর মনসা পূর্ণিমায় আসি।”
শিল্পী দেবী, স্থানীয় বাসিন্দা

বাইট ২
“অনেক জায়গায় গেছি। কিন্তু এখানে এসে মনে হয় মা কথা শোনেন। বড় কিছু চাইনি, শুধু শান্তি চেয়েছিলাম।”
সুব্রত পাল, ভক্ত

বাইট ৩
“এই মন্দির পাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে। আমরা ছোট থেকে দেখে আসছি। মা আমাদের পরিবারের অংশ।”
মাধবী দত্ত, প্রবীণ ভক্ত

প্রজন্মান্তরের ভরসা
অনেক পরিবারেই শোনা যায়—ঠাকুরদা-ঠাকুমা এখানে মানত করেছিলেন, বাবা-মা পুজো চালিয়ে গেছেন, এখন সন্তানরাও আসে। এই ধারাবাহিকতা মন্দিরকে কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, জীবন্ত পারিবারিক স্মৃতির কেন্দ্র করে তুলেছে।

শহরের মাঝেই লোকায়ত দেবী
উচ্চ অট্টালিকা, ব্যস্ত রাস্তাঘাটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির যেন মনে করিয়ে দেয়—কলকাতা কেবল আধুনিক শহর নয়, সে আজও বিশ্বাসের শহর। এখানে মা মনসা দেবীমাত্র নন; তিনি ভরসা, আশ্রয়, আর বিপদের সময় ডেকে নেওয়া নাম।

  • তথ্য-বক্স
  • মন্দিরের নাম: কাকুরগাছী মা মনসা মন্দির
  • ঠিকানা: ২১, মতিলাল কলোনি, কাকুরগাছী, কলকাতা
  • নিত্য পুজো: সকাল বেলা শুধুমাত্র মন্দিরে পুজো নেওয়া হয়। সকাল ৭ থেকে দুপুর ১২ পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। মাকে ফুল, মালা, যার যা মনের ইচ্ছা দিয়ে পুজো দিতে হয়। প্রনামি যার যেমন ক্ষমতা সেটা বাক্স তে মানুষ দেন। মন্দিরের ভেতরে ধূপ ও মোমবাতি জ্বালানো নিষিদ্ধ। বিকেল সাড়ে চারটার থেকে ৬ টা পর্যন্ত মন্দির ভক্তদের দর্শনের জন্য খোলা রাখা হয়। কোনো পুজো গ্রহণ করা হয় না। রবিবার সকলের জন্য মায়ের মন্দির বন্ধ থাকে।
  • বিশেষ তিথি: নাগপঞ্চমী, মনসা পূর্ণিমা, শ্রাবণ মাস
  • পুজোর দিন: সারা বছর, বিশেষ ভিড় মঙ্গলবার ও শনিবার
  • পুজোর ধরণ: লোকায়ত, সহজ সেবা—দুধ, ফুল, প্রদীপ।

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর:
কাকুরগাছীর মা মনসা মন্দির প্রমাণ করে, শহরের বুকে দাঁড়িয়েও লোকবিশ্বাস নিঃশব্দে টিকে থাকে। এখানে দেবী কোনও মূর্তিতে সীমাবদ্ধ নন—তিনি ভক্তদের স্মৃতি, স্বপ্ন আর অভিজ্ঞতায় জীবিত। তাই আধুনিক কলকাতার মানচিত্রে এই মন্দির শুধু একটি ঠিকানা নয়, বিশ্বাসের এক চিরস্থায়ী আশ্রয়।

 

মা মনসা যন্ত্র:

“যন্ত্র কেন প্রতীক”—(বিশ্বাস বনাম বাস্তবতার সীমারেখা)
“মনসা পূজার সময়কাল”—নাগপঞ্চমী থেকে ভাদ্র কৃষ্ণা পঞ্চমী
মা মনসার যন্ত্র–রূপ: লোকবিশ্বাস, তন্ত্রধারা ও বঙ্গসংস্কৃতির এক অন্তর্গত পাঠ
বাংলার ঘরে ঘরে মনসা—একদিকে “বিষহরী”, অন্যদিকে সংসারের অদৃশ্য আশঙ্কা, সাপের ভয়, দুর্ঘটনা ও আকস্মিক বিপদ থেকে রক্ষার প্রতীক। দেবীর পূজা যে শুধু মূর্তিতে হয়, এমন নয়—বাংলার বহু অঞ্চলে মা মনসা পূজিত হন প্রতীকে: ঘট, সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপি, বা উঠোনে সিজ (সিজগাছ/সিজুয়া) স্থাপন করে। নাগপঞ্চমী থেকে ভাদ্র কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত এক মাস মনসা-আরাধনার লোকাচার বহু জায়গায় দেখা যায়।
এই প্রেক্ষিতেই “মা মনসার যন্ত্র”—একটি তান্ত্রিক/ধ্যান-ভিত্তিক প্রতীকচিত্র—এই দিনে অনেকের ঠাকুরঘরে জায়গা পাচ্ছে। তবে মনে রাখা জরুরি: যন্ত্র কোনও ‘ম্যাজিক অবজেক্ট’ নয়; শাস্ত্র-লোকাচারে যন্ত্রকে ধরা হয় ধ্যান, সংকল্প, সাধনা ও রক্ষাকবচ-ভাবনার একটি প্রতীক হিসেবে—যার কার্যকারিতা ভক্তির সঙ্গে যুক্ত বলে বিশ্বাস করা হয়, চিকিৎসা বা বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়।

১) মা মনসার যন্ত্র কী?
যন্ত্র বলতে তন্ত্রধারায় বোঝায়—কয়েকটি জ্যামিতিক আকার, বীজাক্ষর/মন্ত্রাক্ষর, পদ্ম, বৃত্ত, ত্রিভুজ ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত দেবতাতত্ত্বের “রূপহীন-রূপ”।
মনসা-যন্ত্রের ক্ষেত্রে লোকজ ব্যাখ্যায় সাধারণত দেখা যায়:
বৃত্ত/বেষ্টনী: রক্ষা-চক্র বা সুরক্ষা বলয়
সর্পচক্র/নাগবেষ্টনী: ভয়, বিষ, দুর্ঘটনা প্রতিহত করার প্রতীকী ভাব
পদ্মাসনে দেবী: স্থিরতা, প্রশান্তি, সংযম—আরাধকের মনকে স্থিত করার প্রতীক
মন্ত্রাক্ষর/বীজাক্ষর: “সংকল্প-শক্তি” ও ধ্যানের ফোকাস
বাংলার মনসা-উপাসনার কেন্দ্রীয় ধারণা—দেবী “বিষহরী”, অর্থাৎ সর্পবিষ-নাশিনী—এ কথা ধর্মীয় লেখালিখিতেও উঠে আসে।

২) “যন্ত্র রাখলেই হবে”—এই ধারণা কতটা ঠিক?
লোকবিশ্বাসে অনেকে বলেন, “ঠাকুরঘরে রাখলেই রক্ষা”—কিন্তু পূজা-সংস্কৃতির দৃষ্টিতে বিষয়টা একটু আলাদা ভাবে দেখা হয়।
রাখা: যন্ত্রকে সম্মান দিয়ে পরিষ্কার স্থানে স্থাপন
আরাধনা: দৈনিক অন্তত প্রদীপ/ধূপ, জল-ফুল/প্রসাদ নিবেদন, প্রণাম
সংকল্প: ভয়-দুশ্চিন্তা কমাতে, মন স্থির করতে—এটা ‘ধ্যানচিহ্ন’ হিসেবে কাজ করে
অর্থাৎ “রাখলেই হবে” না—রাখা + নিয়মিত শ্রদ্ধা/ধ্যান—এটাই প্রচলিত ধর্মীয় অভ্যাসের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৩) ভক্তরা কী উপকার বিশ্বাস করেন?
বাংলার ঘরে মনসা আরাধনা হয় সাধারণত—সাপে কামড়ানো/বিষফল, অজানা বিপদ, দুর্ভাগ্য ও ভয় কাটানোর আশায়। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিবেদনে মনসা পূজার উদ্দেশ্য হিসেবে সংসারের শান্তি, শ্রীবৃদ্ধি, রক্ষা—এই কথাগুলি পাওয়া যায়।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী যন্ত্র-আরাধনায় যে উপকারগুলি বলা হয়—(এগুলো বিশ্বাসভিত্তিক)
মা মনসা ভয়, বিষ, অদৃশ্য বাধা ও নেগেটিভ শক্তি নাশ করেন।
অকারণ ভয়, দুশ্চিন্তা কমে, “নজর/নেগেটিভ” বা অদৃশ্য বাধা কাটে—এমন ধারণা
বাড়ি ও ব্যক্তিজীবনে “রক্ষাবলয়” তৈরি হয়, কাজ আটকে থাকলে ধৈর্য ও স্থিরতা বাড়ে, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়
যদিও এগুলোকে ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত; বাস্তব বিপদে চিকিৎসা/নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবশ্যই জরুরি।

৪) কীভাবে পুজো/আরাধনা করবেন (ঘরোয়া, নিরাপদ ও শালীন নিয়ম)
নীচের পদ্ধতি লোকাচার-সঙ্গত, সহজ এবং বাড়িতে করা যায়—তবে পরিবারগত রীতি/গুরু-পুরোহিতের নির্দেশ থাকলে সেটিই প্রাধান্য দিন।

স্থাপন:
স্নান করে পরিষ্কার কাপড় পরে ঠাকুরঘরের পরিষ্কার স্থানে লাল/হলুদ কাপড় পেতে যন্ত্র রাখুন।
যন্ত্রের সামনে একটি ছোট ঘট/জলভরা পাত্র রাখতে পারেন (ঐচ্ছিক)।
নৈবেদ্য (সাধারণ): জল, দুধ, ফল, মিষ্টি/নাড়ু—যা পরিবারে শুদ্ধ বলে মানা হয়
ফুল ও ধূপ-প্রদীপ
(মনসা পূজায় দুধ-জলের নিবেদন বহু জায়গায় দেখা যায়—কারণ নাগদেবতা/সর্পদেবীর লোকাচারের সঙ্গে দুধ নিবেদন যুক্ত।)

প্রণাম ও জপ:
দেবীকে প্রণাম করে ৩/১১/২১ বার নামস্মরণ
দৈনিক ১টি প্রদীপ অন্তত
ভয়/অস্থিরতা থাকলে কয়েক মিনিট নীরব ধ্যান (যন্ত্রকে “ধ্যানচিহ্ন” ধরে)

কী এড়াবেন:
যন্ত্রকে অযত্নে রাখা, নোংরা স্থানে রাখা,
“তাড়াতাড়ি ফল”–জাতীয় অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা
যন্ত্রকে চিকিৎসা/আইনি/নিরাপত্তার বিকল্প ভাবা

৫) বার্ষিক মনসা পূজা, নাগপঞ্চমী ও “এক মাসের পূজা”:
বাংলায় মনসা-আরাধনা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। তবু কিছু বড় ধারা বারবার দেখা যায়—
নাগপঞ্চমী (শ্রাবণ শুল্ক পঞ্চমী): এই দিনে উঠোনে সিজগাছ স্থাপন করে মনসা পূজার লোকাচার।
বহু অঞ্চলে নাগপঞ্চমী থেকে ভাদ্র কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত এক মাস পূজা হওয়ার পর সমাপন হয়। আবার “শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে” মনসা পূজার কথা জনপ্রিয় ধর্মীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকে।

৬) অমাবস্যার পুজো: কীভাবে দেখা হয়?
শ্রাবণ মাসকে অনেকেই মনসা-কাল হিসেবে ভাবেন—এমন ব্যাখ্যা তন্ত্র/লোকধারার লেখাতেও পাওয়া যায়।
তাই বহু পরিবারে শ্রাবণী অমাবস্যা বা অমাবস্যা তিথিতে (অঞ্চলভেদে) মনসা-স্মরণ, প্রদীপদান, উপবাস/সংযম ইত্যাদি করা হয়—তবে এর নির্দিষ্ট বিধান একেক পঞ্জিকা/লোকরীতিতে একেক রকম।
“অমাবস্যায় মনসা-স্মরণ বাংলায় লোকাচার হিসেবে প্রচলিত—কোথাও এটি শিব-আরাধনা/পিতৃতর্পণের সঙ্গে যুক্ত, কোথাও মনসা-স্মরণ আলাদা ভাবে করা হয়।”
মাৎস্যন্যায়

৭) পৌরাণিক–অলৌকিক কাহিনি: মনসামঙ্গল, বেহুলা–লখিন্দর
মনসার জনপ্রিয়তা কেবল পূজায় নয়—বাংলার মনসামঙ্গল-ধারায় দেবীর “লোকজ প্রতিষ্ঠা” ঘটেছে। চাঁদ সদাগর–মনসা সংঘাত, লখিন্দরের মৃত্যু, বেহুলার নৌকাভ্রমণ—এই কাহিনি বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেহুলা–লখিন্দরের কাহিনি সম্পর্কে বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র হিসেবে বাংলাপিডিয়া উল্লেখযোগ্য।
পটচিত্র–পরম্পরাতেও মনসামঙ্গলের আখ্যান বিস্তৃতভাবে আছে—চাঁদ সদাগর শিব-উপাসক, মনসা নিজের পূজা প্রচার করতে চান—এটাই দ্বন্দ্বের কেন্দ্র।

“অলৌকিক” অংশটি হল:
“লোকবিশ্বাসে মনসা ‘জাগ্রত’—কারণ তিনি ভয় ও বিষের বিরুদ্ধে ‘অদৃশ্য রক্ষাকবচ’। মনসামঙ্গলের কাহিনিতে সেই রক্ষার নৈতিক ভাষা—অহংকার ভাঙা, প্রতিজ্ঞা, এবং ভক্তির পরীক্ষা।”

৮) বাংলার কিছু “জাগ্রত” মনসা মন্দির: ঠিকানা ও সন্ধান

  • মা মনসা মন্দির, কাঁকুড়গাছি (কলকাতা)
    ঠিকানা: 21, Motilal Basak Lane, Kankurgachi/Kadapara, Kolkata – 700054 (ল্যান্ডমার্ক: Sishumahal Girls School-এর কাছে)
  • মা মনসা টেম্পল, যাকপুর (পশ্চিম মেদিনীপুর; খড়্গপুরের কাছে)। অবস্থান: Jakpur-এর কাছে, Kharagpur অঞ্চলে—এই মন্দির “ছাদবিহীন কাঠামো” বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত বলে উল্লেখ আছে।
  • মা মনসা মন্দির, মহিষা/গোটগেরে (খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)। ঠিকানা (ডিরেক্টরি অনুযায়ী): Gotgere, Mahisha, Kharagpur – 721301, West Bengal
  • মা মনসা দেবী টেম্পল (রানাঘাট–II, নদীয়া)। ম্যাপ লোকেশন: Panikhali Ranaghat Road, Ranaghat II, Nadia – 741501
  • সর্বমঙ্গলা মনসা টেম্পল, নলহাটি (বীরভূম)। ঠিকানা: Near Pathra More, Nalhati, Birbhum – 731220।
  • মা মনসা টেম্পল, মল্লারপুর (বীরভূম)। ঠিকানা: Tuskuta Para Mathmahula, Thana, Mallarpur, Birbhum – 731216।
  • মনসা দেবী টেম্পল (রামপুরহাট, বীরভূম) – “মনসা তলা” লোকেশন। ম্যাপ লোকেশন: Manasa Tala Para, Rampurhat – 731202।
  • মা মনসা মন্দির, লেকটাউন (কলকাতা অঞ্চলে; ভ্রমণবিবরণে উল্লেখ)। লোকেশন বর্ণনা: Lake Town, VIP Road (airport road)–এর কাছে—ট্রাভেল রিভিউতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

Related Articles

Back to top button