জনগণের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়াই একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের কাজ
জনগণের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়াই একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের কাজ
মৃত্যুঞ্জয় সরদার: বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা এক অন্য মাত্রা পেয়েছে । গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হল গণমাধ্যম। এই দেশের সুমহান ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোত ভাবে এমন কিছু বরণীয় ও স্মরণীয় ব্যক্তির নাম যাঁদের জীবন শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতার হাত ধরে। বিশ্বের সবচেয়এ বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত৷ এ দেশে আইনসভা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার পর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’৷ সেই স্তম্ভ এখন নড়বড়ে৷ বলছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকের স্বাধীনতারক্ষা সংগঠন ডাব্লিউপিএফ৷ ২০১৮ সালে ২৫শে এপ্রিল এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি তাদের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে৷ রিপোর্ট বলছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় একসঙ্গে আরও দু’ধাপ তলিয়ে গিয়েছে ভারত৷
তিন বছর আগে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৬ নম্বরে৷ এবার তা ১৩৮ নম্বরে গিয়ে ঠেকেছে৷ ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, দাম দিয়ে কেনার চেষ্টা ছাড়াও সাংবাদিকদের প্রাণনাশের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে৷ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ-এর এই বার্ষিক রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের খুন হওয়ার ঘটনা৷ তালিকার সবচেয়ে নীচে স্থান পেয়েছে উত্তর কোরিয়া৷ তার ঠিক ওপরেই রয়েছে এরিট্রিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া এবং চীন৷
তবে গত বছরের মতো এবারও চীন নিজেদের অপরিবর্তিত রেখেছে৷ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে শীর্ষস্থান পেয়েছে নরওয়ে৷ এই নিয়ে টানা দু’বছর শীর্ষস্থানে তারা৷ বর্তমানে আমি অসুস্থ তবুও
কত মানুষ রোজ ফোন দেয়। রাস্তায় পুলিশ গাড়ি আটকেছে, মোটরসাইকেল ধরেছে, বাড়িতে চুরি, থানায় দ্রুত মামলা করতে চানÑ এ রকম কত বিষয়! শুনেছি বড় বড় পদের নিয়োগ-বদলিতেও নাকি কোনো কোনো সাংবাদিক কর্তাব্যক্তিদের কাছে সুপারিশ করেন। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়। নিজের পরিচয় দিয়ে মন্ত্রি-সচিব থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ তো সাংবাদিকদের আছেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সাথেও সাংবাদিকদের ছবি-সেলফি, বিদেশ ভ্রমণ-পিঠা খাওয়া, কত আন্তরিক যোগাযোগ। তবুও
স্বাধীনতা চর্চার দিক থেকে সাংবাদিকতা এখন সারা বিশ্বে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যেমন আমরা জানি আমেরিকা স্বাধীন সাংবাদিকতার দেশ হিসেবে সুপরিচিত। সে দেশে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মতো একটা অনন্য বিধান আছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেই দেশেই এখন প্রেসিডেন্ট কথায় কথায় সাংবাদিকদের বকাঝকা করেন। সংবাদমাধ্যমে যা কিছু তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়, তাকেই তিনি ফেক নিউজ বলেন। তিনি প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের নিকৃষ্টতম জীবদের অন্যতম বলছেন। এভাবে সাংবাদিকদের ও সাংবাদিকতা পেশাকে হেয় করা হচ্ছে। শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিমা দেশগুলো ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতার তীর্থস্থান; তাদের সাংবাদিকতার মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার চর্চা থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের সাংবাদিকেরা অনুপ্রাণিত হতাম। সেটা এখন সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
আমেরিকায় কিংবা জাপানে রাতের বেলা ফাঁকা রাস্তায়ও কেউ ট্রাফিক সংকেত অমান্য করে না। সবাই লালবাতি দেখলে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত নড়ে না। এর একটা কারণ, অভ্যাস। আইন তারা মানতে চায়। কলকাতার লোকজনও খুব ট্রাফিককানুন মেলে চলে। আরেকটা কারণ হলো, ক্যামেরা। ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে ক্যামেরায় ছবি তোলা হচ্ছে, নিয়ম ভঙ্গ করা হলে ঠিকই বাড়ির ঠিকানায় জরিমানার চিঠি যায় পৌঁছে। উন্নত দেশগুলোয় অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ভূমিকা খুব বেশি। অপরাধী শনাক্ত করার জন্যও ক্যামেরার সাহায্য নেওয়া হয়। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ম্যারাথন দৌড়ের সময় বোমা বিস্ফোরিত হয়। ওখানে যত ক্যামেরা ছিল, টেলিভিশনের, মানুষের মোবাইল ফোনের, সব ছবি নিরীক্ষণ করে এফবিআই শনাক্ত করে দুজন সন্দেহভাজনকে। এ রকমটা ইংল্যান্ডের টিউব রেলে বিস্ফোরণের সময়ও করা হয়েছিল।
তবে যারা চতুর্থ স্তম্ভ নামে ক্যামেরাটাকে ধরে রয়েছেন তাদের হাত কাঁপছে। কেন কাঁপছে? সে কি হাতের স্নায়বিক দৌর্বল্য নাকি হাতের বাইরে অন্য কোনও হাতের বাধাদান কিংবা বলপ্রয়োগ, নাকি দু’টোই, তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু মোদ্দা বিষয় হল, ছবি আর ঠিকঠাক উঠছে না। বস্তুনিষ্ঠ সত্যের অবয়ব অস্পষ্ট, কোথাও ঘোলাটে, কোথাও একপেশে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বে অল্পস্বল্প ভাবনাচিন্তা যে হচ্ছে না, তা নয়। কাদের মাধ্যমে, কী উপায়ে গণমাধ্যমের চোখে ছানি পড়ে, তার মোটামুটি ছকগুলোও নিয়েও কমবেশি চর্চা চলছে। ক্ষমতার সাধনা করছেন যাঁরা, কিংবা অপরাধকে লুকোবার নিরন্তর প্রয়াস যাদের রয়েছে, তাদের মধ্যে কেবল বুদ্ধিমান এবং কুশলীরাই সত্যের মুখ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তাঁরা জানেন, গণমাধ্যমের শক্তি এবং সম্ভাবনা।গণমাধ্যমের দূষণ এ যুগে কর্পোরেট এবং রাজনৈতিক মহলের প্রভাবে। তথ্য-স্বাধীনতার মুখ এরা ঢেকে দেন নিজেদের স্বার্থেই। তবে সারা বিশ্বে একই ছকে গণমাধ্যমকে দূষিত করার চেষ্টা চলছে এমনটা নয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মডেল। তবে নজর করলে দেখা যাবে, গত এক দশকে সারা বিশ্বেই গণমাধ্যমের মালিকানার ছকটির দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে। যেটা লক্ষ্যণীয়, তা হল অনেক কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাত থেকে বৃহৎ এবং মুষ্টিমেয় কয়েকটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে গণমাধ্যমগুলির মালিকানা তথা পরিচালন ক্ষমতা এসে যাওয়া।গণমাধ্যম আর পাঁচটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই মুনাফাপ্রত্যাশী। কিন্তু ডাক্তারের যেমন অর্থ রোজগারই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, সংবাদমাধ্যমেরও দায়বদ্ধতা জলাঞ্জলি দিয়ে মুনাফাই একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা এবং পাঠকের প্রতি আরও সঠিকভাবে বললে তথ্যের প্রতি, সত্যের প্রতি, সাংবাদিকের বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা কোনওদিনই অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে না। তাহলে সেটা আর সাংবাদিকতা থাকে না। সেই কারণে দায়বদ্ধতার সমর্পণবিন্দুটি ঠিক কোথায় আজকাল অনেকই তা নিয়ে সন্দিহান। একজন সাংবাদিক কার প্রতি দায়বদ্ধ? তথ্যের প্রতি? পাঠকের প্রতি না, তাঁর মালিক, যিনি অন্ন দেন তাঁর প্রতি? অনেক সাংবাদিককে বলতে শুনেছি, আপনি আমাকে মাইনে দেন না। আমার যদি কোনও রকম দায়বদ্ধতা থেকে থাকে, তবে যিনি মাস গেলে আমার গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে তাঁর প্রতি। কথাটা ভেবে দেখলে একদিক থেকে ভুল নয়। সেটাই হওয়া উচিত।
তবে প্রশ্ন যদি হয়, এটাই চূড়ান্ত কি না, তাহলে ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। সাংবাদিকতাকে মনিব আর বেতনভূক সম্পর্কের তুচ্ছ লেনদেনের গণ্ডি দিয়ে বেঁধে ফেললে এই পেশার অবমাননা করা হয়। সেই অপমানের ভাগী হতে হয় দু’পক্ষকেই।অবশ্য এই প্রশ্নটিতে সাংবাদিকের একধরনের অসহায়তাও রয়েছে। একুল না ওকূল কোনটা তিনি রাখবেন তা এক বেজায় প্রশ্ন তাঁর কাছে। সেই বিপদে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যান। সাংবাদিকতার আদর্শে দীক্ষিত মানুষটি দিনের পর দিন যা লিখতে চান, তা লিখতে পারেন না। কারণ হাউস পলিসি তা এনডোর্স করে না। যদি তিনি তাঁর লেখা প্রকাশই না করতে পারেন তবে তো তাঁর সাংবাদিক সত্তাই তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।তাই সাংবাদিকদের একাংশ সহজ পন্থা ধরেছেন। সবসময় সত্য নয় জেনেও শুধুমাত্র তিনি যে সংস্থায় কাজ করছেন তার নীতি অনুসরণ করছেন। সেক্ষেত্রে জনমানসে কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা তিনি হারাচ্ছেন। বিপদ বাড়ছে যখন গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ বিশেষ স্বার্থরক্ষায় কোনও বিশেষ ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সেই সময় তিনি সত্যটি জেনেও কারও বিরুদ্ধে যাচ্ছেন না। চাকরি হারাবার ভয়ে ঘরে মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে ফেলছেন। আর বাইরেও সেইসব দলের নেতাদের কাছেও সম্ভ্রমটুকু আদায় করতে পারছেন না। হক কথা বলার ধক না থাকলে কেউই পোঁছে না। সাংবাদিকদের একাংশ নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অথবা অনৈতিকভাবে তাঁদের ছুড়ে দেওয়া কিছু সুযোগ সুবিধা নিয়েই তৃপ্ত। হ্যাঁ, তাতে ব্যক্তিগত কিছু লাভ হয় বটে, কিন্তু যদি তাঁরা ভেবে থাকেন এতে শ্রদ্ধা আদায় হয়, তবে তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন।এ তো সাংবাদিক স্তরের কথা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার কথা এলেও দেখা যাবে, বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক এবং কর্পোরেট কুশীলবরা সাংবাদিকতাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করছে, যা আগে এমনভাবে দেখা যায়নি। কোথাও তারা হাত ধরাধরি করে কোথাও একে অন্যের বশ্যতা স্বীকার করে পারস্পরিক স্বার্থসিদ্ধি করছে লক্ষ্য অবশ্য একটাই। সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করা। রাশিয়ায় পুতিনের রাজনৈতিক প্রতাপের কাছে স্বাধীন গণমাধ্যমের মালিক খোদোরকভস্কিকে মাথা নোয়াতে হয়। দশ বছর জেলে কাটাতে হয় পুতিনের চাপে। এখন তিনি মুক্তি। এখন রুশ প্রেসিডেন্ট নিজেও অর্থশালী গোষ্ঠীদের নিয়ে বিব্রত নন। কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর সমালোচনা চলবে না। প্রবল প্রতাপের সেই প্রভাবে রুশ গণমাধ্যম কার্যত নখদন্তহীন। চিনের কথা তো সকলেই জানেন। এমন বহুদেশের কথা জানেন সকলে। আবার এর উল্টোদিকে নরওয়ে সুইৎজারল্যান্ডের কথাও জানেন। তবে সেখানকার পরিপ্রেক্ষিত অনেকটাই আলাদা। যার সঙ্গে অন্তত একশো তেত্রিশ কোটির দেশের সমস্যা এবং স্বপ্নের কোনও মিল নেই।সেই ইতিহাস তুলে ধরতে চাই।
সাংবাদিকতা ঘটনার বিবরণ প্রদান এবং তথ্য যোগান প্রথা বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশে প্রাচীন এবং মধ্যযুগেও সীমিতভাবে চালু ছিল। প্রাচীন ভারতে পাথর বা স্তম্ভে খোদিত শব্দাবলি তথ্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হতো। সম্রাট অশোক পাথর ও স্তম্ভে খোদিত আদেশ তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র এবং বাইরেও প্রজ্ঞাপন করেন। তিনি তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশে এবং বিদেশে গুপ্তচর নিয়োগ করেন। সুলতানি আমলে ‘বারিদ-ই-মামালিক’ বা গোয়েন্দা প্রধান কর্তৃপক্ষকে সাম্রাজ্যের তথ্য সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মুনহি বা গুপ্তচররা সুলতানকে অতি তুচ্ছ বিষয়সমূহও অবহিত করত। মুগল শাসনামলে সংবাদ সার্ভিস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ওয়াকই-নবিশ’, ‘সাওয়ানিহ-নবিশ’ এবং ‘খুফিয়ানবিশ’ চালু ছিল। এ ছাড়াও ‘হরকরা’ এবং ‘আকবর-নবিশ’ নামে সুলতানদের সাধারণ তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল। ভাট, কথক এবং নরসুন্দর মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খবর জানাত। কিন্তু মুগল আমলের বাংলায় সাংবাদিকতা ছিল শুরুর পর্যায়ে, প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকতা হিসেবে বিষয়টি তখন বিকশিত হতে পারে নি।
আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সাংবাদিকতার উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। উপনিবেশ হওয়ার কারণে এশিয়ার অন্য যে কোন দেশের আগেই বাংলা অঞ্চলে সাংবাদিকতা শুরু হয়। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত জেমস অগাস্টাস হিকি-র বেঙ্গল গেজেট প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলায় আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাস শুরু হয়। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে উলেখ করা হয়েছিল, সকল পক্ষের জন্য উন্মুক্ত হলেও এটি কারও দ্বারা প্রভাবিত নয় এমন একটি সাপ্তাহিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পত্রিকা। ১৮১৮ সালে বাংলা সাংবাদিকতা যাত্রা শুরু করে। সে বছর বাঙ্গাল গেজেট (কলকাতা), দিগদর্শন (কলকাতা) এবং সমাচার দর্পণ (শ্রীরামপুর) নামে তিনটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান ভূখন্ড থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক রংপুর বার্তাবহ প্রকাশিত হয় রংপুর থেকে ১৮৪৭ সালে এবং ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঢাকা নিউজ প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ সালে। ঢাকা প্রকাশ ১৮৬১ সালে এবং ঢাকা দর্পণ ১৮৬৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশা এক নতুন মোড় নেয়। জাতীয়বাদী আন্দোলন, মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সূচনা প্রভৃতি কারণে সংবাদপত্রসমূহের চাহিদা ও পাঠকসংখ্যা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং পূর্ববাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার উত্থান সাংবাদিকতার বিস্তারের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে।পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পত্রিকার মালিক-সম্পাদক দেশান্তরি হওয়ায় পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র প্রকাশনায় একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় এ সময়ে প্রকাশিত কোন দৈনিক পত্রিকার সন্ধান মেলে না। ঢাকার প্রধান পত্রিকা ছিল তখন দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ এবং মর্নিং নিউজ। এগুলি প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। অবশ্য বছর দুয়েক-এর মধ্যে পত্রিকাগুলি ঢাকায় চলে আসে। পরে এখান থেকে প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক, সংবাদ, পাকিস্তান অবজারভার (পরে বাংলাদেশ অবজারভার) প্রভৃতি পত্রিকা যা আজও দেশের প্রথম সারির দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে (উল্লেখ্য জুন ২০১০ থেকে অবজারভার পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেছে)। বাংলাদেশ সরকারের ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অধিদপ্তরের ১ জুলাই ২০১০ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রপত্রিকার সংখ্যা ৪৫৭টি [দৈনিক: ঢাকা ৯২টি, ঢাকার বাইরে (মফস্বল) ১৯২টি; সাপ্তাহিক: ঢাকা ৬৯টি, ঢাকার বাইরে ৫৫টি; পাক্ষিক: ঢাকা ১৫টি, ঢাকার বাইরে ৩টি; মাসিক: ঢাকা ২৬টি, ঢাকার বাইরে ৪টি এবং ত্রৈমাসিক: ঢাকা ১টি]। ১৯৪৭ সালে, পরে প্রথমত, পঞ্চাশের দশক, দ্বিতীয়ত, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা এবং প্রকাশের মাত্রিকতা সাংবাদিকতা জগতের বিপুল উন্নয়নের নির্দেশক। এই সময়ে ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা এক অন্য মাত্রা পেয়েছে । গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হল গণমাধ্যম। এই দেশের সুমহান ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোত ভাবে এমন কিছু বরণীয় ও স্মরণীয় ব্যক্তির নাম যাঁদের জীবন শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতার হাত ধরে। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সেরকমই এক ব্যক্তিত্ব। গান্ধীজির লেখায় আদতে ইংরেজদের মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের চোরা স্রোত নেমে যেত। তাই ইংরেজ সরকার যে কোন মূল্যে চেয়েছিল যাতে এই বলিষ্ঠ কলমের কন্ঠ রোধ করা যায়।জাতির জনক হিসাবে খ্যাত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। গান্ধীজির সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৯০৩-০৪ সালে তিনি যোগ দেন ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ নামক পত্রিকায়। এটি ছিল একটি ইংরাজী সাপ্তাহিক পত্রিকা। গান্ধীজি বুঝেছিলেন আন্দোলন করতে হলে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। আর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম সংবাদপত্র।তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যমে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জনগণের আবেগ প্রতিবাদ প্রকাশ করতেন । গান্ধীজি তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলন সফল করতে সক্ষম হয়েছিলেন সাংবাদিকতার জন্য একথা বলাই যায়। ‘
ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ ইংরাজী ছাড়াও তামিল, গুজরাতি ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ হয়েছে। এই সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় দক্ষিণ আফ্রিকার তত্কালীন সরকারের টনক নড়ে এবং তার ফলে বেশ কিছু আইনেরও রদবদল করতে বাধ্য হয় দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার। ১৯১৪ সাল। গান্ধীজি এলেন ভারতে। যোগ দিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে, এবং স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তিনি মনে করতেন জনগণের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়াই একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের কাজ। বিখ্যাত সাংবাদিক কে রামরাও গান্ধীজি সম্পর্কে বলেছেলিন, গান্ধীজি সংবাদপত্র জগতের জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতেন। সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। তিনি তাঁর বক্তব্য, অনুপ্রেরণা ইত্যাদি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করতেন সংবাদপত্রকে। ভারতীয় সাংবাদিকতায় তাঁর অসামান্য ভূকিকা এখান থেকেই উপলব্ধি করা যায়। হোমরুল লীগ মুম্বাইএ প্রতিষ্ঠা করল ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা। ১৯১৯ সাল নাগাদ গান্ধীজি এই পত্রিকার সম্পাদক হন।এই সময়ে তিনি ‘নাজীবন’ নামক একটি গুজরাতি মাসিক পত্রিকার সম্পাদকেরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পত্রিকাটি ১৯৩২ সাল অবধি চলেছিল। এই পত্রিকাটি মূলতঃ গান্ধীজির ঐকান্তিক চেষ্টায় সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরিণত হয়। তিনি তাঁর আত্মকোথায় বলেছিলেন সংবাদপত্রের উদ্দেশ্যে হলো জনগণের মনোভাব জানা এবং তা প্রকাশ করা। তিনি আরও বলেছিলেন জনগণের আবেগকে জাগ্রত করাও সংবাদপত্রের প্রধান উদ্দেশ্যে। গান্ধীজি মনে করতেন জনপ্রিয় সত্যি ঘটনাগুলিকে নির্ভীকভাবে প্রকাশ করা উচিত একটি সংবাদপত্রের।
‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা দক্ষতার সঙ্গে অনেকগুলি বছর সম্পাদনা করেছিলেন, শুধুমাত্র ইংরেজ সরকারের দৌলতে তাঁর জেলে থাকার সময়টুকু বাদ দিলে। বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাবার পর গান্ধীজি শুরু করেন ‘হরিজন’ নামক একটি ইংরাজী পত্রিকা। হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর সংগ্রাম চিরঃস্মরণীয়। এর জন্য হরিজন পত্রিকাটি ছাড়াও গুজরাতি ভাষায় ‘হরিজন বন্ধু’ এবং হিন্দী ভাষায় ‘হরিজন সেবক’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি নিজে হরিজন পত্রিকার সম্পাদক না হয়েও এই পত্রিকার উন্নতির জন্য প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন এবং পত্রিকাটিকে আন্দোলনের একটি অস্ত্রে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।) গান্ধীজি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রয়োজন ও গুরুত্ব আর বিস্তারের জন্য দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য দক্ষতার সঙ্গে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করেছিলেন। সংবাদপত্র সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব কিছু চিন্তা ভাবনা ছিলো। সম্পাদক হিসাবে তিনি অন্যরকম ভাবধারায় চলতেন। সর্বাগ্রে তিনি বিজ্ঞাপন বিরোধী ছিলেন। তাঁর পত্রিকায় কোনও বিজ্ঞাপন ছাপা হতো না। কিন্তু তিনি এটাও চাইতেন না যে পত্রিকা লোকসানে চলুক। সেইকারণে প্রচার বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। সংবাদপত্র চলতে যে অর্থের প্রয়োজন তা তিনি সংগ্রহ করতেন গ্রাহকদের কাছ থেকে। পত্রিকা চালানোর পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকতো তা তিনি পুনরায় গ্রাহকদের ফেরত দিয়ে দিতেন নতুবা অন্য কোনও ভাল কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি নিজে সংবাদপত্র থেকে কোনও অর্থ নিজের জন্য নিতেন না। সম্পুর্ন স্বেচ্ছাসেবক রূপে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া কোনও নির্দেশ তা ছিলো না-পসন্দ। তিনি এটি মানতে চাইতেন না। তবে সংবাদপত্র পরিচালনার ব্যপারে সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনও সংঘর্ষ করেননি। এক্ষেত্রেও তিনি তাঁর নিজস্ব অহিংসনীতি মেনে চলতেন। গান্ধীজি ইংরাজী সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা মন থেকে পছন্দ করতেন না। তবুও তিনি এটা করতেন অহিন্দিভাষীদের বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে তাঁর মতবাদ পৌঁছে দেবার জন্য। তিনি মনে করতেন আঞ্চলিক ভাষায় সংবাদপত্র অনেক বেশি করে প্রকাশিত হওয়া উচিত। কারণ এটি অনেক বেশি সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। তথ্য বলছে ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকার প্রচার সংখ্যা চিলমাত্র ১২০০, কিন্তু নবজীবন পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিলো ১২০০০। আর এই কারণে তিনি পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা কমকরে ২৫০০ না হলে সেই পত্রিকার সম্পাদনা করতে চাইতেন না। পরে দেখা গেল ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে হল ৪৫০০০। গান্ধীজির সংবাদিকতার শৈলী ছিলো সোজা-সাপটা, সহজ-সরল এবং বলিষ্ঠ। তিনি বলতেন পত্রিকা একপাতার হোক, তবুও তাতে যেন সুন্দর ভাষায় লেখা থাকে। গান্ধীজি গুজরাতি ভাষার সাংবাদিকতায় এক নতুন জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সময় থেকেই গুজরাতি ভাষার সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা উন্নত হতে শুরু করে এবং অন্য আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে শুরু করে শুধুমাত্র তাঁর লিখন শৈলীর জন্য। তাঁর চিন্তা-ভাবনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বক্তব্য, জনগণের মধ্যে যাঁরা দুর্বল শ্রেণী তাঁদের কথা তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকও দূরবস্থার চিত্র প্রতিফলিত হতো তাঁর লেখায়। আর সেই লেখা সপ্তাহের শেষে পৌঁছে যেত গ্রাহকদের কাছে। তাঁর সাংবাদিকতার ভাষা অন্য সমকালীন সাংবাদিকদের প্রভাবিত করেছিলো। এখনকার সাংবাদিকদের সেই ভাষা, স্টাইল প্রেরণা যোগায়। তিনি শুধু নিজের পত্রিকাগুলো নিয়ে ভাবতেন না। তিনি সাংবাদিকতায় এতটাই সম্পৃক্ত ছিলেন, এবং সদাই তার উন্নতির কথা ভাবতেন সেটাও স্মরণযোগ্য। একবার মিঃ জায়কার গান্ধীজিকে খাদি শিল্পের উন্নতির জন্য ২৫০০ টাকা দান করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজি পুরো টাকাটা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার টিঁকে থাকার লড়াইয়ে দান করে দেন। মতিলাল নেহেরু ছিলেন সেই সময়ে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার মালিক এবং পত্রিকাটির অবস্থা তখন একদমই ভালো ছিলো না। এই ঘটনা প্রমাণ করে ভারতীয় সংবাদপত্রের উন্নতির জন্য গান্ধীজি সদাই আন্তরিক সচেষ্ট ছিলেন। তিনি অন্য পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মৌখিক ভাবে অথবা লেখার মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে চলতেন।সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের খুন করে, রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সুযোগ পেলে সাংবাদিকদের নামে মামলা ঠুকে দেয়। আবার রাজপথে সাংবাদিক পেটায়। এদেশে বরাবরই নানা হামলা মামলার শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সন্ত্রাসী, আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এমনকি রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত সুযোগ পেলে সাংবাদিকদের উপর ঝাল মেটায়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাউকে ছাড় না দিয়ে সাংবাদিকদের ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে হয়। আর তাতেই ক্ষেপে যান সংশ্লিষ্টরা। কখনো জীবন কেড়ে নেওয়া, কখনো শরীরে হামলা আবার প্রায়সই মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে জেলে যাচ্ছেন সাংবাদিকরা।খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকরা নিজেরাই খবর হচ্ছেন। প্রতি বছরই একাধিক সাংবাদিকের অপঘাতে মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সারা জীবন সত্যের পেছনে ছুটে বেড়ানো এসব সাংবাদিকের হত্যা রহস্য হিমশীতল বরফের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। শুধু বিচারই নয়, একটি হত্যাকান্ডেরও রহস্য প্রকাশিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাপন করছে স্বাভাবিক জীবন। কেউ কেউ রয়েছে জামিনে। কেউ আবার মিডিয়াতেই কর্মময় জীবনযাপন করছে। অনেক হত্যাকান্ডের বিচারকার্য এমনকি তদন্তকাজ, চার্জশীট ঝুলে আছে। কয়েকটি মামলার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এ দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিক হত্যারও বিচার না হওয়া রাষ্ট্রের অমার্জনীয় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায় কোন সরকারই এড়াতে পারবে না। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, কোন সাংবাদিক হত্যাকান্ডেরাি বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে হরদম। সরকারকে এসব হত্যাকান্ডের বিচারে অবশ্যই আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতন অঅর হত্যাকান্ড নিয়ে কোন টালবাহানা দেশের জনগণ ও সাংবাদিক মহল মেনে নেবে না। তাই সংশ্লি¬ষ্ট মহল এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ও বাস্তবিক পদক্ষেপ নিয়ে অতি সত্বর মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করবে এটাই আমরা বিশ্বাস করি।দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সাংবাদিক মানেই ধান্দাবাজ, প্রতারক, ব্লাকমেইলার ও ভীতিকর কোনো প্রাণী, এমন ধারণাই পোষণ করে দেশের গরিষ্ঠ মানুষ। প্রকৃত সাংবাদিকরা এর কোনটাই নন। সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এটা কেবল পেশা নয়, একজন সাংবাদিক এ সেবায় থেকে মানুষকে সেবা দিতে পারেন। দেশের কতিপয় অসৎ সম্পাদক, সাংবাদিক অর্থের বিনিময়ে সারাদেশে নানা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দিয়ে এ পেশার সম্মান হানি করছে। এরা সাংবাদিক নন। সাংবাদিক নামধারী। এদের কতকের কারণে সাংবাদিকতা যে একটি অনন্য পেশা তা দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না। এখনও সংবাদপত্র জনগনের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বলেই দেশের মানুষ অনেকটা শান্তিতে আছেন। সৎ সাংবাদিকতার জায়গাটা বিলুপ্ত হলে দেশে দুর্ভোগ নেমে আসবে। একটি সংবাদপত্র আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সারা দেশের হাজার হাজার সাংবাদিকের ঘাম শ্রম ও জীবনঝুঁকি জড়িত। গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমহীন কাজ করতে হয় অনেক সংবাদকর্মীর। অনেকটা নিশাচরের ভূমিকা তাদের। সাংবাদিকদের পারিবারিক জীবন বলতে কিছু নেই। কিন্তু কিছু অসৎ এবং ভুয়া সাংবাদিকদেও কারণে সাংবাদিকদের মূল্যায়ন সমাজে নেই বললেই চলে। পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি তো রয়েছেই। সমাজের অনেক সাংবাদিক ত্যাগী, নির্লোভী ও সৎ। তারা মানবকল্যাণে, সমাজকল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। এই দিকটিও সরকারকে আমলে নিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যা বন্ধ করা না গেলে সৎ, মেধাবী, যোগ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা এখন যে সংবাদপত্রে ঢুকছেন, তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এমনিতেই সাংবাদিকদের পেশাগত নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নেই, তার ওপর যদি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাদের জীবনঝুঁকি বেড়ে যায় কিংবা তারা হামলা-হত্যার শিকার হন তাহলে কিভাবে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে।আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই এবং এর কোনো বিকল্প নেই।সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, কোনো সাংবাদিক হত্যাকান্ডেরই বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে হরদম। সরকারকে এসব হত্যাকা-ের বিচারে অবশ্যই আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে। সাংবাদিক হত্যার কোনো একটি মামলার বিচারকার্য আজ পর্যন্ত সুরাহা হয়নি। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। ফলে তারা সাংবাদিকদের বাসগৃহে প্রবেশ করে নৃশংসভাবে হত্যা করার মতো স্পর্ধা দেখাতেও পিছপা হচ্ছে না। fযে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে সত্যের সন্ধানে ছুটে চলেন দেশ-বিদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। যুদ্ধ, অগ্নিকান্ড, যে কোনো দুর্যোগ দুর্বিপাক, ঝড়-তুফান কিংবা মাদক বা সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় ভয়াবহ বিপদ মাথায় নিয়ে ঢুকে পড়েন। একজন সৎ সাংবাদিক বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন অন্তরালের অনেক অজানা তথ্য। উদঘাটন করে নিয়ে আসেন ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা গাঢ় রহস্য। কিন্তু এর কোনোটাই একেবারে সহজসাধ্য কোনো কাজ নয়। এসব কাজে যেমন আছে সম্মান, তেমনি আছে মারাত্মক ঝুঁকিও। তাই আমরা বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের নানাভাবে প্রতিপক্ষের জিঘাংসার শিকার হতে দেখি। নির্যাতিত ও নিপীড়িত হতে হয় তাদের।অবস্থাদৃষ্টে অকপটে বলতে হয়, আমাদের দেশের সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে নাগরিকগণের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি তথ্য অধিকার চর্চার বিষয়টি তেমনি আরো গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু সাংবাদিকগণই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরে, সে কারণে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি মূলতঃ নির্ভর করছে সাংবাদিকদের আইনটি ব্যবহারের উপর।
তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়নকল্পে অবাধ তথ্য প্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ তথা এ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে পূরণ হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবাদিহিতা নিশ্চিত হবে তখন যখন জনগণ আইটি ব্যবহারে অভ্যস্ত হবেন। তথ্য চাহিদাকারী বা ব্যবহারকারী তথা জনগণ এখন পর্যন্ত আইনের বিধান সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত নন। আইনটি প্রণয়ের পূর্বে মনে করা হয়েছিল তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকরা সরকারের কাছ থেকে যাবতীয় তথ্য আরো সহজে যোগাড় করে জনগণকে সরবরাহ করতে পারবেন।
আইনটি প্রণয়নের পর যখন এর প্রয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হন সাংবাদিকরা, তখন এর মাধ্যমে তথ্য প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তারা অনেকেই পিছপা হতে থাকেন।সাংবাদিকরা মনে করেন, চিরাচরিত প্রথায় প্রভাব খাটিয়ে বা নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে তথ্য সংগ্রহ করায় তাদের পক্ষে অধিকতর সহজ এবং কম ঝুকিপূর্ণ হবে। তাছাড়া তথ্য আবেদন করে কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়া থেকেও রেহায় পাওয়া যায়। আইনটি সম্বন্ধে গণ-মাধ্যম কর্মীদের এই অবস্থানের একটি বড় কারণ আইনটি সম্পর্কে তাদের অসম্পূর্ণ ধারণা ও অভিজ্ঞতা।বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নাগরিকদের তথ্য প্রবেশাধিকারের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় তথ্য অভিগম্যতা সর্বজনস্বীকৃত এবং আইনগত পটভূমিতে নাগরিকরিকদের তথ্যক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার প্রশ্নে তথ্য উৎপাদন, সংরক্ষন, সরবরাহ ও ব্যবহার সংস্কার করা এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের বাধাসমূহকে উন্মোচন করাকে জাতীয় উন্নয়ন ও গনতন্ত্রের জন্য বিশেষ সহায়ক ও জরুরী করণীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকারের চেয়ে গুরুত্ববহ। কেননা জনগণকে অবহিত রাখার মাধ্যমে সাংবাদিকরা পেশাগত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।অধিকাংশ সাংবাদিকই বিভিন্ন হুমকি, নির্যাতন ও রাজনৈতিক চাপের কারণে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনা। ২০০২ সালে ম্যাস-লাইন মিডিয়া সেন্টারের(এমএমসি) তথ্যক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার: সমস্যা ও সম্ভাবনা শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭২% সাংবাদিক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে চাহিদা অনুযায়ী তথ্য পান না। তথ্য সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে ধারণার অভাব, তথ্যসূত্রের সীমাবদ্ধতা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার অভাব পরিলক্ষিত করেন ৪৩% সাংবাদিক। দুইহাজার ছয়শত আঠাশ জন সাধারণ নাগরিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৭৩% নাগরিক করেন সঠিক তথ্য প্রদান সমস্যা সমাধানের সহায়ক। এই গবেষণা আরো প্রকাশ করে বেশিরভাগ মানুষের সরকারিসুত্র বা সংস্থা থেকে তথ্য খোঁজায় অনীহা রয়েছে। এই গবেষণা মনে করে আইনটির সঠিক প্রয়োগে দুটি সুবিধা নিশ্চিত হবে- দুর্নীতি কমবে এবং সরকারি কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।



