খেলাধুলা

কলকাতার খালি পায়ে যেন জাদুর ছোঁয়া:-

 

বেবি চক্রবর্ত্তী:- ১৯৩৬ সালে স্কটল্যান্ড এর গ্লাসগো শহরে প্রাক মরশুম প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে মুখোমুখি হয়েছিল সেল্টিক এসি এবং গলস্টন ফুটবল ক্লাব। খেলায় সেল্টিক এসি ৭-১ গোলে গলস্টন ক্লাবকে পরাজিত করে। খেলায় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজন ভারতীয় যিনি হ্যাটট্রিক করেন। তার অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যে মুগ্ধ করেছিল সেল্টিক সমর্থকদের। এটি ছিল তাঁর, ক্লাবের হয়ে, দ্বিতীয় আবির্ভাব।
সেল্টিক সমর্থকরা অভিভূত হয়ে গেছিলেন তার খেলা দেখে। একজন ভারতীয়, ব্রিটিশ শাসনে থাকা, সুদূর বাংলা থেকে গ্লাসগো শহরে এসেছেন এবং খালি পায়ে ফুটবল খেলে দর্শকদের মুগ্ধ করছেন। অচিরে সেল্টিক সমর্থকরা ওনার ভক্ত হয়ে নাম রাখলেন সেল্টিক ক্লাবের ইন্ডিয়ান জাগলার। এই খেলোয়াড়ের নাম মোহাম্মদ সেলিম। ইনিই প্রথম ভারতীয় যে কোন ইউরোপের ক্লাবে খেলেন।
মোহাম্মদ সেলিম কলকাতার মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার কলকাতা লিগ জয়ী দলের আক্রমণের মূল স্তম্ভ ছিলেন সেলিম। উল্লেখযোগ্য ১৯৩৪-৩৮ যে পাঁচবার পরপর কলকাতা লিগ জয় করে মহামেডান স্পোর্টিং রেকর্ড করেছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ সেলিম।
১৯৩৬ সালে সেলিম ভারতীয় একাদশের হয়ে চাইনিজ অলিম্পিক দলের বিরুদ্ধে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেন। এই খেলাটি দেখতে সুদূর লন্ডন থেকে উনার ভাই, হাসিম, কলকাতায় আসেন। এই হাসিম সাহেব সেলিমকে বুদ্ধি দেন ইউরোপের ক্লাবে খেলার। এর আগে ভারত থেকে কেউ এইরকম সাহস দেখাতে পারেননি। তখনকার দিনে ভারতবর্ষে ভারতীয়দের কাছে ফুটবল খেলা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। এহেন সময় পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপের কোন ফুটবল ক্লাবে জায়গা করে নেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। সেলিম এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। তার ভাইয়ের সাথে তিনি স্কটল্যান্ড যান। হাসিম সেল্টিক ক্লাবের কোচ, উইলি ম্যালিকে, আগেই বলে রেখেছিলেন সেলিমের কথা। ম্যালি প্রথম সেলিমের কথা শুনে হাসেন। একজন ভারতীয় খালি পায়ে ফুটবল খেলবেন এটা তার কাছে খুব অস্বাভাবিক লেগেছিল। হাসিমের অনুরোধে ম্যালি সেলিমকে অনুশীলনে নামার অনুমতি দেন। প্রথম দিনের অনুশীলনে যখন সেলিম ঢোকেন সহ খেলোয়াড়, ক্লাব ট্রেনার ও কর্তারা অবাক হয়ে দেখেন একজন ফুটবলার পায়ে বুট নেই, তার বদলে দু পায়ে ব্যান্ডেজ বাধা এবং তার আঙ্গুলগুলো বেরিয়ে আছে। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর সেলিমের কাছে যখন বল আসে তার পায়ের জাদুতে সবাই মুগ্ধ হয়ে যান। সেল্টিক কোচ তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, হ্যামিলটন অ্যাক্সিস ক্লাবের বিরুদ্ধে সেলিমকে মাঠে নামাবেন। প্রথম আবির্ভাবই সেলিম একটি গোল করেন। পরের দিন স্থানীয় সংবাদপত্র, ডেইলি এক্সপ্রেসে, সেলিমের প্রশংসা সূচক খবর প্রকাশিত হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউরোপে সেলিমের খেলার পর্ব এরপর শেষ হয়ে যায়। সেলিম তার নিজের দেশে ফিরে যেতে চান। সেল্টিক ক্লাব তাকে আটকে রাখার বহুভাবে চেষ্টা করেছিল। এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল সেলিম জন্য ক্লাব একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করবে এবং তার টিকিট বিক্রির থেকে সংগৃহীত অর্থের ৫% তাঁকে দিয়ে দেওয়া হবে। সেলিম কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি ক্লাব কর্মকর্তাদের বলেন ওই অর্থ অনাথ আশ্রমে দান করে দিতে, যে শিশুরা তার খেলা দেখতে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে সেলিমের ছেলে রাশিদ আক্ষেপের সাথে বলেছিলেন, “বাবা বোধহয় বুঝতে পারেননি টাকার অংকটা কত। তখনকার সময় অংকটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতই ছিল। ৫% হত প্রায় ১৮০০ ডলার।” মহম্মদ সেলিম তার কথা রেখেছিলেন এবং পুরো টাকাটাই তিনি অনাথ আশ্রমে দান করে আসেন।
কলকাতায় ফিরে তিনি তার পুরনো ক্লাব, মহামেডান স্পোর্টিং এ, যোগদান করেন এবং ওই ক্লাবে খেলেই নিজের ফুটবল জীবন শেষ করেন। খেলা ছাড়ার পরে তিনি কিছুদিন বাচ্চাদের কোচিং করিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Related Articles

Back to top button