MY CATAGORYখেলাধুলা

“কোর্টে একা নামি, কিন্তু জিতি ভারতের হয়ে” —কলকাতায় ওয়াকাথন-এ এসে সাধারণ এর সঙ্গে পা মেলাতে মেলাতেই লিয়েন্ডার পেজ-এর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকারে: ঈশানী মল্লিক।

যদি আবার জন্মাই, আবারও কোর্টেই ফিরব—হয়তো র‍্যাকেট হাতে, নয়তো কোনও তরুণ খেলোয়াড়ের পাশে দাঁড়িয়ে।

মুখোমুখি: লিয়েন্ডার পেজ ও সাংবাদিক ঈশানী মল্লিক (এক্সক্লুসিভ)

ভারতীয় টেনিসের ইতিহাসে লিয়েন্ডার পেজ শুধু একটি নাম নয়—একটি অধ্যায়। অলিম্পিক পদক থেকে ডেভিস কাপ, গ্র্যান্ড স্ল্যাম ডাবলস থেকে শেষ মুহূর্তের লড়াই—লিয়েন্ডার বারবার প্রমাণ করেছেন, উচ্চতা নয়, মানসিক দৃঢ়তাই একজন চ্যাম্পিয়নকে চেনায়।
নেফ্রকেয়ার সম্প্রতি তাদের ৪র্থ ফাউন্ডেশন ডে-তে “ওয়াকাথন” এর আয়োজন করেছিল। সেখানেই এসেছিলেন এবং পা মিলিয়েছেন “টেনিস আইকন” লিয়েন্ডার পেজ। সঙ্গে ছিলেন আরো অনেক তারকা ব্যাক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ। হাঁটতে হাঁটতেই একান্ত সাক্ষাৎকারে পাওয়া গেল “টেনিস জাদুকর”কে।

প্রশ্ন: টেনিস কোর্টে নামার আগে আপনার মাথার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাবনা কী থাকে?
লিয়েন্ডার: আমি সবসময় নিজেকে বলি—“তুমি আজ ভারতের হয়ে খেলছ।” এটা ক্লিশে শোনালেও, আমার কাছে এটাই শক্তির উৎস। কোর্টে আমি একা থাকি, কোচ, পরিবার, দেশ—সবাই গ্যালারিতে। কিন্তু প্রতিটা পয়েন্টে মনে হয়, গোটা দেশ আমার সঙ্গে লড়ছে।

প্রশ্ন: আপনি বরাবরই ‘ফাইটার’ হিসেবে পরিচিত। এই মানসিক জোর আসে কোথা থেকে?
লিয়েন্ডার: আমি খুব বড়সড় গড়নের খেলোয়াড় নই। ছোটবেলা থেকেই বুঝেছি, শারীরিক শক্তিতে অনেকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। তাই নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়েছি মনকে।
আমার বাবা একজন অলিম্পিয়ান ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি—”হার মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু লড়াই ছাড়া হার নয়।”

প্রশ্ন: আপনার খেলার ধরন বরাবরই আক্রমণাত্মক—নেট প্লে, ভলি, দ্রুত সিদ্ধান্ত। এই স্টাইল কীভাবে তৈরি হল?
লিয়েন্ডার: আমি জানতাম, বেসলাইন থেকে লম্বা র‍্যালিতে অনেকের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া কঠিন। তাই নিজের শক্তিটাকে অস্ত্র বানিয়েছি। দ্রুত নেটে ওঠা, প্রতিপক্ষকে সময় না দেওয়া—এই কৌশলই আমার খেলার পরিচয়। এটা শুধু টেকনিক নয়, মানসিক সিদ্ধান্তও। সাহস না থাকলে অন্তত টেনিস খেলা যায় না।

প্রশ্ন: ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ—ওটা কি আপনার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত ছিল?
লিয়েন্ডার: নিঃসন্দেহে। তখন ভারত টেনিসে অলিম্পিক পদক পাবে এটা কেউ কল্পনাও করেনি। আমি নিজেও ভেঙে পড়েছিলাম অনেকবার সেই সময়। কিন্তু যখন পদকটা জিতেছিলাম, মনে হল—”এটা শুধু আমার নয়, গোটা ভারতের জয়।”

প্রশ্ন: ডাবলস ও মিক্সড ডাবলসে আপনার সাফল্য অভাবনীয়। সিঙ্গলস ছেড়ে ডাবলসে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা কঠিন ছিল?
লিয়েন্ডার: অবশ্যই খুব কঠিন। সিঙ্গলস খেলোয়াড় হিসেবে আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খেলাধুলায় ইগোর জায়গা নেই। বহুক্ষেত্রে নিজের শক্তি আর সীমাবদ্ধতা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ডাবলস আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে—আর আমি সেই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছি। তাই যখন সামনে যে সুযোগ আসে সেটা গ্রহণ করাটা বুদ্ধিমানের।

প্রশ্ন: ডেভিস কাপে আপনার অবদান নিয়ে ভারতীয় দর্শকের আবেগ আলাদা। আর লিয়েন্ডার পেজ এর কাছে ডেভিস কাপ ঠিক কী?
লিয়েন্ডার: ডেভিস কাপ মানেই আবেগ, রাত জেগে খেলা, চোট নিয়ে খেলতে নামা আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই।ব্যথা, চোট, ক্লান্তি—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে খেলতে হয়েছিল। ওই ম্যাচে আমি নামতেই পারতাম না, তবু নেমেছি। কারণ দেশের হয়ে খেলাটা আমার কাছে কর্তব্য।
আমি বহুবার ব্যথা নিয়ে খেলেছি, কারণ জানতাম—এই ম্যাচটা দেশের জন্য। ডেভিস কাপ আমাকে শিখিয়েছে, টেনিস শুধু ব্যক্তিগত খেলা নয়, এটা দলগত দায়িত্বও।

প্রশ্ন: খুব চাপের মুহূর্তে—ম্যাচ পয়েন্ট, ডেভিস কাপের শেষ সেট—নিজেকে কীভাবে সামলান?
লিয়েন্ডার: আমি শ্বাসের ওপর মন দিই। বড় মুহূর্তে স্কোরবোর্ড দেখলে চলবে না। আমি নিজেকে বলি—“একটা পয়েন্ট, শুধু একটা পয়েন্ট।” ভবিষ্যৎ বা ফল নিয়ে ভাবলে চাপ বাড়ে। বর্তমানটাই আসল। আমি এটাতে বিশ্বাস করি।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত জীবন বা খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন সমালোচনা হয়েছে, তখন নিজেকে কীভাবে সামলেছেন?
লিয়েন্ডার: সমালোচনা আসবেই। সবাইকে খুশি রাখা অসম্ভব। আমি শিখেছি—যেটুকু নিয়ন্ত্রণে আছে, সেটুকুতেই ফোকাস করতে। যেগুলো নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো ছেড়ে দিতে হয়। না হলে নিজের খেলা নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: কোর্টের বাইরে আপনি অনেক সময় ব্যক্তিগত একাকীত্বের কথাও বলেছেন।
লিয়েন্ডার: চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একটা মূল্য আছে। ভ্রমণ, চাপ, প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে জীবনে একাকীত্ব আসে। কিন্তু আমি কোনওদিন সেটাকে আমার দুর্বলতা হতে দিইনি। যখনই একা থাকার সুযোগ পেয়েছি বা পাই; সেই সময় নিজেকে আরও ভালো করে চিনেছি বা এখনো চেনার চেষ্টা করি। এই সময়টা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত করেছে, এখনো করে আর ভবিষ্যতেও করবে। নিজেকে ইন্ট্রস্পেক্ট করাটা খুব প্রয়োজন। এছাড়া একা সময় পেলে বই পড়ি, গান শুনি, নিজের সঙ্গে কথা বলি। একা থাকাকে আমি শত্রু বানাইনি। বরং সেটাকে নিজের শক্তি বানিয়েছি।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত জীবন থেকে কি খেলার জন্য কিছু ত্যাগ করতে হয়েছে?
লিয়েন্ডার: অনেক কিছুই। পরিবার, সম্পর্ক, স্বাভাবিক জীবন—সবকিছুরই একটা দাম দিতে হয়। কিন্তু আমি অভিযোগ করি না। কারণ আমি নিজের স্বপ্নটাই বেছে নিয়েছিলাম।

প্রশ্ন: আপনার ডায়েট ও ফিটনেস রুটিন কেমন?
লিয়েন্ডার: আমি বরাবরই সিম্পল খাবারে বিশ্বাসী। বেশি প্রোটিন, হালকা কার্বোহাইড্রেট, প্রচুর জল। ম্যাচের আগে ভারী খাবার নয়। ফিটনেস মানে শুধু জিম নয়—ঘুম, রিকভারি, শৃঙ্খলা—সব মিলিয়েই একজন “অ্যাথলিট” তৈরি হয়।

প্রশ্ন: আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য আপনার ‘গোল্ডেন রুল’ কী?
লিয়েন্ডার: প্রতিভা অনেকেরই থাকে। কিন্তু ধারাবাহিকতা খুব কম জন বহন করেন। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন—”আজ আমি কি গতকালের থেকে একটু ভালো খেললাম?” আর একটা কথা—দেশের হয়ে খেলাটা কখনও বোঝা মনে করবেন না। এটা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।
তিনটে কথা মনে রাখুন—
১) শৃঙ্খলা প্রতিভার থেকেও বড়।
২) প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে ভালো করার চেষ্টা করুন।
৩) দেশের জার্সিকে কখনও হালকা ভাবে নেবেন না।
—এগুলো মানতে পারলেই সাফল্য আসবেই।

প্রশ্ন: অবসর জীবনে ফিরে তাকালে কী মনে হয়?
লিয়েন্ডার: আমি কৃতজ্ঞ। টেনিস আমাকে পরিচয় দিয়েছে। শিখিয়েছে লড়াই করতে, হার মানতে নয়। যদি আবার জন্মাই, আবারও কোর্টেই ফিরব—হয়তো র‍্যাকেট হাতে, নয়তো কোনও তরুণ খেলোয়াড়ের পাশে দাঁড়িয়ে।

শেষ প্রশ্ন: নিজেকে এক লাইনে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
লিয়েন্ডার (হেসে): একজন সাধারণ মানুষ, যে অসাধারণ লড়াই করতে ভালোবাসে—ভারতের জন্য।

Related Articles

Back to top button