হিমালয়ের ঋষি মুনিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত সমর্পণ ধ্যান
পর্ব ১
আজ এই আলোচনায় ধ্যান বিষয়ে কিছু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস করা হচ্ছে। এত দিন আমরা জানতাম মুনি ঋষিরা ধ্যান করেন। কিন্তু আজকাল ডাক্তার বাবুরাও ধ্যান করতে বলছেন সুস্থ জীবন পাবার জন্য। অর্থাৎ যেটা আমরা এতদিন মনে করতাম কেবলমাত্র ধার্মিক বা আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড সেটা আজ সুস্থ জীবন লাভের উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাহলে এ-দুটো কি একই না আলাদা আলাদা! প্রশ্ন মনে জাগাটা স্বাভাবিক।
এই আলোচনার মাধ্যমে আপনাদের কিছু প্রশ্নের সমাধান হলে, আপনারা জীবনে শান্তি অনুভব করলে, জীবনকে ইতিবাচক ভাবে দেখতে পারলে, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে বুঝতে পারলে, আরও সুস্থ নীরোগ আনন্দময় জীবনের পথে হাঁটতে পারলে, এই প্রয়াস সফল হবে।আমাদের এই আলোচনা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে।
ধ্যান হলো নিজেকে অনুভব করা। এই অনুভব কিন্তু কথায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। শুধুমাত্র ইঙ্গিত করা যায়। বাক্যের সাহায্যে একে যতই প্রকাশ করার চেষ্টা করা হোক তা অপূর্ণই থেকে যায়, যদি না নিয়মিত অভ্যাস করে এই অনুভবের রসাস্বাদন করা হয়।
ধীর,স্থির,শান্ত,নীরোগ ও নির্ভীক জীবন পাওয়ার অতি প্রাচীন পদ্ধতি হল ধ্যান। এর প্রাচীনত্ত্ব নিয়ে একটু অনুসন্ধান করা যাক —যোগ বশিষ্ঠ বলছে , ধ্যান হলো ব্যক্তি সত্তা ও তার অন্তিম অস্তিত্বের মধ্যে সেতুবন্ধন।
‘মন হলো বাজনা, আর ধ্যান হলো সংগীত’,
‘ধ্যানে অস্তিত্ব তার সত্য প্রকৃতি কে অনুভব করে’। ‘ ধ্যান হলো মুক্তির দ্বার(গীতা)’। এরকম আরও অনেক আলোচনা উল্লেখ করা যায় । কিন্তু এই উল্লেখ ধ্যানের গুরুত্ব বোঝানোর একটা চেষ্টা মাত্র।
আপনারা বলতে পারেন এত মহাত্মারা যখন বলে গেছেন তাহলে লোকে ধ্যান করছে না কেন? ঠিকই বলেছেন। আমরা যখন কোন সমস্যায় পড়ি, মন বিচলিত হয়, মনে হয় আমার দ্বারা কিছুতেই এর সমাধান হবার নয়। তখন প্রথমে আমাদের বিশ্বাস মত কোন শক্তির কাছে প্রার্থনা করি, নিজেকে সমর্পনও করে দিই। আমরা জেনে এসেছি এই শক্তি বাইরে রয়েছে,এই শক্তিকে আমাদের বাইরে খুঁজতে হবে। তাই মন্দিরে যাই, মসজিদে যাই, গীর্জায় যাই, তীর্থে যাই।
তখন যদি এমন কোনো মহান ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় যিনি এই শক্তিকে নিজের জীবনে অনুভব করেছেন, আর সামনে এসে বলেন তুমি যাঁকে খুঁজছ তিনি তোমার ভিতরেই আছেন। তখন আমরা চমকে উঠি, কারণ তাঁর এই বলার মধ্যে তাঁর জীবনের সত্য অনুভবের দ্যূতি এমন ভাবে প্রকাশিত হয় যে আমরা নিজের ভিতরে নিজেরই অজান্তেই চোখ ফেরাই। আমাদের ধ্যানের প্রারম্ভ হয়।
কিন্তু তেমন মানুষকে চিনব কেমন করে?একেবারে বাস্তব কথা। যেমন ধরুন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সেই যুগে মানুষ ঈশ্বর মানলে মহাভারতের যুদ্ধই হতো না নিশ্চয়। ভগবান শ্রী চৈতন্যের তিরোধান আজও রহস্য রয়ে গেছে। অল্প মানুষই তাঁকে মানতেন। ভগবান যীশুকে দেখুন, ক্রুশবিদ্ধ হতে হল। সাঁইবাবাও কম নির্যাতনের শিকার হননি । শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে তো পাগল ঠাকুর বলে সবাই দূরে ঠেলে দিয়েছিল। এ কথার অর্থ হল ভগবান বা সদগুরু বলে আজ যারা পূজিত তাঁরা তাঁদের কালে সাধারণ বলেই গণ্য হতেন। অর্থাৎ যুগে যুগে সদগুরুরা আসছেন মানব সমাজকে উদ্ধার করতে, ধ্যান সাধনার রাস্তা দেখাতে, মানুষকে অন্তর্মুখী হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগাতে, কিন্তু মানুষ বহির্মুখীই থেকে যাচ্ছে আর ধ্যান সাধনার থেকে বেশি অন্যান্য জাঁকজমক পূর্ণ কর্মকাণ্ডে সময় ব্যয় করছে । কিন্তু অন্তর্মুখী না হলে তো সত্য লাভ সম্ভব নয়।
জীবন্ত আধ্যাত্মিক পুরুষকে তাঁর সময় কালে চিনতে (অনুভব করতে) পারলে, তাঁর সান্নিধ্যে সাধনার অনুভূতি লাভ করলে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। যাঁদেরকে আমরা ঈশ্বর বলে মানি এমনকি তাঁদেরকেও সাধনা করতে গুরু সান্নিধ্যে যেতে হয়েছিল। তিনি শ্রীকৃষ্ণই হোন বা শ্রী রামকৃষ্ণ , সাঁই বাবাই হোন বা মীরাবাঈ, শ্রীরামচন্দ্রই হোন বা আদিগুরু শ্রী শংকরাচার্য, সবাইকেই গুরু সান্নিধ্যে সাধনা করতে হয়েছে। তাই পরমাত্মা এ যুগে তার যে মাধ্যমকেই পাঠান না কেন তাঁকে আগে চিনে, বুঝে, জেনে নিতে হবে তারপর তার সান্নিধ্য লাভের প্রশ্ন উঠছে। বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের প্রগতি এতটাই হয়েছে যে যেকোন মানুষের আধ্যাত্মিক গভীরতাকে পরিমাপ করা সম্ভব তার আভা মন্ডলকে দেখে। এই আভা মন্ডল বা অরা (aura) কির্লিয়েন ফটোগ্রাফির মাধ্যমে দেখা যায়।


