আত্মাশুদ্ধি

হিমালয়ের ঋষি মুনিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত সমর্পণ ধ্যান

পর্ব

*ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা*

শ্রী শিবকৃপানন্দজী বলেন ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা এক নয়। ধর্ম আমরা জন্ম সূত্রে পেয়ে থাকি। যে পরিবারে আমাদের জন্ম হয় সেই পরিবারের ধর্ম ই আমাদের ধর্ম বলে গণ্য হয়, যদিনা আমরা স্বেছায় ধর্ম পরিবর্তন করি। সাধারন ভাবে আমরা ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতাকে অভিন্ন বলে ভাবি। কিন্তু গোড়ার কথা হল একজন ধার্মিক মানুষ আধ্যাত্মিক মানুষ হতে পারেন কিন্তু একজন আধ্যাত্মিক মানুষ ধার্মিক মানুষ হতে পারেন না। তিনি বলেন একজন ধার্মিক মানুষের অবস্থা হল একটা নদীর মত। নদীর একটা অস্তিত্ব আছে, তার একটা নাম আছে, সেই ধার্মিক মানুষটিরও একটা অস্তিত্ব আছে, নাম আছে। অথচ একজন আধ্যাত্মিক মানুষ হলেন এমন একটি সাগর যেখানে অনেক নদী এসে মেশে। তাই মনে রাখতে হবে নদী গিয়ে সাগরে মেশে কিন্তু সাগর কখনও নদীতে গিয়ে মেশে না। আমরা যদি ধর্মের কথাই বলি তাহলে একটাই ধর্ম রয়েছে, সেটা ‘মানুষের ধর্ম’। আমরা যেগুলোকে ধর্ম বলি সেগুলো সবই উপাসনা পদ্ধতি। তাই এই বিশ্বে ধর্ম বলে যা রয়েছে সবই নানা রকমের উপাসনা পদ্ধতি। কিন্তু আধ্যাত্মিকতা হল একটা গন্তব্যের লক্ষ্য আর ধর্ম হল সেখানে পৌঁছানোর সিঁড়ি। আমরা সবাই কোনও না কোনও সিঁড়িতে জন্ম গ্রহন করেছি কিন্তু সেখানে বসে থাকাটা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য নয়। একে অতিক্রম করে যাওয়া আমাদের জীবনের উদ্দশ্য।

 

হিমালয়ে বসে গুরুরা গত ৮০০ বছর ধরে এই ধর্মগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে প্রত্যেকটি ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে মানবিকতার উন্মেষ ঘটানো। প্রত্যেকটা ধর্মই শিক্ষা দেয় ভালো কাজ কর, খারাপ কাজ করো না। প্রত্যেকটা ধর্মই কর্মের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এর মধ্যে পরমাত্মা কোথায়? মোক্ষ কোথায়? এমন কি আপনি ভালো কাজ করলেও তার ফল ভোগ করবার জন্য আবার জন্ম নিতে হবে। খারাপ কাজ করলেও আপনাকে ফল ভোগ করতে আবার জন্ম নিতে হবে। একমাত্র আধ্যাত্মিকতাই হল এক মাত্র পথ যার মাধ্যমে মানুষ মুক্তি পেতে পারে। যিনি আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছে গেছেন তিনি কখনো সিঁড়ির কথা বলবেন না। যদি কোন মানুষ কোন বিশেষ ধর্মের কথা বলেন তাহলে বুঝতে হবে তিনি এখনও সিঁড়িতে বসে আছেন গন্তব্যে পৌঁছোতে পারেন নি। আজকের দিনে আমরা দেখতে পাই সমস্ত অশান্তির মূলেই রয়েছে নানা ধরনের উপাসনা পদ্ধতি অনুসরণকারীদের মধ্যে বিভেদ এবং এই অশান্তি মানবতাকে হত্যা করছে। তাই ধর্মকে সিঁড়ি বানিয়ে আমাদের আধ্যাত্মিকতায় পৌঁছাতে হবে।

 

প্রত্যেকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান খুঁজছে, প্রত্যেকে শান্তি চায়, কিন্তু তার রাস্তাটা কী! এর একমাত্র রাস্তা হল ধ্যান, একমাত্র রাস্তা হল যোগ। স্বামীজীকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আমরা শান্তি কোথায় পাবো, কোথায় তাকে খুঁজবো? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ,যা বাইরে কোথাও নেই তাকে কোথায় খুঁজবেন? পরমাত্মা আর শান্তি হল একই মুদ্রার দুই পীঠ। যিনি পরমাত্মা কে লাভ করেছেন তিনি সহজেই শান্তির অধিকারী হন। পরমাত্মা হলেন জীবনের পূর্ণ সন্তষ্টি লাভ যা পেলে জীবনে আর কিছুই পাওয়ার থাকে না। কিন্তু সেই পরমাত্মা আমাদের বাইরে নেই, আমাদেরই ভিতরেই বসে আছেন। কিন্তু তাঁকে দেখবার জন্য আমাদের একটা আয়না দরকার হয়। যতক্ষণ না গুরুরূপী আয়না আমাদের জীবনে প্রবেশ করছেন আমরা অন্তর্মুখী হতে পারি না। গুরু একা আমাদের কাছে আসেন না তিনি সংগে নিয়ে আসেন ‘গুরু সাক্ষাৎ পরব্রহ্মের’ অনুভুতি। এই অন্তর্মুখী যাত্রা কে সাধারণ ভাষায় সাধনাও বলা হয়। এই সাধনা আমাদের শরীর, মন, বুদ্ধি, তিনটে নাড়ি,সাতটা চক্র এবং আত্মাকে নিয়ে এক দীর্ঘ পরিক্রমা যা আমাদের শেষ পর্যন্ত আধ্যাত্মিকতার স্তরে উন্নিত করে। এ সবই অর্জন করা যায় ধ্যানের মাধ্যমে। কিন্তু এই ধ্যান শিখতে হয় একজন সমর্থ ও অধিকৃত গুরুর তত্ত্বাবধানে। এর মধ্যে একটা ফাঁদ আছে, আমরা সহজেই সেখানে পা দিয়ে ফেলি। গুরুকে যদি আমারই মত একজন সাধারণ মানুষ ভাবি তাহলে তাঁর বলা কথা গুলো সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে পারবো না। মনে রাখতে হবে তাঁর বলা প্রত্যেকটা কথার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ দিনের সাধনা লব্ধ অনুভূতি। যা শুনতে পাচ্ছি তার আড়ালে যে চৈতন্যের স্রোত বয়ে চলেছে তাকে যদি অনুভব করতে পারি তবে আমরা আধ্যাত্মিকতার স্তরে উন্নিত হবো।

স্বামী শ্রী শিবকৃপানন্দজী এরকমই একজন আধ্যাত্মিক সদ্গুরু। হিমালয়ের গভীর অরণ্যে দীর্ঘ ষোল বছরের তপস্যার শেষে তিনি সমাজে ফিরে আসেন এবং গত পঁচিশ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সমর্পণ ধ্যানের প্রচার ও প্রসার করেই চলেছেন। পৃথিবীর ৭২টা দেশে সাধকেরা এখন নিয়মিত সমর্পণ ধ্যান করেন। ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় আটটি আশ্রম তৈরী হয়ে গিয়েছে। মনে রাখতে হবে সমর্পণ ধ্যান নিঃশুল্ক। গুজরাটের নওসারী গ্রামে ২০০৪ সালে স্বামীজী পর পর আট দিন ধরে সমর্পণ ধ্যান সাধনা কি, সাধকেরা কেমন ভাবে সাধনা করবেন, এই পথে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার, ইত্যাদি নানা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। পরবর্তী সংখ্যায় সেই আলোচনার সংক্ষিপ্ত সার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে।

ক্রমশঃ

Related Articles

Back to top button