ঘাঘর বুড়ি মন্দির: রহস্য, ঐতিহ্য ও স্থানীয় বিশ্বাসে মোড়া এক অলৌকিক তীর্থক্ষেত্র
নুনিয়া নদীর ধারে আজও বাতাসে যেন ভেসে থাকে সেই বৃদ্ধা নারীর কণ্ঠ— “আমি এখানেই আছি… যারা ডাকে, তাদের রক্ষা করি।”

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাঁকুড়ার নুনিয়া নদীর তীরে শতাব্দীপ্রাচীন ঘাঘর বুড়ি মন্দির—যার নাম উচ্চারণ করলেই আজও স্থানীয় মানুষের মুখে উঠে আসে অলৌকিকতার গল্প, সতর্ক ভক্তির ইতিহাস এবং আদি জনজাতি-হিন্দু সংস্কৃতির এক বিরল মিলনস্থল। পাথরের তিনটি শিলামূর্তি ঘিরে গড়ে ওঠা এই মন্দিরকে অনেকে বলেন, “জাগ্রত শক্তিপীঠ”—আবার অনেকে মনে করেন, এটি বাংলার অন্যতম শক্তিশালী স্বয়ংপ্রকাশিত শ্মশানকালীর আসন।
স্বপ্নাদেশ ও স্বয়ংপ্রকাশিত দেবীর পিণ্ড
স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত, মন্দিরের সূচনা রহস্যময় এক স্বপ্নাদেশে। দরিদ্র পুরোহিত কাঙালিচরণ চক্রবর্তী প্রতিদিন নুনিয়া নদী পেরিয়ে পাশের গ্রামে পূজা করতে যেতেন। দীর্ঘ পথ হাঁটতে হাঁটতে একদিন নদীর ধারে গাছের তলায় ক্লান্ত শরীরে ঘুম ভেঙে তিনি দেখেন—এক বৃদ্ধা নারী, রূপে অচেনা কিন্তু শক্তিতে অপরূপ। তিনি নিজেকে ‘ঘাঘরবুড়ি’ বলে পরিচয় দিয়ে জানান, তাঁর কোলেই তিনটি অদ্ভুত পাথরের ঢিবি রয়েছে, সেখানেই স্থাপন করতে হবে মন্দির। ঘুম কাটতেই কাঙালিচরণ সত্যিই পান তিনটি শিলাখণ্ড—যাকে আজও পূজা করা হয়।

মাঝখানে মা ঘাঘরবুড়ি, বাঁ পাশে মা অন্নপূর্ণা, আর ডান পাশে পঞ্চানন মহাদেব। তিনটি পাথর আজও রূপার গহনা, লাল শাড়ি, নানারকম ফুল ও চন্দন দিয়ে সাজিয়ে জাগ্রত শক্তিরূপে প্রণম্য।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, এই শিলামূর্তি “মানব হাতের গড়া নয়”—এটাই বিশ্বাসকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
সাঁওতাল সমাজের হাতে একদিনের ‘মন্দির-শাসন’: ধর্মীয় ঐক্যের অনন্য নজির
ঘাঘরবুড়ি মন্দিরের আরেক অনন্য দিক হল, প্রতি বছর ১লা মাঘ মন্দিরের মালিক পক্ষ একদিনের জন্য দায়িত্ব হস্তান্তর করেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের হাতে। এ এক বিরল দৃশ্য।
যেদিন রাজধানী ও শহরে ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে উত্তাপ বাড়ে, সেদিন এই ছোট্ট গ্রামে দেখা যায় হিন্দু—আদিবাসী মিলনের এক অদ্বিতীয় উদাহরণ। সাঁওতাল সমাজ ঢাক, মাদল, বাঁশি বাজিয়ে দেবীর পূজা করে, আর গ্রামের হিন্দুরা দাঁড়িয়ে তা দেখেন শ্রদ্ধার সঙ্গে।
এই রীতি অন্তত ২০০ বছরের, এমনটা দাবি করেন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা। নুনিয়া নদীর পারে তখন সাঁওতাল সমাজের বড় বসতি ছিল, তাঁদের দেবী ‘ঘাঘর’ থেকেই মন্দিরের নাম ঘাঘরবুড়ি—এমন ব্যাখ্যাও অনেকে দেন।
অভিশপ্ত বরযাত্রীর কাহিনি: নদীর গর্ভে অদৃশ্য এক দল
ঘাঘরবুড়ি মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত কিংবদন্তি হল অভিশাপের গল্প। অনেক বছর আগে নুনিয়া নদী হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। নদী পার হতে না পেরে এক বরযাত্রী দল দেবীর কাছে মনের প্রার্থনা করে। অলৌকিকভাবে জল নেমে যায়, সবাই পার হয়ে যায় নিরাপদে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মতো দুটি ছাগল বলি দেওয়া হয়নি। স্থানীয় বিশ্বাস, দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে পুরো বরযাত্রী দলকে নদীর জলে ডুবিয়ে দেন। আজও সেই স্থানে দেখা যায় পাথরের চাঁই, যাকে স্থানীয়েরা বলেন—“অভিশপ্ত বরযাত্রীর স্মৃতি।” বর্ষার সময় ওই জায়গায় জলঘুর্ণি সৃষ্টি হয়—গ্রামবাসীরা মনে করেন, সেটাই দেবীর ‘চিহ্ন’।
অলৌকিক শক্তির উপস্থিতি: মনোবাঞ্ছা পূরণের অগণিত গল্প
মন্দিরে এলেই দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষের মন থেকে বানানো লাল সূতার মানত।
সন্তানপ্রীতি, রোগমুক্তি, কর্মলাভ, সংসারে শান্তি, মোকদ্দমা থেকে রেহাই—নানা কারণে ভক্তরা প্রতি সপ্তাহে এখানে ভিড় করেন। অনেকে বলেন, মানত করলে ‘ঘাঘরবুড়ি’ ফেরান না কাউকে।
স্থানীয় পুজারিরা জানান—
“এখানে যা চাওয়া হয়, দেবী তা পূর্ণ করেন বলেই ভিড় বাড়ছে। বহু মানুষ আছে যারা প্রায় শেষমুহূর্তে এসে আশ্চর্যভাবে সুস্থ হয়েছেন।”
গ্রাম পঞ্চায়েতের মতে, বছরভর গড়ে ৩–৪ লক্ষ ভক্ত এখানে আসেন। বিশেষ করে মাঘী পূর্ণিমা ও চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলা বসে—যেখানে আদিবাসী নৃত্য, লোকগান, কীর্তন ও গ্রামীণ হাটের সমাগমে উৎসবের রূপ নেয়।
নুনিয়া নদী: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
এই নদীকে কেন্দ্র করেই ঘাঘরবুড়ি মন্দিরের রহস্য আরও গভীর। বর্ষায় নদীর জলের রং বদলে যায়, ভেসে আসে ছোট পাথর, অনেকের দাবি—এগুলোই ‘বরযাত্রী পাথর’। আবার অনেকে বলেন, নদীর এক বিশেষ অংশে আজও অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়, যা ভক্তদের মতে দেবীর ‘অবস্থান’। তবে ভূতত্ত্ববিদরা বলেন—জলের নিচে শৈলস্তুপ থাকলে এমন প্রতিধ্বনি হওয়া স্বাভাবিক।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার এই দ্বন্দ্বই মন্দিরকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
লোকআর্কাইভ ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ
সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর ও নৃতত্ত্ব বিভাগ ঘাঘরবুড়ি মন্দিরকে গবেষণার জন্য তালিকাভুক্ত করেছে।
কারণ—
স্বপ্নাদেশ-ভিত্তিক মন্দির গঠনের ইতিহাস
আদিবাসী–হিন্দু আচার মিশ্রণের দীর্ঘ ঐতিহ্য
শিলাখণ্ডের অমানবিক আকৃতি
বার্ষিক মানত-সংস্কৃতি ও নারী-শক্তির পূজার প্রতীকত্ব
গবেষকদের মতে, এই মন্দির “লোকবিশ্বাসের এক জীবন্ত আর্কাইভ”—যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, সমাজবিজ্ঞান, পুরাণ এবং জনজীবনের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে গেঁথে আছে।
ঘাঘরবুড়ি মন্দির শুধু একটি ধর্মস্থল নয়—এটি এক রহস্যময় সাংস্কৃতিক-নৃতাত্ত্বিক কেন্দ্র, যেখানে লোককাহিনি, অলৌকিকতা, সামাজিক ঐক্য ও আদি বিশ্বাস যুগের পর যুগ ধরে বেঁচে আছে।
নুনিয়া নদীর ধারে আজও বাতাসে যেন ভেসে থাকে সেই বৃদ্ধা নারীর কণ্ঠ—
“আমি এখানেই আছি…
যারা ডাকে, তাদের রক্ষা করি।”
এই বিশ্বাসই মানুষকে বারবার টেনে আনে বাঁকুড়ার সেই ছোট্ট কিন্তু বিস্ময়ভরা মন্দিরে—মা ঘাঘরবুড়ির চরণে।
ঘাঘর বুড়ি মন্দির কোথায়?
ঘাঘর বুড়ি মন্দিরটি অবস্থিত—
জেলা: বাঁকুড়া
ব্লক: সিমলাপাল
গ্রাম: ঘাঘরডাঙ্গাল / নুনিয়া নদীর তীরসংলগ্ন এলাকা
বাঁকুড়া শহর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৪০–৪৫ কিলোমিটার দূরে। সিমলাপাল বাজার থেকে প্রায় ৭ কিমি ভিতরে নুনিয়া নদীর ধারে এই মন্দির। অনেকের মতে ‘ঘাঘরডাঙ্গাল’ ও আশপাশের কয়েকটি গ্ৰামের নাম থেকেই মন্দিরের নাম ‘ঘাঘর বুড়ি’ হয়ে ওঠে।
কীভাবে পৌঁছানো যায়?
১. বাঁকুড়া থেকে
বাঁকুড়া শহর → কাটাশর → সিমলাপাল → ঘাঘর বুড়ি মন্দির
দূরত্ব: প্রায় ১.৫–২ ঘণ্টা
পরিবহণ:
বাঁকুড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সিমলাপালগামী বাস
সিমলাপাল থেকে অটো/টোটো/জিপে সরাসরি মন্দির পর্যন্ত রুট পাওয়া যায়
২. কলকাতা থেকে
কলকাতা → বিষ্ণুপুর / বাঁকুড়া → সিমলাপাল → ঘাঘর বুড়ি মন্দির
পরিবহণ:
হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে বাঁকুড়া বা বিষ্ণুপুর
সেখান থেকে সিমলাপালগামী বাস/গাড়ি
সিমলাপাল বাজার থেকে টোটো/অটো/ম্যাক্স গাড়িতে মন্দির
কলকাতা থেকে মোট যাত্রার সময়: ৫–৬ ঘণ্টা
৩. কাছাকাছি স্টেশন
বিষ্ণুপুর স্টেশন (মন্দির থেকে প্রায় ৫০–55 কিমি)
বাঁকুড়া স্টেশন (প্রায় ৪৫–৫০ কিমি)
স্টেশন থেকে সিমলাপাল পর্যন্ত নিয়মিত বাস/গাড়ি পাওয়া যায়।
৪. রাস্তা
মন্দিরের শেষ ১.৫–২ কিলোমিটার রাস্তা গ্রামের কাঁচা রাস্তা, তবে দিনে সবসময়ই গাড়ি যেতে পারে।
মন্দির কখন খোলা থাকে? (পূজা সময়সূচি)
ঘাঘর বুড়ি মন্দিরে নিয়মিত পূজা হয়, এবং ভক্তদের জন্য সময়সীমা রয়েছে—
প্রতিদিন খোলা:
ভোর ৫টা → দুপুর ১টা পর্যন্ত
তারপর মন্দির বন্ধ থাকে কিছু সময়।
বিকেল সন্ধ্যা:
বিকেল ৪টা → রাত ৮টা পর্যন্ত
বিশেষ দিনে (মাঘী পূর্ণিমা, চৈত্রসংক্রান্তি, মনসা পূজা, মঙ্গলবার/শনিবার)
মন্দির রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে ভিড় অনুযায়ী।
সাপ্তাহিক বিশেষ দিন:
মঙ্গলবার ও শনিবার এই দুই দিনে ভক্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা (ভ্রমণকারীদের জন্য)
১. নুনিয়া নদীর ওপর ছোট সেতু আছে, গাড়ি সহজেই আসে। বর্ষায় গেলে নদীর জল বাড়তে পারে—তাই স্থানীয়দের পরামর্শ নিতে হয়।
২. মন্দির চত্বরে প্রাণী বলি কিছু বিশেষ আচার আচরণের অংশ—সংবেদনশীল দর্শকদের আগে জানা উচিত।
৩. মন্দির চত্বরে ফটোগ্রাফি অনেক সময় সীমিত—পুরোহিতের অনুমতি নেওয়া ভালো।


