শ্রীশ্রীমায়ের ১৭৩তম জন্মতিথি : মাতৃশক্তির চিরজাগ্রত প্রত্যাবর্তন
“একজনকে যদি একটু সুখ দিতে পারো, তাতেই তোমার জন্মসার্থক।”

আজ ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২। আজই পূণ্যতিথি—শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীর ১৭৩তম জন্মদিবস। আমাদের জীবনে মাতৃশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। যুগে যুগে মানবসভ্যতাকে সঠিক পথ দেখাতে তিনি ফিরে আসেন নানা রূপে—তারই এক অবিচ্ছেদ্য প্রকাশ শ্রীশ্রীমা। ঠাকুর বা স্বামীজিকে কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু শ্রীশ্রীমার মাতৃস্নেহ, মমতা, সহনশীলতা—এসব উপেক্ষা করা যায় না কোনোভাবেই।
আজ বলবো ঠাকুর-শ্রীশ্রীমার জীবনের সেই বিশেষ অধ্যায়—ষোড়শী পূজা, যে ঘটনা বহু ভক্ত জানলেও বিশদ রূপে অনেকে জানেন না।

ঠাকুর-শ্রীশ্রীমা : ষোড়শী পূজার আলোকময় রাত
সম্ভবত ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মে, বঙ্গাব্দ ১২৮০ সালের ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, দিনটি ছিল ফলহারিণী অমাবস্যা। সন্ধ্যায় দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণীর এক বিশেষ পূজায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ঠাকুরের ভাগ্নে হৃদয়। কিন্তু সেদিন ঠাকুর অবস্থান করছিলেন মন্দিরসংলগ্ন একটি নির্জন কক্ষে—সেখানে চলছে এক বিরল পূজা, তাঁর সাধনার গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব।
রাত ন’টা নাগাদ শ্রীশ্রীমা এলেন। তাঁর তখন কম বয়স, এত নিয়ম-আয়োজন দেখে বিস্মিত হলেন। ঠাকুরের নির্দেশমতো আসনে বসতেই শুরু হল অদ্বিতীয় ষোড়শী আরাধনা।
ঠাকুর জলধারা অর্পণ করে উচ্চারণ করেন—
“হে বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর।
ইহার (সারদা দেবীর) শরীর-মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন করো।”
ন্যাসের মধ্যেই নিমগ্ন হয়ে গেলেন মা—ঠাকুরও তখন তন্ময়।
এক সাধক ও তার আরাধ্যা শক্তির মিলনমুহূর্ত—শুধু দু’জন, বাকি সব যেন মুছে গেছে।
পূর্ণরাতের আরাধনার শেষে ঠাকুর নিজ হাতে শ্রীশ্রীমাকে ভোগ খাইয়ে দিলেন। যেন দেবতা তাঁর শক্তির কাছে নিজেই অর্ঘ্য অর্পণ করছেন।
ঠাকুর পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে স্তব করলেন—

“হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকারিণি,
হে শরণদায়িনি ত্রিনয়নি, শিবগেহিনী গৌরী—
তোমাকে প্রণাম, তোমাকে প্রণাম করি।”
এই রাতেই ঠাকুর উপলব্ধি করেন—শ্রীশ্রীমা আর কেউ নন, স্বয়ং আদ্যাশক্তি।
এক দম্পতির চেয়েও বেশি—দুই সাধকের সত্তার তপস্যাময় সম্পর্ক।

মা সারাজীবন ঠাকুরকে সেবার মধ্য দিয়ে আরাধনা করেছেন; আবার ঠাকুর নিজে মাকে আরাধনা করেছেন ষোড়শী রূপে।
আজকের দাম্পত্যের ভাঙাচোরা বাস্তবতার মধ্যে এই পারস্পরিক সমর্পণই পথ দেখায়—
কৈলাসের মহেশ্বর-পার্বতীর মতোই তাঁদের সম্পর্ক ছিল আদর্শ।
শ্রীশ্রীমায়ের চরণে শতকোটি প্রণাম।
আজ সারা বিশ্বে শ্রীশ্রীমার জন্মতিথি কীভাবে পালিত হচ্ছে:
আজ শুধু ভারতেই নয়—প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা লক্ষাধিক ভক্ত নানা দেশে শ্রীশ্রীমার জন্মদিবস পালন করছেন। বিভিন্ন রামকৃষ্ণ মঠ-মিশন কেন্দ্র ও স্বাধীন সারদা আশ্রমে চলছে বিশেষ অনুষ্ঠান, পাঠ, আলোচনা।

১. বেলুড় মঠ
মায়ের জন্মমন্দিরে বিশেষ পূজা ও আবাহন, ভোরবেলায় মঙ্গলারতি ও বেদপাঠ, ‘শ্রীশ্রীমা লীলাপ্রসঙ্গ’ পাঠ, সারাদিন ভক্তদের প্রসাদ বিতরণ, নারীদের জন্য বিশেষ মাতৃ-সঙ্গীত, কীর্তন, সন্ধ্যায় শান্তিপাঠ ও চণ্ডীপাঠ।
২. দক্ষিণেশ্বর
মায়ের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলিতে প্রদীপ প্রজ্বলন, বিশেষ কালীমন্দিরে আরতি, সারদা-মঙ্গল পাঠ, দরিদ্র ও যাত্রীদের প্রসাদ পরিবেশন।

৩. কলকাতার সারদা মঠ (উত্তরপাড়া, বারানগর, নরেন্দ্রপুর)
ভগিনী নিবেদিতার ভাবানুপ্রাণিত নারীদের যোগ, আশ্রমে বসবাসকারী ব্রহ্মচারিনী ও সন্ন্যাসিনীদের দ্বারা বিশেষ পূজা, মহিলাদের বৃহৎ মিছিল—“মা সরদার পথ ধরে” শোভাযাত্রা।
৪. ভারতের অন্যান্য রাজ্যে
চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ, দিল্লি, গড়পেটা, গুয়াহাটি সহ সমস্ত রামকৃষ্ণ মঠ-মিশন কেন্দ্রেই—
গীতাপাঠ, সারদা-তত্ত্ব আলোচনা, দ্রব্যদান, বাচ্চাদের জন্য ‘মা সরদা মূল্যবোধ কর্মশালা’, বিশেষ ভক্তিসঙ্গীত সন্ধ্যা।

৫. আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলো
USA, Canada, UK, Australia, Russia, Singapore, Japan, Brazil, South Africa—

প্রতিটি রামকৃষ্ণ সোসাইটি ও ভক্তকেন্দ্রে আয়োজন হচ্ছে—
সারদা দেবী চরণামৃত, ‘Gospel of Holy Mother’ আলোচনা, Universal Motherhood Symposium, Meditation Retreat, মা সরদার ছবি, জীবনাদর্শ, নিরানব্বইটি উপদেশ নিয়ে প্রদর্শনী।
বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও সিডনি কেন্দ্রগুলোতে ভক্তসংখ্যা অত্যন্ত বেশি—
আজ সারাদিন চলেছে মন্ত্রোচ্চারণ, কীর্তন, মঙ্গলমালা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

শ্রীশ্রীমা সারদা দেবী : সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তত্ত্ব
জন্ম: ১১ ডিসেম্বর ১৮৫৩ (১০ পৌষ ১২৬০), জয়রামবাটি
মহাপ্রয়াণ: ২১ জুলাই ১৯২০
পরিচয়: শ্রী রামকৃষ্ণের পত্নী, তপস্বিনী, সর্বজনের “মা”

মা সরদামনির জীবনের প্রতি মূল বার্তা:
১) “যার কাছে যা চাও, তার কাছে সেটাই হও”—সহনশীলতা ও দায়িত্বের শিক্ষা।
২) “একজনকে যদি একটু সুখ দিতে পারো, তাতেই তোমার জন্মসার্থক।”
৩) সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা—তিনি বলতেন, “সব পথই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোয়।”

৪) নারীশক্তির জাগরণ—তিনি প্রথম বলেছিলেন নারীরা সমাজের মেরুদণ্ড।
৫) নির্মল মাতৃস্নেহ—বিশ্বমানবের কাছে আশ্রয় ছিলেন তিনি।
৬) তার অবদান
৭) নারী শিক্ষার প্রসার
৮) দরিদ্রসেবা ও অসমর্থদের প্রতি সহমর্মিতা
৯) রামকৃষ্ণ সংঘের আধ্যাত্মিক ভিত্তি স্থাপন
১০) ভারতের নবজাগরণে প্রতীকী ভূমিকা

ঠাকুর বলেছিলেন—
“মা সারদা হলেন সকলের মা—ধর্ম, জাত, বর্ণের ভেদ নেই।”
আজকের দিনে তাঁর জন্মতিথি যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—
পারস্পরিক সমর্পণ, ভালোবাসা, দয়া ও সহনশীলতাই মানবজীবনের সত্য পথ।
শ্রীশ্রীমায়ের চরণে অনন্ত প্রণাম।
ভক্ত-সম্মেলন : বেলুড় মঠ, ডিসেম্বর ২০২৫ (অনুষ্ঠান-সূচী)
রামকৃষ্ণ মঠ, বেলুড় মঠ, হাওড়া – ৭১১২০২
শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণীর ১৭৩তম জন্মতিথি উপলক্ষে আয়োজিত
ভক্ত-সম্মেলন
২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

স্থান : ‘নাগ মহাশয় হল’, অভেদানন্দ কনভেনশন সেন্টার, বেলুড় মঠ
প্রবেশপত্রের মাধ্যমে যোগদান করা যাবে | প্রবেশ পত্র বেলুড় মঠের ‘মঠ অফিস’ থেকে পাওয়া যাচ্ছে | প্রবেশ দক্ষিণা : ২৫০/-
অনুষ্ঠান-সূচী
উপস্থিতি, মন্দির প্রণাম ও চা পান: সকাল ৮.০০ টা – ৯.০০টা
সকাল ৯.০০ টা – ১২.১৫ মিঃ
বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ (সন্ন্যাসি ও ব্রহ্মচারিবৃন্দ): সকাল ৯.০০ টা – ৯.১০ মিঃ
আশীর্বাণী : সকাল ৯.১০ মিঃ – ৯.৩০ মিঃ
পরম পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী গৌতমানন্দজী মহারাজ
সঙ্ঘাধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন
প্রারম্ভিক ভাষণ—‘ভক্ত-সম্মেলন’ : সকাল ৯.৩০ মিঃ– ৯.৪৫ মিঃ
স্বামী জ্ঞানব্রতানন্দজী মহারাজ
পাঠ—‘শ্রীশ্রীমায়ের কথা’ : সকাল ৯.৪৫ মিঃ – ৯.৫৫ মিঃ
স্বামী সুপ্রসন্নানন্দ মহারাজ
সমবেত জপ ও ধ্যান : সকাল ৯.৫৫ মিঃ – ১০.০৫ মিঃ
সমবেত-সঙ্গীত— ‘প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং…’: সকাল ১০.০৫ মিঃ – ১০.১৫ মিঃ
স্বামী সমসেব্যানন্দ মহারাজ
ভাষণ — ‘শ্রীশ্রীমা ও আদর্শ সংসার ধর্ম’ : সকাল ১০-১৫ মিঃ – ১০-৩০ মিঃ
স্বামী বলভদ্রানন্দজী মহারাজ
সহ-সাধারণ সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন
পাঠ —‘ যোগানন্দ-বাণী’ : সকাল ১০.৩০ মিঃ – ১০.৪০ মিঃ
স্বামী নিষ্ঠানন্দ মহারাজ
সমবেত জপ ও ধ্যান : সকাল ১০.৪০ মিঃ – ১০.৫০ মিঃ
ভাষণ— ‘করুণা পাথার জননী আমার’ : বেলা ১০.৫০ মিঃ – ১১.০৫ মিঃ
স্বামী দেবরাজানন্দ মহারাজ
সমবেত-সঙ্গীত—‘শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রেম-সুরধুনী’ : বেলা ১১.০৫ মিঃ – ১১.১৫ মিঃ
স্বামী মুক্তেশানন্দ মহারাজ
পাঠ—‘সারদানন্দ-বাণী’ : বেলা ১১.১৫ মিঃ – ১১.২৫ মিঃ
স্বামী নিত্যযোগানন্দ মহারাজ
সমবেত গীতাপাঠ (পঞ্চদশ অধ্যায়) : বেলা ১১.২৫ মিঃ – ১১.৩৫ মিঃ
বেলুড় মঠের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ব্রহ্মচারিবৃন্দ
পাঠ—‘প্রেমানন্দ বাণী’ : বেলা ১১.৩৫ মিঃ – ১১.৪৫ মিঃ
স্বামী আদিবিদ্যানন্দ মহারাজ
সমাপ্তি ভাষণ—‘আমাদের সকলের মা’ : বেলা ১১.৪৫ মিঃ – দুপুর ১২.০৫ টা
পূজনীয় শ্রীমৎ স্বামী সুবীরানন্দজী মহারাজ
সাধারণ সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন
সমবেত সমাপ্তি-সঙ্গীত—‘রামকৃষ্ণ শরণম…’ : দুপুর ১২.০৫ টা – ১২.১৫ মিঃ
পরিচালনা— স্বামী ইষ্টসেবানন্দ মহারাজ
প্রসাদগ্রহণ: দুপুর ১২.৩০মিঃ – ১.১৫টা
অনুষ্ঠান পরিচালনা
স্বামী মহাপ্রজ্ঞানন্দ মহারাজ ও স্বামী বেদার্থানন্দ মহারাজ।


