আত্মাশুদ্ধি
Trending

“ত্রৈলঙ্গস্বামী — কাশীর চলমান শিব, বৈরাগ্যের জীবন্ত দর্শন”

কাশীর ঘাটে হয়তো আজও ভেসে বেড়ায় তাঁর নিঃশব্দ পদচিহ্ন— গঙ্গার জলে, বাতাসে, আর মানুষের চেতনায়।

 

পিটিআই, ঈশানী মল্লিক: আজ পৌষ মাসের শুক্লা একাদশী। এই তিথিতেই আবির্ভাব হয়েছিল এক বিস্ময়কর সাধকের— ত্রৈলঙ্গস্বামী। ভারতীয় সাধনা-পরম্পরায় যাঁরা মানবজীবনের সীমা ছাপিয়ে গেছেন, যাঁদের উপস্থিতি লোককথা ও ইতিহাসের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে এক রহস্যময় জ্যোতি হয়ে আজও জ্বলে— ত্রৈলঙ্গস্বামী তাঁদের অন্যতম। কাশীর ঘাটে ঘাটে, গঙ্গার স্রোতে, নগ্ন অথচ নির্লিপ্ত এই সাধককে মানুষ ডাকত— “কাশীর চলমান শিব”।

প্রায় তিন শতকের জীবন, একটিই সাধনা

লোকশ্রুতি ও নানা সাধুস্মৃতি অনুযায়ী ত্রৈলঙ্গস্বামী প্রায় ২৮০ বছর জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ জীবনকাল কোনও জাগতিক সাফল্যের নয়— একমাত্র লক্ষ্য ছিল আত্মসাধনা। কথিত আছে, কঠোর তপস্যার মাধ্যমে তিনি মহাদেবকে নিজের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই তাঁর শরীর-মন প্রকৃতির নিয়ম মানত না। চরম শীত, ভয়াবহ গ্রীষ্ম, ক্ষুধা, তৃষ্ণা— কোনও কিছুই তাঁর উপর প্রভাব ফেলতে পারত না। কখনও তপ্ত বালির উপর নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা, কখনও বরফ-শীতল গঙ্গাজলে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকা— এসবই ছিল তাঁর দৈনন্দিন সাধনার অঙ্গ।

গঙ্গার বুকে অলৌকিক লীলা

কাশীর গঙ্গাবক্ষে ভেসে থাকা ত্রৈলঙ্গস্বামীর সঙ্গে উজ্জয়িনীর মহারাজার সেই বিখ্যাত সাক্ষাৎ আজও লোককথায় জীবন্ত। রাজকীয় নৌকা যখন কাশীর দিকে এগিয়ে আসছে, তখনই দৃষ্টিতে পড়েন জলে ভাসমান এই নগ্ন সাধক। রাজপরিষদের মুখে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে রাজা তাঁকে নৌকায় আমন্ত্রণ জানান। আশ্চর্যজনকভাবে, কোনও আহ্বান ছাড়াই ত্রৈলঙ্গস্বামী যেন রাজার মন পড়ে ফেলেই নৌকায় উঠে পড়েন।

নৌকায় বসে রাজার কোমরে ঝোলানো মণিমুক্তাখচিত তলোয়ারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি। রাজা সম্মানের খাতিরে সেই তলোয়ার স্বামীজীর হাতে দিলে— মুহূর্তের মধ্যেই তা গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন ত্রৈলঙ্গস্বামী।

অহংকারের আয়নায় রাজাকে দাঁড় করানো

এই ঘটনাতেই রাজার ক্রোধ বিস্ফোরিত হয়। ইংরেজদের দেওয়া মূল্যবান উপহার— এমন তলোয়ার গঙ্গায় ফেলে দেওয়া! সন্দেহ, অবিশ্বাস আর রাগে রাজা ডুবুরি নামান। কিন্তু সেখানেই ঘটে অলৌকিক ঘটনা— জল থেকে উঠে আসে দুটি একেবারে অভিন্ন তলোয়ার।

ত্রৈলঙ্গস্বামী তখন রাজাকে বলেন, “তোমার জিনিস তুমি নিজেই চিনতে পারছ না, অথচ বলছ ‘আমার’!”

রাজা স্তব্ধ। এই নীরবতার মধ্যেই স্বামীজীর বাণী নেমে আসে— দম্ভই মানুষের সবচেয়ে বড় অন্ধকার। যে বস্তু মৃত্যু পার করেও সঙ্গে যাবে না, তাকে ‘নিজের’ বলে আঁকড়ে ধরাই মানুষের মূঢ়তা। এই নশ্বর দেহ একদিন ছাই হবে, তখন সঙ্গে যাবে কেবল কর্মফল— রাজ্য, তলোয়ার, ঐশ্বর্য নয়।

মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে এক সাধক

ত্রৈলঙ্গস্বামী সম্পর্কে আরও বহু অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত। একবার ব্রিটিশ শাসকের আদেশে তাঁকে কয়েদ করে লোহার শিকল ও ভারী পাথর বেঁধে গঙ্গায় নিক্ষেপ করা হয়। কিছু সময় পরেই দেখা যায়— শিকল-সহ তিনি ঘাটে বসে নির্বিকার। শিকল তাঁর শরীর ছুঁতেই পারেনি। এই ঘটনাই কাশীর সাধারণ মানুষের কাছে তাঁকে অলৌকিকতার শিখরে পৌঁছে দেয়।

কাশী ও ত্রৈলঙ্গস্বামী: এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

কাশী শুধু একটি শহর নয়— এটি মোক্ষভূমি। আর ত্রৈলঙ্গস্বামী যেন সেই মোক্ষের জীবন্ত ভাষ্য। তিনি কোনও আশ্রম গড়েননি, কোনও শিষ্যসংঘ তৈরি করেননি। তাঁর শিক্ষা ছিল উপস্থিতির মধ্যেই— জীবনের অনিত্যতা, বৈরাগ্য ও আত্মসমর্পণ।

আজকের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের ভোগবাদী সময়ে ত্রৈলঙ্গস্বামীর শিক্ষা আরও তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা সম্পদ, পরিচয়, ক্ষমতার মোহে যতই ডুবে যাই— শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই: “আমরা এসেছি একা, যাবোও একাই।”

সাধকরা তাই উপদেশ দেন না— আয়না ধরেন। ত্রৈলঙ্গস্বামী সেই আয়নাই ধরেছিলেন রাজা থেকে সাধারণ মানুষের সামনে।

আজ তাঁর আবির্ভাব তিথিতে স্মরণ হয় সেই মহাসাধককে।

ধন্য মাতা বিদ্যাবতী, যাঁর গর্ভে জন্ম নিয়ে এক মানব হয়ে উঠেছিলেন ঈশ্বরসাধনার অনন্য প্রতীক।

কাশীর ঘাটে হয়তো আজও ভেসে বেড়ায় তাঁর নিঃশব্দ পদচিহ্ন— গঙ্গার জলে, বাতাসে, আর মানুষের চেতনায়।

Related Articles

Back to top button