আত্মাশুদ্ধি
Trending

কল্পতরু উৎসব — ১ জানুয়ারির ভাবগম্ভীরতায় রামকৃষ্ণ দেবের আশীর্বাদ

এই দিবসটিকে ‘নতুন বছরের আধ্যাত্মিক আরম্ভ’ হিসেবে দেখা হয়—ভক্তরা দিনটি তাঁদের অন্তরঙ্গ আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক সমাধানের অনুরোধের সঙ্গে যুক্ত করেন। প্রচলিত মত অনুযায়ী কালপতরু-আশীর্বাদের অর্থ হলো সেই আশীর্বাদ যা মানুষের সত্যিকারের কল্যাণ ও মঙ্গলবোধে সহায়ক।

 

” তুমি সংসারে থেকে ঈশ্বরের প্রতি মন রেখেছ, এ কি কম কথা? যে সংসারত্যাগী সে তো ঈশ্বরকে ডাকবেই। তাতে বাহাদুরি কি? সংসারে থেকে যে ডাকে, সেই ধন্য! সে ব্যক্তি বিশ মন পাথর সরিয়ে তবে দেখে।”   – ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ 🌺

প্রতি বছর ১ জানুয়ারি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনে ঘটে যাওয়া এক ঐতিহাসিক আত্ম-উদ্ঘাটনের উপলক্ষে কল্পতরু দিবস বা কল্পতরু উৎসব পালিত হয়। উৎসবের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় কাশীপুর উদ্যানবাটিকে—সেই স্থানে ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি রামকৃষ্ণ দেব তাঁর শিষ্যদের কাছে ‘কালপতরু রূপে’ আশীর্বাদ করেছিলেন বলে চিরস্মরণীয় ঘটনা সংঘটিত হয়। আজও দিনটি রামকৃষ্ণ মিশন-মঠ এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, ভজন-পাঠে, বিশেষ পূজা-সংস্কারে ও ভক্ত আরাধনায় উদ্‌যাপিত হয়।

রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব — সংক্ষিপ্ত পরিচয়

রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬–১৮৮৬) ছিলেন কীর্তন-ভক্তিময় জীবনযাপনের জন্য পরিচিত এক বাঙালি সাধক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। মথুরা-কালকলঙ্ক বা ব্রাহ্মসমাজ থেকে প্রভাবিত এই যুগে তিনি নিজের ভক্তি, উপাসনা ও ধর্মীয় যুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক অনুসারী সংগ্রহ করেন। তাঁর ভাবনা ও শিক্ষায় স্বরূপচেতনা, সার-ধর্ম ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উৎসবের উৎপত্তি — ১ জানুয়ারি ১৮৮৬: কল্পতরু স্বীকৃতি

১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটিতে — যেখানে তখন অসুস্থ রামকৃষ্ণ দেব চিকিৎসারত ছিলেন — তিনি এক পর্যায়ে আত্ম-উদ্ঘাটন সঞ্চালন করেন। শিষ্যের অনুপ্রেরণায়, রবীন্দ্রসৃত ও শাস্ত্রীয় ভাষায় বর্ণিত স্মৃতিচারণের প্রেক্ষিতে তিনি অতল আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে শিষ্যদের আশীর্বাদ দেন; শিষ্যদের মধ্যে অনেকে অনুভব করেন যে তিনি সেই দিন ‘কালপতরু’—অর্থাৎ ইচ্ছা পূরণকারী পবিত্র বৃক্ষের সদৃশ আশীর্বাদ দিচ্ছেন। এরপর থেকেই ১ জানুয়ারি কল্পতরু দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; এই দিনটিকে রামকৃষ্ণ শিষ্যবৃন্দ ও ভক্তগণ বিশেষভাবে স্মরণ করে।

দক্ষিণেশ্বর মাতৃমন্দির :- কল্পতরু উৎসব এর প্রাক-মুহূর্তে আরো একবার সেই ঐতিহাসিক আখ্যান
রানী রাসমণির কাশী যাওয়ার পথে স্বয়ং মা কালী তাঁকে স্বপ্নে এই মন্দির তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। রানি রাসমণির স্বপ্নের মন্দির -দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর মন্দির শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের লীলাতীর্থ। জানবাজারের এই মন্দির তৈরি করতে তখনকার দিনে খরচ হয়েছিল ৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। ১৮৪৭-তে মন্দির নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৫৫-য়। প্রতিষ্ঠা হয় সেই বছরেই ৩১ শে মে, স্নানযাত্রার দিন।

১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরের স্থাপত্য দেখার মতো। গর্ভগৃহে সহস্র পাপড়ির রৌপ্য-পদ্মের উপর শায়িত শিবের বুকে দেবী কালী দন্ডায়মানা। একক কষ্টি পাথর কেটে ভবতারিণী মূর্তি নির্মাণ করেন শিল্পী নবীন ভাস্কর। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতে লেখা আছে যে,রাণী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বরের শ্রীমূর্তি দর্শন করে ভূধরের দাদা বললেন,”শুনেছি নবীন ভাস্করের নির্মাণ। “ঠাকুর বললেন,”তা আমি জানি না,জানি ইনি চিন্ময়ী। ”

কৈবর্তের গড়া মন্দির — তখনকার ব্রাহ্মণ সমাজ বয়কট করলেন। পূজারী হবেন না কেউ। অবশেষে হুগলির কামারপুর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এলেন পূজারী হয়ে। রামকুমারের পর তাঁর ভাই গদাধর দায়িত্ব নিলেন। কালচক্রে গদাধর হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। সাধক রামকৃষ্ণের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে জড়িয়ে দক্ষিণেশ্বরের এই মন্দির। তাঁর সারল্য ও মানবিক বোধের সংমিশ্রণে তিনি এখানে দেবী কালিকে ভবতারিণী রূপে উপাসনা করেন । শ্রী রামকৃষ্ণ বাসও করতেন মন্দির প্রাঙ্গণের উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি ঘরে, আজ যা মহাতীর্থ। রোজ হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন তাঁকে প্রণাম জানাতে। কাছেই পঞ্চবটি (অশ্বথ, বট, বিল্ব, অশোক ও আমলকী)। এখানে নিয়মিত সাধনায় বসতেন শ্রীরামকৃষ্ণ। মন্দির চত্বরে ঢোকার আগে রয়েছে রানি রাসমণির মন্দির। আর গঙ্গার পাড় ধরে রয়েছে দ্বাদশ শিবমন্দির। সুবিস্তীর্ণ মন্দির প্রাঙ্গণে আরেক দ্রষ্টব্য রাধামাধব মন্দির।

কলুশনাশিনী গঙ্গা তীরবর্তী এই মন্দিরে, মা ভবতারিণী এভাবেই সময় সময়ান্তরে ভক্তগণের মনে জাগিয়ে রাখুক চির ভক্তিরসের ভাবধারা।

কিভাবে পালন করা হয় — পূজা, আরতি ও ধর্মসভা

রামকৃষ্ণ মিশন ও সংশ্লিষ্ট মঠসমূহে কল্পতরু দিবস পালনের রূপরেখা মোটামুটি একই রকম থাকে, তবে কেন্দ্রভেদে আয়োজনে বিচরণ থাকে। সাধারণত কার্যসূচি থাকে —

১. প্রভাতী মঙ্গল আরতি ও ভজন।

২. বিশেষ পূজা-পাঠ এবং শাস্ত্রচারণা।

৩. সাংগীতিক উপস্থাপনা (ভক্তিগীত, কীর্তন)।

৪. দুপুরে আরতি ও ভোগ বিতরণ।

৫. বিকালে — ৩টা নাগাদ— মনে করিয়ে দেওয়া হয় সেই মুহূর্তের (যখন ঠিক রামকৃষ্ণ দেব আশীর্বাদ করেছিলেন) ধ্যান ও জপ—ভক্তরা একযোগে ধ্যান করে।

৬. বিভিন্ন মঠে স্বামী বা প্রসিদ্ধ বক্তারা কল্পতরু-অভিজ্ঞতা ও রামকৃষ্ণ শিক্ষার উপরে ভাষণ দেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন শহরের উপকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বেদান্ত সোসাইটিগুলোতেও একই দিনে প্রোগ্রাম ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়; একই পাঠ্যক্রম কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণের ভেদে সময় ও ক্রমে খানিক আলাদা হতে পারে।

ভক্ত-সমাগম ও পরিব্যবস্থা — কেমন হয় আয়োজন

কাশীপুর উদ্যানবাটি, দক্ষিণেশ্বর, বেলুরমঠ সহ অন্যান্য বড় কেন্দ্রে প্রতি বছর প্রচুর ভক্ত ভিড় করেন—নতুন বছরের প্রথম দিন হওয়ায় সাধারণ দর্শনার্থীর সঙ্গেও ভক্তেরা আসেন। সংবাদ রিপোর্ট ও স্থানীয় কভারেজে দেখা যায় বহু কেন্দ্রের সামনে ভক্তদের লম্বা সারি, সকাল বেলা থেকেই ভবঘুরে ভিড় এবং প্রায়শই স্থানীয় মিশন ও স্বেচ্ছাসেবকরা—(স্বামী-শিষ্য, তরুণ স্বেচ্ছাসেবক)—শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন। কিছু কেন্দ্রে নিরাপত্তা ও জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ও থাকে।

মিশন-স্তরে সাধারণ ব্যবস্থা থাকে:

১. ভোরে দরজা খোলা ও ধাপে ধাপে দর্শন;

২. প্রবেশ ও বহির্গমনের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত;

৩. বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য অগ্রাধিকার ব্যবস্থা;

৪. প্রসাদ (ভোগ) স্টেশান এবং মেডিক্যাল-সহায়তার জন্য একটি কৌঁসুলি।

এসবগুলো অভিজ্ঞ প্রথা—কেন্দ্রভেদে বিস্তারিত নির্দেশিকা আগে থেকেই মিশন পক্ষ থেকে জারি করা হয়।

কাশীপুর উদ্যানবাটি, বেলুর মঠ ও দক্ষিণেশ্বর: কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানের স্বরূপ

কাশীপুর উদ্যানবাটি—যেখানে রামকৃষ্ণ দেব শেষ জীবনের বহু সময় কাটিয়েছেন—কল্পতরু দিবসের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বেলুর মঠও এই দিনে বিশেষ পূজা-আয়োজন করে; দক্ষিণেশ্বরের মন্দির-প্রাঙ্গণেও ভক্তদের ঢল নামে। বেলুর মঠের ও কাশীপুর-উদ্যানবাটির ওয়েবপেজ ও সংবাদে কর্মসূচি, সময়সূচি ও বিন্যাসের তথ‍্য নিয়মিত প্রকাশিত হয়—ভক্তদের সুবিধার জন্য অনলাইনে প্রোগ্রাম-ইনভিটেশন ও নির্দিষ্ট দিনসূচি দেওয়া হয়।

আধ্যাত্মিক অর্থ ও জনমাধ্যমের অভিব্যক্তি

ঐতিহাসিকভাবে কল্পতরু ঘটনাটি কেবল মুখের আশীর্বাদের ঘটনা নয় — এটি শিষ্যদের কাছে রামকৃষ্ণ দেবের আত্ম-উদ্ভাস ও ধর্মীয় পরিচয়ের একটি প্রকাশ ছিল। আধুনিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষণিক লেখায় এই দিবসটিকে ‘নতুন বছরের আধ্যাত্মিক আরম্ভ’ হিসেবে দেখা হয়—ভক্তরা দিনটি তাঁদের অন্তরঙ্গ আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক সমাধানের অনুরোধের সঙ্গে যুক্ত করেন। প্রচলিত মত অনুযায়ী কালপতরু-আশীর্বাদের অর্থ হলো সেই আশীর্বাদ যা মানুষের সত্যিকারের কল্যাণ ও মঙ্গলবোধে সহায়ক।

কেন এই দিনটি আজও প্রাসঙ্গিক

জানুয়ারি কল্পতরু উৎসবটি শুধু একটি স্মৃতিদিবস নয়; এটি রামকৃষ্ণের শিক্ষা—নিরাশ্রয় প্রেম, আত্ম-অনুশীলন ও দুঃখে সহমর্মিতা—প্রচারের মাধ্যম। কাশীপুর উদ্যানবাটি, বেলুর মঠ, দক্ষিণেশ্বরসহ সারা দেশে ও পৃথিবীর বিভিন্ন রামকৃষ্ণ কেন্দ্র এই দিনে ভক্তদের আরাধনা, শিক্ষা ও সেবার মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে পুনর্ব্যক্ত করে। প্রতিটি কল্পতরু উৎসবই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও আধুনিক জনসমাজের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে।

Related Articles

Back to top button