ভগবান আমাদের অন্তরে , আবার চারিদিকে বর্তমান , কিন্তু আমরা এ সম্বন্ধে সচেতন নই
এখনই যদি আমরা ভগবানকে ভাবতে চেষ্টা করি , আমরা দেখব যে তাঁর সম্বন্ধে চিন্তা কয়েক মুহুর্ত মাত্র করতে পারছি আর সঙ্গে সঙ্গে হাজার রকমের বিক্ষেপ মনকে জর্জরিত করে ফেলছে ৷ ভগবান বাদে বিশ্বের যাবতীয় বস্তু সন্বন্ধে ভেবে চলেছি আর এতেই বোঝা যায় মন অশুদ্ধ এবং ভগবানের দর্শন পাওযার জন্য এখনও তৈরী হয়নি ৷ জন্ম জন্মান্তর ধরে যে বিভিন্ন সংস্কার গড়ে উঠেছে তাতেই মন অশুদ্ধ হয়ে আছে ৷ পতঞ্জলির যোগসুত্র মতে মনের সংস্কারের পাঁচটি মুল কারন , সেগুলি হলো ,
অবিদ্যা , অস্মিতা , রাগ-দ্বেষ , অভিনিবেশ এবং ক্লেশ |
মনে সঞ্চিত সমস্ত সংস্কারের প্রথম মুল কারন হলো অবিদ্যা বা অজ্ঞান ও সমষ্টি অজ্ঞান | ভগবৎ-উপলদ্ধির পথে বাধাস্বরূপ এটি দাঁড়িয়ে আছে ৷ আমরা এ সম্বন্ধে সচেতন নই বলে সাধারণভাবে আমাদের দিব্যস্বরূপ সন্বন্ধে অনবহিত ৷ ভগবান আমাদের অন্তরে , আবার চারিদিকে বর্তমান , কিন্তু আমরা এ সম্বন্ধে সচেতন নই ৷
দ্বিতীয়তঃ , অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন হয় অস্মিতা অর্থাৎ অহংবোধ আর এই অহংবোধই আমাদের অন্যের থেকে পৃথক ভাবায় ৷
আরও দুটি ভয়ানক শত্রু আছে , এগুলি হল রাগ এবং দ্বেষ অর্থাৎ আসক্তি এবং ঘৃনা ৷ এদের উৎপত্তি হয় অস্মিতা বা অহংবোধ থেকে ৷ এর পরেরটি হল অভিনিবেশ অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য তীব্র আকুতি এবং আমাদের দৃশ্যমান জীবন এবং চেতনাকে আকঁড়ে ধরে থাকার বাসনা ৷ আমাদের দিব্য স্বরূপ উপলব্ধি করতে চাইনা । এই পার্থিব জীবনটি নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট । আত্মার স্তরে বাস করতে চাইনা আর তাই এদের বলা হয় পঞ্চক্লেশ অর্থাৎ আমাদের দিব্যস্বরূপ উপলদ্ধির পথে বাধাস্বরূপ পাঁচটি মুল কারন ৷
অপর একটি যোগসূত্রে এটির আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ৷ সূত্রে বলা হয়েছে , অজ্ঞানবশতঃ আমরা অনিত্য , অশুচি , দুঃখ এবং অনাত্ম বস্তুতে যথাক্রমে নিত্য , সুচি , সুখ এবং আত্মবস্তু বলে ভাবি আর এই ভুল বোঝার কারন হলো অবিদ্যা বা অজ্ঞান | পতঞ্জলির রাজযোগের এই সূএটি ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে স্বামীজী দেখিয়েছেন যে , আমরা সকলেই ভাবি , ” আমি দেহ মাত্র , শুদ্ধ , জ্যোতির্ময় , সদানন্দময় আত্মা নই এবং এর কারন অজ্ঞান | আমরা মানুষকে দেহমাত্র ভাবি আর এটাই এক মহাভ্রম ৷”
আমরা সকলেই অজ্ঞানপ্রসুত এবং মিথ্যা অভিমানবশতঃ এই মহাভ্রমে পড়ে আছি ৷ আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের আসল স্বরূপে , আত্মাতে অবস্থান করতে পারলেই বিশুদ্ধ আনন্দ পাওয়া সম্ভব ৷ অজ্ঞানবশতঃ আমরা পার্থিব , ক্ষনস্থায়ী , অনিত্য বস্তুতে সুখ খুঁজি ৷ বাস্তবিকই এর চেয়ে দুঃখদায়ক আর কিছু হতে পারে না ৷
বিবেকচুড়ামনির ৩৩৭ নং শ্লোকে বলা হয়েছে ,
” দেহাদিসংসক্তিমতো ন মুক্তিমুক্তস্য দেহাদ্যভিমতাভাবঃ |
সুপ্তস্য নো জাগরনং ন জাগ্রতঃ স্বপ্নস্তয়োর্ভিন্নগুনাস্রয়ত্বাৎ ৷”
দেহাদিতে যার আসক্তি আছে তার মুক্তি হয়না , আর মুক্ত ব্যক্তির দেহাদিতে ” আমি আমার” – বোধ থাকে না ৷ যেমন , জাগরন ও নিদ্রা এই দুই অবস্থা বিভিন্ন গুনের আশ্রয়ে উপন্ন হয় বলে নিদ্রিত ব্যক্তির পক্ষে জাগরন এবং জাগ্রত ব্যক্তির পক্ষে নিদ্রা সম্ভব হয় না ৷
উপরিউক্ত শ্লোকে বলা হয়েছে দেহ প্রভৃতিতে যে আসক্ত তার মুক্তি হয় না ৷ দেহাভিমান দুর হলে তবেই মুক্তি সম্ভব । মুক্ত ব্যক্তির দেহাভিমান চলে যায় ৷ জীবন্মুক্ত তিনি যিনি এই দেহে থাকেন , কিন্তু দেহে আসক্ত নন ৷ দেখে মনে হয় তিনি দেহে বাস করছেন , কিন্তু আসলে তাঁর অবস্থিতি আত্মাতে , তাঁর দিব্যস্বরূপে ৷
‘ সুপ্তস্য ন জাগরনম্ ‘ – অর্থাৎ নিদ্রিত ব্যক্তি সেই অবস্থায় জেগে থাকেনা , আবার জাগ্রত ব্যক্তি সেই অবস্থায় নিদ্রিত থাকে না কারন এ দুটি অবস্থা পরস্পরবিরোধী ৷


