দশমহাবিদ্যার অষ্টম দেবী “মা বগলামুখী” শত্রু বিনাশের দেবী
আলোচনায়: কামাখ্যা তন্ত্র সাধক রানা শাস্ত্রী

দশমহাবিদ্যার অষ্টম বিদ্যা হলেন “দেবী মা বগলামুখী”। যিনি এক হাতে অসুরের জিভ টেনে ধরে অন্য হাতে মুদ্গর ধারণ করে আছেন। দেবীর গায়ের রং হলুদ এবং হলুদ বস্ত্র পরিধান করেন বলে দেবীর আরেক নাম পীতাম্বরা বা পীতাম্বরী।
মা বগলামুখী হলেন ব্রহ্মাস্ত্ররূপিনী, তিনিই আদিশক্তি মহামায়া দুর্গা, তিনিই কৈবল্যদায়িণী কালী, তিনিই তারণী তারা। মঙ্গল গ্রহের গুরু তথা দেবী হলেন মা বগলামুখী, তাই মঙ্গলদোষ থাকলে মা বগলামুখীর আরাধনা করলে দ্রুত দোষমুক্তি ঘটে৷
মা বগলামুখীর ভৈরব হলেন একবক্ত্র শিব। মা শবরূপী ভৈরবের উপর অধিষ্ঠিতা। দশদিকের মধ্যে মা বগলামুখী হলেন দক্ষিণ দিকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ।
মা বগলামুখীর বাহন হল প্রেত ও পিশাচ, তাই কোন ভৌতিক বা পৈশাচিক শক্তি বগলামুখীর ভক্তের কোন অনিষ্ট করতে পারেনা ।
মা বগলামুখী হলেন তড়িৎ ফলদায়িনী, ভক্তের নৈতিক মনোবাঞ্ছা অতিদ্রুত পূরণ করেন ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ভক্তবাৎসলা বগলামুখী, ভক্তের ভক্তিতেই মা সন্তুষ্ট, একবার সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে মা বলে ডাকলেই মা বগলামুখী সন্তানকে তাঁর আঁচলের শীতল ছায়ায় স্থান দেন।
১) অষ্টম মহাবিদ্যা মা বগলামুখী: কে এই মা বগলামুখী ?
দেবী বগলামুখীর স্বরূপ আলোচনার আগে দশমহাবিদ্যা নিয়ে সামান্য জানার প্রয়োজন আছে। কেন না, এই দশ মহাদেবীরই অন্যতমা হলেন বগলামুখী।
মুণ্ডমাল তন্ত্র এই প্রসঙ্গে বলছে যে —
“কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী/ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ
বিদ্যা ধূমাবতী তথা/বগলা সিদ্ধিবিদ্যা চ
মাতঙ্গী কমলাত্মিকা/এতা দশ মহাবিদ্যাঃ সিদ্ধবিদ্যা প্রকীর্ত্তিতাঃ।”
অর্থাৎ, এই দশমহাবিদ্যা হলেন যথাক্রমে কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী এবং কমলা। এই ক্রম অনুসারে দশমহাবিদ্যার মধ্যে অষ্টমতমা হলেন “বগলা বা বগলামুখী”।
“বগলামুখী” শব্দটি “বগলা” (অর্থাৎ, ধরা) এবং “মুখ” শব্দদুটি থেকে উৎপন্ন। এই শব্দটির অর্থ যিনি যাঁর মুখ কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে সমর্থ। অন্য একটি অর্থে, যিনি মুখ তুলে ধরেছেন।
দশমহাবিদ্যার অষ্টম রূপ বগলা। রুরু নামক দৈত্যের পুত্র দুর্গম দেবতাদের চেয়ে বলশালী হওয়ার জন্য ব্রহ্মার তপস্যা করে বরপ্রাপ্ত হন। দেবতারা তখন দেবী ভগবতীর আরধনা করেন। দেবী আর্বির্ভূত হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দেবীর গায়ের বর্ণ পীত। বসন পীত বর্ণ। সুধা সমুদ্রের মাঝে সিংহাসনে উপবিষ্টা। এঁর বাহন শব। দ্বিভূজ দেবী বাম হাতে দুর্গম অসুরের জিহবা ধরে ডান হাতে গদা দিয়ে শত্র দমন করেন। এই যুদ্ধে দেবীর দেহ হাতে কালী, তারা, ভৈরবী, রমা, মাতঙ্গী, বগলা,কামাক্ষী, জম্ভিনী, মোহিনী, ছিন্নমুণ্ডা, গুহ্যকালী প্রভৃতি মহাশক্তি বের হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
২) মা বগলামুখীর প্রিয় কিছু জিনিস:
মা বগলামুখীর প্রিয় ফুল হলুদ কল্কে ফুল, প্রিয় মিস্টি হলুদ মিস্টি – বিশেষত বেসনের তৈরী মিস্টি, হলুদ কাপড় ও চেলিতে মা সন্তুষ্ট, সরষের তেলের প্রদীপ মাকে খুশি করে। ভক্ত মায়ের পূজায় হলুদ বস্ত্র পরিধান করেন ।
৩) মা বগলার উপাসনা ও বিশেষ সতর্কতা:
বগলা মহাবিদ্যা ঊর্দ্ধান্নায় অনুসারেই উপাস্য। এই আম্লায়ে শক্তি কেবল পূজ্য বলে মনে করা হয়, ভোগ্য নয়। শ্রীকুলের সমস্ত মহাবিদ্যার উপাসনা সফলতা অর্জন না করা পর্যন্ত সতর্কভাবে গুরুর সান্নিধ্যে থেকে করে যাওয়া উচিত। ব্রহ্মচর্য পালন এবং অন্তর ও বাহিরের শুচিতা অতীব আবশ্যক। ব্রহ্মাই সর্বপ্রথম বগলা মহাবিদ্যার উপাসনা করেন। ব্রহ্মা এই বিদ্যার উপদেশ দেন সনকাদি মুনিদের, সনৎকুমার দেবর্ষি নারদকে এবং নারদ সাংখ্যায়ন নামক পরমহংসকে এই জ্ঞানের উপদেশ দেন, সংখ্যায়ন ছত্রিশ খণ্ডে উপনিবদ্ধ বগলাতন্ত্র রচনা করেন। বগলামুখীর দ্বিতীয় উপাসক ভগবান বিষ্ণু এবং তৃতীয় উপাসক পরশুরাম এবং পরশুরাম এই বিদ্যা আচার্য দ্রোণকে উপদেশ করেন।
মা বগলামুখী হলেন অষ্টম মহাবিদ্যা । মা বগলামুখীর আরাধনা সম্পূর্ণ তন্ত্র মতে হয়, তাই এটি গুপ্ত, গূহ্য ও গুরুমুখী । তাও যেটুকু প্রকাশ্যে জানানো যায়, জানাচ্ছি।
সঠিক গুরু ছাড়া এই বিদ্যা পুজো বা মন্ত্র ক্রম কেউ নিজে নিজে চেষ্টা করবেন না। না জেনে কিছু করে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না |
তবে, বগলামুখী তন্ত্রের বিখ্যাত শক্তি মূর্তি-এঁর নামের অর্থ “ব-কারে বারুণী দেবী, গ-কারে সিদ্ধিদায়িনী, ল-কারে পৃথিবী”। ইনি পৃথিবীতে অসাধ্য-সাধনের অধিকারী। বগলামুখীর মন্ত্র জপ ও পুরশ্চরণে অসম্ভবও সম্ভব হয়। ঠিক ঠিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন হলে মায়ের ভক্ত সর্বদিকে বিজয় লাভ করেন। পবনের গতি স্তব্ধ হয়, অগ্নি শীতল হয়, গর্বিতের গর্ব যায়, ক্ষিতিপতিও শংকিত হয়। মা বগলা সন্তানকে সকলরকম জাগতিক শত্রুতা থেকে রক্ষা করেন এবং একইসঙ্গে সন্তানের ভিতরের পরম শত্রু ষড় থেকেও রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে মায়ের এই রূপের শরণ নিলে ব্যাধি ও গ্রহের প্রকোপ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ঠিকমতো মায়ের শরণ নিলে মা সন্তানকে তার প্রারব্ধ অনুসারে সব দুর্যোগ কাটিয়ে সুখ শান্তি ও সৌভাগ্য দেন।
৪) দেবীর রূপ বর্ণনা:
দেবীর রুপের বর্ণনায় একটি ধ্যানমন্ত্র নিচে দেওয়া হল:
” মধ্যে সুধাব্ধিমণিমণ্ডপরত্নবেদী সিংহাসনোপরিগতাং পরিপীতবর্ণাম্।
পীতাম্বরং কণকমাল্যবিভূষিতাঙ্গীং দেবীং স্মরামি ধৃতমুদ্গর বৈরিজিহ্বাম্।।
জিহ্ববাগ্রমাদায় করেণ দেবীং,বামেন শত্রুন্ পরিপীড়য়ন্তীম্।
গদাভিঘাতেন চ দক্ষিণে ন পীতাম্বরাঢ্যাং দ্বিভুজাং নমামি।”
— অর্থাৎ ; অমৃতসাগরের মধ্যে মণিমণ্ডপ সেখানে। রত্নবেদীর সিংহাসনে দেবী উপবিষ্টা, দেবীর গায়ের রং হলুদ। বস্ত্র, অলংকার ও মাল্য- সবই হলুদ। তিনি বাম হাতে অসুরের জিব টেনে ধরে আছেন, ডান হাতে সেই অসুরকে মারছেন। পীতবস্ত্রা, দ্বিভূজা এই দেবীকে প্রণাম।
কোন কোন বর্ণনায় বগলামুখী দেবী চতুর্ভুজা। ডান হাতে তিনি পাশ ও মুদ্গর ধরে আছেন; বাম হাতে ধরে আছেন অসুরের জিহ্বা ও বস্ত্র।
“চতুর্ভুজাং ত্রিনয়নাং কমলাসনসংস্থিতাম্।/ দক্ষিণে পাশং বামে জিহ্বাঞ্চ বস্ত্রকম্।।”

৫) মায়ের কোন মূর্তি পূজার প্রচলন বেশি:
বগলামুখীর দ্বিভূজা মূর্তি পূজার প্রচলনই বেশি। এই মূর্তিটিকে “সৌম্য মূর্তি” বলে মনে করা হয়। এই মূর্তিতে তাঁর ডান হাতে থাকে গদা। এই গদা দিয়ে তিনি শত্রুকে প্রহার করেন। অন্যদিকে বাঁ হাতে শত্রুর জিভটি টেনে ধরে থাকেন। এই মূর্তিটিকে অনেক সময় “সম্ভন” (শত্রুকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে তাকে শক্তিহীন করা) প্রদর্শন হিসেবে মনে করা হয়। এই বর লাভের জন্য ভক্তেরা তাঁর পূজা করে থাকেন। অন্যান্য মহাবিদ্যাদেরও এই শক্তি আছে বলে মনে করা হয়।
৬) “পীতাম্বরা দেবী” বা “ব্রহ্মাস্ত্র-রূপিণী” দেবী মনে করার কারণ:
বগলামুখীকে “পীতাম্বরা দেবী” বা “ব্রহ্মাস্ত্র-রূপিণী”ও বলা হয়। তিনি একটি গুণকে বিপরীত গুণে পরিবর্তন করতে পারেন বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। যেমন, তিনি বাক্যকে নিঃস্তব্ধতায়, জ্ঞানকে অজ্ঞানে, শক্তিকে শক্তিহীনতায়, পরাজয়কে জয়ে পরিবর্তন করেন।
৭) পুজোর বিধান:
বগলামুখীর সাধনা প্রায়শই শত্রুভিয়মুক্তি ও বাকসিদ্ধি লাভের জন্য করা হয়। এর পূজায় হরিদ্রােমালা, পীতপুস্প এবং পীতবস্ত্রের বিধান আছে। দশমহাবিদ্যা ব্যাষ্টিরূপে শত্রুনাশের ইচ্ছাযুক্তা এবং সমষ্টিরূপে পরমাত্মার সংহারশক্তিই হলেন বগলা। পীতাম্বরাবিদ্যা নামে বিখ্যাত বগলামুখীর সাধনা প্রায়শই শত্রুভয় মুক্তি ও বাকসিদ্ধি লাভের জন্য করা হয়। এর পূজায় হরিদ্রামালা, পীতপুষ্প এবং পীতবস্ত্রের বিধান আছে। মহাবিদ্যাগণের মধ্যে এঁর স্থান অষ্টম। এঁর ধ্যানে বলা হয় যে সুধা সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত মনিময় মণ্ডপে রত্নময় সিংহাসনে তিনি বিরাজ করেন। তিনি পীতবর্ণ বস্ত্র, পীত আভূষন এবং হলুদ ফুলের মালা পরিধান করেন। দেবীর এক হাতে শত্রুর জিহ্বা এবং অন্য হাতে মুগুর রয়েছে।
৮) স্বতন্ত্র তন্ত্র মতে ভগবতী বর্গলামুখীর আবির্ভাবের কাহিনী:
সত্যযুগে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস করার জন্য এক ভীষন ঝড় ওঠে। প্রাণীসমূহের জীবনে আগত সংকট দেখে ভগবান মহাবিষ্ণু চিন্তান্বিত হলেন। তিনি সৌরাষ্ট্র দেশে হরিদ্রা সরোবরে গিয়ে ভগবতীকে প্রসন্ন করার জন্য তপস্যা করতে লাগলেন। শ্রীবিদ্যা ওই সরোবরে বগলামুখীরূপে আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে দর্শন দেন এবং বিশ্ব ধ্বংসকারী ঝড়কে তৎক্ষণাৎ রোধ করে দিলেন। বগলামুখী মহাবিদ্যা ভগবান বিষ্ণুর তেজের সঙ্গে মিলিত হওয়াতে তিনি “বৈষ্ণবী”।
মঙ্গলবার চতুর্দশীর মধ্যরাত্রে তিনি আবির্ভূতা হন। এই দেবীর পূজার উদ্দেশ্য হল, দৈবী প্রকোপ শান্তি, ধনধান্য লাভের জন্য নির্দিষ্ট কর্ম এবং আভিচারিক কর্ম ইত্যাদি। এই সব আপাত প্রভেদ শুধুমাত্র উদ্দেশ্যের ভিন্নতার জন্য নতুবা এঁর পূজা-উপাসনা ভোগ এবং মোক্ষ লাভ উভয়ের জন্যই করা হয়।
সত্যযুগে একবার সমগ্র ব্রহ্মান্ড জুড়ে ভয়ঙ্কর মহাজাগতিক ঝড় তৈরী হয়, (সম্ভবত gravitational waves), তার ফলে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সন্তুলন বা balance বিঘ্নিত হচ্ছিল, তার ফলে এই মর্তলোক বা পৃথিবী ও সৌরজগতের অস্তিত্বও সংকটে পরতে চলছিল, এই সংকট থেকে বাঁচার কোন উপায় পালনকর্তা বিষ্ণুর জানা ছিলোনা, তখন দেবাদিদেব মহাদেবের নির্দেশে ভগবান বিষ্ণু ঘোর তপস্যা করলেন আদিশক্তি মহামায়ার, মা তখন আবির্ভূতা হলেন পীতাম্বরী বগলামুখী রূপে । মায়ের প্রধান কাজ হল খারাপ জিনিসকে স্তম্ভন করা (statue)। মা তাঁর শক্তি দিয়ে সেই ব্রহ্মাণ্ডীয় ঝড় কে থামিয়ে দিলেন, রক্ষা পেল ব্রহ্মাণ্ড, রক্ষা পেল পৃথিবী । তিনি বিষ্ণুকে বর দিলেন, যখনই কেউ মা বগলামুখীর শরণাপন্ন হবেন, মা তড়িৎগতিতে সেই ভক্তকে রক্ষা করবেন, ভক্তের বিরুদ্ধ সকল শক্তি যা ক্ষতিকর, তাকে মা স্তম্ভন করবেন ৷ সৃষ্টির সৃজনশীলতা যাতে বজায় থাকে, তাই পিতামহ ব্রহ্মাকে মা বগলামুখী ব্রহ্মাস্ত্র বিদ্যা প্রদান করেন ৷
আরেকবার এক অসুরের অত্যাচারে সমগ্র বিশ্বে উথাল-পাতাল হতে থাকে, ব্রহ্মার বরে সেই অসুরকে কেউ বধ করতে পারতো না। তখন দেবগণ মা বগলামুখীর শরণাপন্ন হলে মা বগলামুখী সেই অসুরকে স্তম্ভন করেন, তার জিভ টেনে তার বুদ্ধি ও বাকশক্তির বিনাশ করেন।
যজুর্বেদের কাঠকসংহিতানুসারে, দশদিক প্রকাশিনী, সুন্দর স্বরূপধারিনী ‘বিষ্ণুপত্নী’কে ত্রিলোকের ঈশ্বরীরূপে মানা হয়। স্তম্ভনকারিনী শক্তি ব্যক্ত ও অব্যক্ত সমস্ত পদার্থের স্থিতির আধার পৃথিবীরূপে শক্তি।
মা বগলা সেই স্তম্ভনশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। শক্তিরূপিনী বগলার স্তম্ভন শক্তিতে দ্যুলোক বৃষ্টি বর্ষন করে। তাঁর দ্বারাই আদিত্যমণ্ডলের অবস্থান এবং তাঁহাতেই স্বর্গলোকও স্তম্ভিত রয়েছে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণও গীতায় ‘বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ’ বলে সেই শক্তির সমর্থন করেছেন। তন্ত্রে সেই স্তম্ভন শক্তিকে “বগলামুখী” নামে বলা হয়েছে।
৯) শ্রী বগলামুখীকে ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ও বলা হয়:
ঐহিক বা পারলৌকিক, দেশ অথবা সমাজে দুঃখদায়ী অরিষ্টাদিকে দমন এবং শত্রুনাশে বগলামুখীর মতো আর কোনও মন্ত্র নেই। সাধকেরা চিরকাল এই মহাদেবীর আশ্রয় নিয়ে আসছেন।
এর পাঁচটি মন্ত্রপ্রভেদ– ১) বড়বামুখী, ২) জাতবেদমুখী, ৩) উল্কামুখী, ৪) জ্বালামুখী ও ৫)বৃহদ্ভানুমুখী।
কুণ্ডিকাতন্ত্রে বগলামুখী জপের বিধানের ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। সুতরাং, “মা বগলামুখী” হলেন শত্রুবিনাশিনী, বিপরীত বুদ্ধির নাশিনী, শত্রুর বুদ্ধি ও বাকশক্তি সম্পূর্ণ বিনাশ করেন তিনি। মা বগলামুখী “হয় কে নয়, নয় কে হয়” -তে পরিবর্তন করতে পারেন। “জয় কে পরাজয়ে, পরাজয় কে জয়ে” রূপান্তরিত করতে পারেন। “দিন কে রাত, রাত কে দিনে” পাল্টে দিতে পারেন৷ তিনি ঘটন -অঘটন পটিয়সী । মা বগলামুখীর ভক্তরা বাকসিদ্ধ হয়। তাই বগলামুখীর সাধনা করলে বাকসংযম করা কর্তব্য।
তবে মনে রাখতে হবে, কোন সাধক যদি মায়ের শক্তির অপপ্রয়োগ করেন বারংবার, তবে মা তার উপর রুষ্ট হবেন।
কথিত আছে, দক্ষ যজ্ঞে যখন মা সতী যেতে চাইছিলেন, কিন্তু ভগবান শিব তাঁকে বাঁধা দিয়েছিলেন, তখন সতী রেগে গিয়ে তাঁর দশমহাবিদ্যার রূপ দেখিয়েছিলেন শিব কে। উগ্র সেই রূপগুলি দেখে ভগবান শিব যখন ভয়ে পালাচ্ছিলেন দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে, তখন অষ্টম মহাবিদ্যা মা বগলামুখী-ই শিব কে স্তম্ভন করে কৈলাশে ফিরিয়ে আনেন। যিনি স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব কে স্তম্ভন করতে পারেন, তিনি কতোটা শক্তিশালী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মা কালী থাকেন শ্মশানে, মা তারা চড়ে বেড়ান শ্মশানে, আর মা বগলামুখী থাকেন যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে অস্ত্রের প্রয়োগ চলে, সেখানে যেমন মা বগলামুখী ভক্তের শত্রুকে দ্রুত স্তম্ভন করে ধ্বংস করেন, তেমনই সংসার সাগরের বিভিন্ন যুদ্ধে, বাগবিতন্ডায়, তর্কসভায়, আইন আদালতে, রাজনীতির ময়দানে, খেলার মাঠে, সর্বত্র মা বগলামুখী তার ভক্তকে বিজয় প্রদান করেন ।
মা বগলামুখী চতুর্ভজা, দেবী বজ্র, পাশ, গদা বা মুগুর এবং অসুররূপী শত্রুর জিভ ধারণ করে থাকেন।
তবে গৃহস্থ ভক্ত সাধারণত দ্বিভুজা বগলামুখীর সাধনা করেন, সেক্ষেত্রে মা দুই হাতে গদা বা মগুর এবং অসুররূপী শত্রুর জিভ ধারণ করেন ।
১০) দেশের কোন প্রান্তে মা আছেন:
ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের দাতিয়া অঞ্চলের পীতাম্বরা পীঠমে হরিদ্রা সরোবরের অনুরূপ একটি হ্রদ রয়েছে।
তন্ত্রসার শাস্ত্রে এই দেবীর মাহাত্ম্য-তে বলা হয় –
“ব্রহ্মাস্ত্রং সংপ্রবক্ষ্যামি সদ্যঃ প্রত্যয়কারম।
সাধকানাং হিতার্থায় স্তম্ভনায় চ বৈরিনাম্॥
যস্যাঃ স্মরণমাত্রেণ পবনোহপি স্থিরায়তে।”
অর্থাৎ এই বগলামুখীর মন্ত্র ব্রহ্মাস্ত্র স্বরূপ। সাধকদের কাছে তা পরম সিদ্ধি , হিতকর। শত্রুকে স্তম্ভন কারী ব্রহ্মাস্ত্র রূপেও ব্যবহৃত হয়। এই বগলা মন্ত্রের প্রভাব এত যে বায়ু কেও রুদ্ধ করা যায়।
ভারতের অসম রাজ্যের গুয়াহাটিতে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির তন্ত্রবিদ্যার কেন্দ্রস্থল। এখানে দশমহাবিদ্যার মন্দির আছে। এই মন্দিরের কয়েক মাইল দূরেই বগলামুখী মন্দিরের অবস্থান। উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের বাণখণ্ডীতে, মধ্যভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের আগর মালব জেলার নলখেদা ও দাতিয়ার পীতাম্বরা পীঠে এবং দক্ষিণ ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলার পাপানকুলা
ম জেলার কল্লাইদাইকুরিচিতে বগলামুখীর মন্দির রয়েছে।


