MY CATAGORY

খড়ারের পুরানো কথা: কাঁসা-পিতল শিল্পের শহর

 

 

শান্তনু পান, পশ্চিম মেদিনীপুর:- বিদ্যাসাগরের জন্মভূমির কথা উঠলেই ঘাটালের নাম উঠে আসা ও ফি বছর বন্যার সুবাদে ‘ঘাটাল’- নামের জনপদটি মোটামুটি কমবেশি বাংলার মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম। ঘাটাল বলতে আমরা যদি শুধু এই পৌর শহর টুকুর কথা ভেবে বসি, ভুল হবে তাতে।

 

ঘাটাল একটি মহকুমা কয়েকশ গ্রাম ও পাঁচটি পৌরশহর নিয়েই ঘাটাল। এই পৌরশহর গুলির মধ্যে সবথেকে প্রাচীনতম ও অন্যতম ক্ষুদ্র (ওয়ার্ড সংখ্যার বিচারে ) হল খড়ার। খড় (খট + ক )[আগাছা ]+বাট [রাস্তা]।

 

সুকুমার সেনের বাংলার স্থাননাম থেকে এই ধারনা লাভ করা যায় একসময়ের প্রচুর আগাছাময় রাস্তা থেকেই এই স্থানের নামকরন। ইতিহাসের পাতা উল্টাতে আজ আমরাদের আলোচনার মূলবিষয় হল খড়ারের কিছু পুরানো কথা ও এখানে এক হারাতে বসা শিল্প।

 

ঘাটাল থানার অন্তর্গত ছোট্ট কিন্তু একটি প্রাচীন শহর খড়ার। জেলার একেবারে উত্তর-পূর্ব এলাকার খড়ার ছিল কাঁসাশিল্পের অগ্রণী কেন্দ্র। এখানের পুরসভাটি ১৮৮৮ খ্রীষটান্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। পশ্চিমে উদয়গঞ্জ ও দক্ষিণপূর্বে দলপতিপুর পর্যন্ত মাত্র ১০ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ক্ষুদ্র এই খড়ার পুরসভার এলাকা। ১৯৭১ সালের সেন্সাস অনুসারে এখানের জনসংখ্যা ৭,২৬২। ১৯৬১-তে ছিল ৫,৯০৯। ১৭৭৩ এর সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও চূয়াড় হাঙ্গামার আগে বেশ কিছুস্থানেই বর্গীদের হাঙ্গামা খুবই ভয়াবহরূপে দেখা দিয়েছিল।

 

বর্গীরা দলে দলে এসে আবালবৃদ্ধবনিতার উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে ধনসম্পদ লুঠ করতে থাকে। চন্দ্রকোণা, ক্ষীরপাই, রাধানগর, খড়ার প্রভৃতি স্থানে বর্গীর অত্যাচার বেশি হয়েছিল কারণ ধরেই নেওয়া যায় এই স্থানগুলোতে শিল্প-ব্যবসার প্রসার আগে থেকেই ছিল।

 

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দ হইতে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে অত্যাচারে বহু গ্রাম দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হর। গঙ্গারামরচিত “মহারাষ্ট্র পুরাণে” বর্গীদের এই অত্যাচারের কাহিনী বর্ধিত হইয়াছে। এই কাব্যের কয়েকটি পংক্তি-
“কারু হাত কাটে কারু কাটে নাক কান।

 

একি চোটে কাঁরু বধএ পরাণ!
তবে কোন ২ গ্রাম বরগী দিল পোড়াইয়। সে সব গ্রামের নাম শুন মন দিয়া। চন্দ্রকোণা, মেদিনীপুর আর দিখগপুর,
খিরপাই, খড়ার আর বদ্দমান সহর”।

 

এক এক করে লুঠ-পাট করে গ্রামগুলিকে পুড়িয়ে হুগলীর দিকে চলে যায় বর্গীরা। সেইসময় হুগলি জেলা থেকে অনেক পরিবার চলে আসেন খড়ারে। আগে অল্প সল্প কাঁসা-পিতল শিল্পী থাকলেও হুগলির কয়েকটি পরিবার এসে এখানে ব্যবসাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিলেন। ধাতব শিল্প বাংলার একটি সুপ্রাচীন কুটির শিল্প।

 

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় তারা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয় ধাতব ও শিল্পের বৃহৎ আয়তন কেন্দ্রের পুরানো আসলী হদিসও কোন জায়গায় মিলেছে। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ বাংলার পশ্চিমাঞ্চল, আর তার ফলেই আশেপাশে গড়ে উঠেছিল ধাতু শিল্পের অসংখ্য ক্ষেত্র। বিশেষ করে কাঁসা-পিতল শিল্প বাঙালি কারিগরেরা একসময় যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন।

 

বাংলার সীমা পেরিয়ে বাঙালির শিল্পীর শিল্পীসুলভ খ্যাতি ভারত ছাড়িয়ে পৌঁছেছিল বিদেশে। খ্রিস্ট জন্মের হাজার হাজার বছর পূর্বে কার যে সমস্ত তামা ও ব্রোঞ্জের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে তাতে এদেশের ধাতব ও শিল্পের প্রাচীনত্ব প্রমাণ মেলে।

 

বীরভূম জেলার বোলপুর এর নিকটবর্তী মহিষাদল গ্রামে প্রাপ্ত তিন হাজার বছরের কুঠার, পুরুলিয়া জেলার কুলাগড়া থেকে পাওয়া কুঠার, ও ঝাড়গ্রাম মহকুমা কুড়িগ্রামে প্রাপ্ত তাম্রকূট বাঙালিদের প্রাচীন ধাতবশিল্পের নিদর্শনই বহন করে। দেশীয় কাঁচামাল ছাড়াও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ধাতুর সাহায্যে মধ্যযুগ থেকে বাংলার ধাতব শিল্পের বিকাশ ঘটে।

 

মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর, নদীয়া জেলার রানাঘাট, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর, পুরুলিয়া জেলার ঝালদা স্থান গুলির মতোই ঘাটালের খাড়ারকে চিহ্নিত করা হয়েছে ধাতুশিল্পের পীঠস্থান হিসাবে। তামা-দস্তা মিশিয়ে পিতল ও তামার সাথে তিন মিশিয়ে তৈরি করা কাঁসা। অধিকাংশ কাজই হতো ঝালাই ও পেটান পদ্ধতিতে।
কাঁসা-পিতলের ব্যবসা করতেই খড়ারে এসেছিল মণ্ডল পরিবার।

 

মণ্ডলপরিবারের জনৈক ছিলেন কোম্পানি ঘনিষ্ট। খড়ারের পিতল-কাঁসা শিল্পের খ্যাতি এককালে জাপান ইন্দোচীন এলাকাতেও পৌঁছেছিল মণ্ডল পরিবারই সৌজন্যে।

 

অধুনালুপ্ত ‘মেদিনীবানি’- পত্রিকায় বাংলার ১৩৪৬ সালে একটি সংখ্যা স্বর্গত মৃগাঙ্কনাথ রায় মহাশয় খড়ারের কাঁসা শিল্পের অনেক পুরানো তথ্য বিবৃত করেছিলেন। ব্রজ মাজী, ঈষান কবিরাজ, রামলাল চক্রবর্তী, রামনাথ ঘোষ, হৃদয় কামিল্যা, শ্রীহরি বন্দ্যোপাধ্যায়, নবকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কাঁসা ব্যবসায়ীরা প্রতি দিন ১০০ মণ রপ্তানি করতেন। খুব পুরানো আমলের শিল্পীদের নাম মেলেনি, তবে শিল্পীরা মূলত কর্মকার সম্প্রদায়ভুক্ত হলেও বর্তমানে অপরাপর মানুষের এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

 

কামিং সাহেবের রিপোর্টে জানা যায় যে, সারা বাংলার মধ্যে যে সকল স্থানে কাঁসা-পিতলের বাসন প্রস্তুত হয় তাঁর মধ্যে মেদিনীপুর জেলায়(বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর) এই ব্যাবসায়টি বেশ শৃঙ্খলা ও সুপ্রণালীর সঙ্গে পরিচালিত হয়। শুধু খড়ার নয় সাথে সাথেই চন্দ্রকোনা ও রামজীবনপুরও বেশ ভালো খ্যাতি ছিল। অন্যান্য স্থানের ব্যবসায়ীদের থেকে এখানে ব্যবসায়ীরা ছিলেন বিশেষ সঙ্গতিপন্ন।তারা স্টেট সেটেলমেন্ট, জাপান প্রভৃতি স্থান হইতে তিন টিন, তামা ইত্যাদি ধাতু সম্ভবমত সুলভ দরে প্রচুর পরিমাণে কিনে এনে এই ব্যবসায়ে বিশেষ লাভবান হতেন।

 

এক একজন ব্যবসায়ীর কারখানায় শতাধিক লোক কাজ করত। ১৯৭০ সালেও খড়ারের ৭০০০ লোক সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি লোক এই ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করেন। কামিংসাহেব আরও লেখেন, খড়ার কাঁসার থালা ও ঘাঁটাল গাড়ুর জন্য বিখ্যাত। গাড়ু মূলত মুসলমানরা ব্যবহার করতেন।

 

দাসপুরের খাঞ্জাপুর ও আজুড়িয়াযা ছিল গাড়ু তৈরির মূল কেন্দ্র। খড়ারের সেই সময়ের কয়েকজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ীর নাম, তাহাদের কারখানার স্থান ও দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণের বিবরণ দেওয়া হইল :

১. ব্রজ মাজী: খড়ার রাণীর বাজার ১৫-১৬ মণ
২. ঈষান কবিরাজ: খড়ার ১২-১৪ মণ
৩. রামলাল চক্রবর্তী: খড়ার, দলপতিপুর, সুলতানপুর ১২-১৪ মণ
৪. রমানাথ ঘোষ: খড়ার ৮–১০ মণ
৫. হৃদয় কমিলা: খড়ার ৮-১০ মণ
৬. শ্রী হরি বন্দ্যোপাধ্যায়: খড়ার ৮-১০ মণ,
৭. নবকৃষ্ণ মুখোপাধায়: খড়ার ৮-১০ মণ
৮. প্রিয়নাথ ভান্ডারী: খড়ার ৪-৫ মণ
৯. কালী বর্ধন: উদয়গঞ্জ ৪-৫ মণ
১০. সূর্য্য হাতি: খড়ার ২-৩ মণ
১১. পাঁচকড়ি পান: খড়ার ২-৩ মণ

 

বর্তমানে অনেকেরই এখন ব্যাবসা নাই। কলকাতার কাঁসারি পট্টির অমৃতলাল কুন্ডু, সহস্ররাম কুন্ডু, তারকনাথ প্রামাণিক, হীরালাল দাস প্রভৃতি মহাজনগণ রাঁং ও তামা সরবরাহ করতেন ও মণ প্রতি ১৫ টাকা হইতে ৩০ টাকা হারে বাণী দিয়ে কলকাতার ব্যবসায়ীরাই মাল কিনতেন।
মাল প্রস্তুতকারক মজুরদের উপাধি, কাজ, দৈনিক মজুরী এবং জনপ্রতি দাদনের সেকালের এক পরিসংখ্যান দেওয়া হল।

 

উপাধি-কাজ-রোজ, মজুরি জনপ্রতি দাদন
১.আউটদার: গালাই ১০–১২ আনা/২০০-২৫০
২. গড়নদার: গঠন ৩৫ সের মাল গড়িলে ২৷৷
০/১০০০-১৫০০
৩. পিটাইদার: পিটানো ৭টি পর্যন্ত থালা ২০আনা/৫০০ – ৬০০ (মাঝের, পাশের, ভেত্যার)
৪. মাঠিয়ে: আকার ঠিক করা ১৷০ / ১৫০ – ২০০
৫. চাঁচিয়ে: চাঁচিয়া কুদেঁ সের করা চার পয়সা হইতে /৩০০-৪০০( চড়ানোর যোগ্য করা ছয় পয়সা)
৬. কুদিয়ে: কুঁদে বাসন সাফ সাড়ে বারো! সেরে দশ আনা/৫০-৬০
৭. মাঝিয়ে: বাসন পালিশ একজন সাড়ে বারো সেরে /দাদন নাই(করা ছয় আনা)
৮. ঝালিয়ে: ঝাল দেওয়া শতকরা! ৬৷০ /দাদন নাই
৯.ব্যাপারী: গোরুর গাড়িতে মণপ্রতি চার আনা /দাদন নাই
১০. বোঝাইদার ঘাটালে পৌঁছান।

 

বাসনগড়নের জন্য যন্ত্রগুলির নাম: (১) লেই বা লেহাই (২) সাঁড়াশি (৩) কাঁসারি গুত্ত্ (৪) হাতুড়ি (৫) পাড়ন (৬) যাঁতা (৭) খেড়ে বা খোড়া (৮) আছু। বর্তমানে মেশিনেই বেশি কাজ হয়। সেকালে খড়ারে পিতলের বড় জালা হত । তুঁষমাটি দিয়ে তৈরী ‘মুছি ‘ নামক পাত্রে সীসা, তামা ও টিন রেখে তা হাপরে গলিয়ে নেবার পর একে ছাঁচে ফেলে ঠান্ডা করে কারখানায় পাঠানো হয়।

 

গড়নদার হাতুড়ির সাহায্যে প্রতিটি থালা (ছাঁচ থেকে যা আনা হয়েছে )পেটাই করে পাতলা করে ‘লেই’ -এর সুপার রেখে ‘গড়ন ‘ হয়ে যাবার পর বাসনগুলিকে ‘কুঁদে ‘ চড়িয়ে চূল দিয়ে মেজে পরিষ্কার করলে বেশ উজ্জ্বল দেখায়।এরপর ‘ফিনিসিং’ করা হয়। রপ্তানী মালের উপর মণ করা চার আনা বৃত্তি নির্ধারিত ছিল। এই অর্থ সঞ্চিত করেই প্রায় ত্রিশ হাত উচ্চ কালীমূর্তি, অন্যান্য পৌরাণিক দেবতা এবং সামাজিক ঘটনার পুত্তলিকা তৈরি হত, অনুষ্ঠিত হত সামাজিক অনুষ্ঠান। আর তারই পরিচায়ক বর্তমানে খড়ারের নানা প্রান্তে থেকে পুরাকীর্তি ও মন্দিরগুলো।

 

অষ্টদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সেসময় পাটী পদবীর একটি সদগোপ পরিবার কাঁসা শিল্প থেকেই প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠেছিল এই শিল্প থেকে। সেই পরিবারের জনৈক রামদুলাল পাটী ছিলেন শিক্ষিত এবং সুদেহী। পারিবারিক ব্যবসায় না গিয়ে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন রামদুলাল। অন্যত্র উঠে গেলেও খড়ারে থাকতে তিনতলা অট্টালিকার সাথে শিব, শীতলা আর বিষ্ণুর মন্দির ছিল পাটী পরিবারের। খড়ার শহরে এখনও সেগুলি দেখা যায়। বিমলেন্দু পাটী, উমাপদ পাটী, দেবাশীষ পাটী, প্রশান্ত পাটী( আঙ্গুয়া), সুশান্ত পাটী(মুম্বাই) এই পরিবারেরই সদস্য।

 

অন্নপ্রাশনের উপহার দেওয়া থালা-বাটি ও গ্লাসের গায়ে লেখা থাকত খুকুমণি বা খোকাবাবু। নামের চারদিকে লতাপাতার সুদৃশ্য বন্ধন। সচ্ছ্বল পরিবারে মেয়ের বিয়েতে ‘ষোলো দান’। প্রথম সংসার পাতার শুরুতে ঘরণীর জন্য সুন্দর উপহার। বাসন-কোসন থালা-বাটি ছাড়াও গৃহদেবতার পুজোর জন্যে পিলসুজ থেকে জল-ঘটি কত কী।

 

শুধু হিন্দু (বিশেষ করে বাঙালি) পরিবারেই নয়, পিতলের এমন সব জিনিসের ব্যবহার ছিল মুসলমান পরিবারেও। আধুনিক নানা বিকল্পের সম্ভারে এ সব এখন অনেকটাই স্মৃতি। তবু যেটুকু রয়েছে, তার পথ ধরেই কাঁসা-পিতলের নির্মিত কয়েকটি জিনিসে হাত ধরেই। আর এই গুটিকয় কারিগরের মধ্যেই রয়েছেন নয় পুরুষ ধরে কাজ করে চলা কাঁসা-পিতলের শিল্পী লালমোহন মণ্ডল। অবিভক্ত বাংলায় এই কাঁসা-পিতলের শিল্পে মণ্ডল পরিবারের খ্যাতি ছড়িয়েছিল। বর্গীদের তাড়া খেয়ে অনেকের মতোই হুগলি থেকে চলে এসে খড়ারে পা রাখা এই মণ্ডল পরিবারের। সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, শুরু করেন কালীপুজোও।

 

মা কালীর চাই বলির পাঠা, সেই সময় থেকেই শুরু হয় পাঠা বলির রেওয়াজ। আজ পাঁঠা বলি নিয়ে মণ্ডল পরিবারের মধ্যে শুরু প্রতিযোগিতা। কার পাঁঠা কত বড় হবে, তা নিয়ে পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। ৪০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত পাঁঠা কিনে আনা হয় বলির জন্য। প্রায় চল্লিশটির ও বেশি পাঁঠা কাটা হয় এই পুজোতে। পুরস্কার না থাকলেও প্রতিবছর কার পাঁঠা সবথেকে বড় হয়েছে তারই দিকে নজরে রাখেন খড়ারের মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা।

 

এক সময় খাগড়া (মুর্শিদাবাদ) খড়ার (মেদিনীপুর), হুগলির বালি-দেওয়ানগঞ্জ ও নবদ্বীপের বেশ নাম ছিল। তবে প্রত্যেক স্থানের বিশেষ বিশেষ পাত্র ছিল বিখ্যাত। এক সময় খড়ারের সঙ্গে খাগড়া (মুর্শিদাবাদ), হুগলির বালি-দেওয়ানগঞ্জ ও নবদ্বীপের বেশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। তবে প্রত্যেক স্থানের বিশেষ বিশেষ পাত্র ছিল বিখ্যাত।

 

খড়ারে বেশিরভাগ উৎপাদনের মধ্যে থালাই ছিল প্রধান। থালার আবার বিভিন্ননাম- কসুরে, মিহি, যশোরে মাজা, দোকসুরে মিহি, গোলা থালা, বর্গী, মিহিবর্গী, কতকি, বেলি, কাঞ্চন, বালেশ্বরী, গয়েস্বরই, সানকি।

 

সাধারণ থালার আয়তন দেড় হাত ব্যাস পর্যন্ত হত। সংসারের ব্যবহার্য এবং পুজোর সামগ্রীতে সেই আমলে কাঁসা-পিতল ছিল অপরিহার্য। খড়ারের মানুষ প্রাচীন কাল থেকেই পড়াশুনা ও সংস্কৃতির দিকে কম মনোযোগী। তবে শিল্পজ্ঞান এবং ধাতুবিদ্যা দুই-ই প্রখর ও সচল। পুথির বিদ্যা মোটামুটি ক্লাস এইট পর্যন্ত হলেই তার পরে পুরোপুরি পারিবারিক ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়াই ছিল সেই সময়ের মানুষের মূল চিন্তাভাবনা।

 

সাংসারিক প্রয়োজনের পাশাপাশি শিল্প হিসাবেও তৈরি হতে থাকল নানা আকারের রকমারি জিনিসপত্র। সঙ্গে সব সময় চিন্তা, নতুন কী তৈরি করে সকলকে তাক লাগানো যায়। এই ভাবনার জন্যই খড়ারের শিল্পীদের বিশেষ কদর ছিল। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সাগর মেলায় বেশি বিক্রি হত বর্ডার উঁচু বড় থালা, ‘সাগরী’। পিতলের ‘পেটা ঘট’। বড় থালা ‘বগি থালা’। কানা উঁচু বিরাট থালা ‘রাজভোগ’। কানার চার দিক অর্থাৎ বর্ডারে ছোট ছোট ঢেউ, ‘চিলমারি’।

 

এক সময়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসত চিনে রাং (রাং ঝাল নয়)। এই ধাতুর ভাগ, দস্তা দু’কেজির সঙ্গে সাতাশ কেজি তামা। ভরনের পাত্রে থাকত দস্তা ৪৭ শতাংশ এবং তামা ৫৩ শতাংশ। পিতলে, দস্তা ৪০ শতাংশ এবং তামা ৬০ শতাংশ মিশিয়েই একচেটিয়া নাম করেছিল খড়ারের শিল্পীগণ। এখনকার যুগে এর ব্যবহার কমেছে সেটা সত্যি। এর জন্য ব্যবহারিক সমস্যাও কিছু রয়েছে। পিতল কাঁসার পাত্রকে ব্যবহারের আগে ও পরে বার বার মাজতে হয়। এমন তড়িৎ গতির যুগে সে সময় কোথায়?

 

কিন্তু ঠাকুর দেবতার জন্যে থালা বাসন মায় পাদুকা, বড় বড় মঠ মন্দিরে এখনও এর কদর রয়েছে। সে কারণেই এই কারবার শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো হবেও না। এমনটাই আশা বর্তমানের শিল্পী-ব্যবসায়ীগণ।
আশা আর আগ্রহ নিয়েই বেঁচে থাকুক ঐতিহ্যময় খড়ারের ঐতিহ্যবাহী বাসন শিল্প।

Related Articles

Back to top button