সাবড়াকোনিয়া
অরবিন্দ অধিকারী
“The goal of life is to make your heartbeat match the beat of the universe, to match your nature with nature”. প্রকৃতির ঘনঘটায় প্রতিটি জীবন তার নিজস্ব অবলম্বনের স্বাদ
উভয় দিক হতেই নিয়ে চলেছে যুগযুগান্তর ধরে। প্রকৃতি মানুষকে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে অনেকটাই সমতা বজায় রেখে চলেছে কারণ তারা নিজেরাও বুঝে এবং জানে প্রকৃতি কখনো বেইমানি করে না। হয়তো সামরিক ভারসাম্যহীনতায় কিছুটা টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবকিছুতেই সমতা বজায় রেখে গোটা পৃথিবী কে গোটা—— মহাবিশ্বকে সম্যকভাবে নিয়ে চলেছে যুগযুগান্তর ধরে।
প্রায় 20- 30 বছর আগে জুলাই -অগাস্ট মাসের গভীররাত, সম্ভবত রাত্রি 2:30 অথবা 3 টা অনেকেরই মশারির দড়ি খুলে গেল অজান্তেই ঘুমের ঘোরে অলৌকিক ভাবে, সঙ্গে অসম্ভব চিৎকার মানুষ এবং মানুষের মধ্যবর্তী অমানুষের গলার স্বরে আবার কেউ কেউ বলে বাগ- হানিফ- মৃণালের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের জংলিপনাতে।
এইরকম মশারি দড়ি খুলে চলেছে প্রায় দু-তিন মাস ধরে, অবশেষে ধরা পড়ে গেল “বাগ” মশারির জালে, আবার কাউকে জল ছিটিয়ে দেয়া হচ্ছে গভীর রাতে, আবার কাউকে প্রতীকী নাম ধরে পাগল করে দেয়া হচ্ছে আবার কাউকে রাত দুটোর সময় “উপর তলার লোক” সুরে গান করতে হচ্ছে জবরদস্তি রুমে রুমে কিশোরকুমারের কণ্ঠস্বরে সঙ্গে রোমান ড্যান্স ফ্রী ।কেউ বুঝতেই পারছেনা কিভাবে কেটে যাচ্ছে কুমড়োর তরকারি- ডাল -ডিমের কারির দৈনন্দিন জীবনে। জীবন কেটে চলেছে হঠাৎ রাত্রি 12 টার সময় 100 জনের প্রচন্ড চিৎকার সাপ বেরিয়েছে সাপ বেরিয়েছে বলে, সবাই হ্যারিকেন লাঠি তাড়া নিয়ে গোটা অন্ধকার জঙ্গলের মাঝখানে সুসজ্জিত পাথরের দেওয়ালের মধ্যে, মনে হল আমাজনের আদিবাসীদের শিকার ধরার দৃশ্য। কুমার কৌশিকের কথা না বললেই নয়, সমস্ত দিকেই সমতা বজায় রেখে চলেছে তবলার আওয়াজ, গানের সুর, সিগারেটের ধোঁয়া, রামুর চায়ের সঙ্গে, কারো সাথে কোনো বিরোধ নেই, তবে বিরোধের চোরাস্রোতে হাত মেলাতে ব্যস্ত হাসিমুখে অনেকটা বামপন্থীদের মত করে। গঙ্গা পেরিয়ে মৃণাল এসেছে কী জানি কী উদ্দেশ্যে? তবে অনেকটা চিরস্থায়ী যাযাবরের মতো। মনে হত এর ঘরবাড়ি কান্দি- বহরমপুর এর গঙ্গায় হয়তো তলিয়ে গেছে, কি জানি মনে হতো পুরোটাই রহস্য, একা একা সারাবছর হানিফকে সঙ্গে করে মনের দুঃখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাসিমুখে যদিও মামা অন্তপ্রাণ। জীবন ও জীবিকার বাজি রেখে সমীর দার মত অনেকেই ,আলু- পটলের হিসাব করতে করতে এসে পৌঁছে গেছে এবং সকলের প্রতি কমান্ডিং ভয়েসে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে এবং মেনেও নিচ্ছে সকলে অধ্যক্ষ থেকে রাধুনী অব্দি। এইভাবে চলতে থাকলেই হয়তো ভাল হত ।365 দিনের শেষ লগ্নে নতুন আবির্ভাবে দেখা গেল নিলু- শ্যামা অবতার কে ,এরা মনে হয় অবতার সেজেই লুকিয়ে ছিল কামালের পরামর্শে। বিনা টিকিটের যাত্রী সেজে অনেকেই পিয়ারডোবায় নেমেছে “এই পথ যদি না শেষ হয়” পথের আঁকাবাঁকা পথে সোজা জঙ্গল সুন্দরী শ্বেতপাথরের ছায়ায় । চারিদিকে ঘন জঙ্গল মাঝখানের ছাতিম ছায়ায় কঠিন পথ ধরে, দুই পীযুষের বড় হওয়ার অদম্য নিঠুর ইচ্ছায়।অমল আছে তবে দই না নিয়ে, জয়দেবের টেরাকোটার আড়ালে। মেয়েলি কন্ঠে কৌশিকের আস্ফালন জয়চন্ডী শিখরে। তুহিন লোকাল অভিভাবক, কিন্তু দিনে জঙ্গলে আর রাত্রে মায়ের ছত্র তলে বেশ ভালই আছে ভরা বৃষ্টিতে রাজহাঁসের মত।গভীর রাতে সকলেই চঞ্চল কিন্তু ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় ” মুক্তিরও মন্দিরও সোপানও তলে কত প্রাণ হলো বলিদান “বলতে বলতে জীবন চলেছে 365 এর শেষের দিকে। কিছু ঘটনা ঘনঘটার মধ্য দিয়ে। রাজেশ, সমীর, সুমিত,মোহন ও রায়পুরের সুপ্রিয়েরা সকলেই আবার শম্ভুর কাছে পরামর্শে ব্যস্ত কিভাবে ভালো না হওয়া যায়। তবে রাজেশের তোতলামিতে স্পষ্ট সে মিথ্যা বলছে। দু পন্ডার সমঝোতা দুর্দান্ত অনেকটা পৌষ মাসের পিঠে খাওয়ার মত। অবশ্যই পার্থ এবং জয়দেব চিরশ্রোতা ।কফি হাউসের সেই আড্ডাটার মত “রমা রায়ের” ভূমিকায় মানবেন্দ্র ওরফে মানুদা। এভাবেই চলছে প্রতিষ্ঠানগুলি ভোর থেকে রাত থেকে পরের ভোর।
এরপর জঙ্গলে আগুন লেগে যাওয়া স্বপ্নপুরী সাবড়াকোন কে মনে হতো বসন্তের অপরাহ্ণের কৃষ্ণচূড়া কে।
দক্ষিণ বাঁকুড়ার সাবড়াকোন মনে হয় আজও অবহেলিত, জঙ্গল ঘেরা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আজও উপস্থিতি, গুণমান, নৈপুণ্যে যেন টান পড়েছে । কারোরই নজর পড়ছে না কারণ কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে চলে যাবার সময় এই স্বপ্ন সুন্দরীকে জঙ্গল ঢেকে দিয়েছে অদেখার তালে। শালতোড়া- আমডাঙ্গা- সাতমৌলি এই তিনটি অঞ্চলের মল্ল রাজার মন্দির ও শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ জিওর 27 টি গ্রাম সম্মিলিতভাবে এই অঞ্চল গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের লালবাগ, কুমড়ো, ঘন জঙ্গল, মনসা পূজো জনমানুষে আলোড়ন সৃষ্টি করে রেখেছে। ছাতিম গাছের ছায়ায় ফুলের সুবাস সবসময় সারাক্ষন সুন্দরী কে মনে করিয়ে দেয়। কয়েকশো বছর ধরে এই স্বপ্ন সুন্দরী কে ঢেকে রেখেছে শান্ত স্নিগ্ধ বসুন্ধরায় পরিণত করে রেখেছে এদের শত্রু মনে হয় কয়েক শতকেও জন্মগ্রহণ করবে না কারণ এরাই প্রকৃত সুন্দরী যা মনকে কে অচঞ্চল করে দেয়।
শোনা যায় 1765 খ্রিস্টাব্দে দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মল্লভূম অঞ্চলের দেওয়ানী আদায়ের অনুমতি পায়। হয়তো এইসময় থেকেই সারা অঞ্চলের ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। 1765 থেকে 1947 এ ব্রিটিশ শাসনের সুদীর্ঘ সময় নীলকুঠি এবং পিয়ারডোবা এরোড্রাম আজও দৃষ্টান্ত স্বরূপ। এরোড্রাম টি এ সময় আরো সুসজ্জিত প্রতীকী নিদর্শন রূপে তুলে ধরা যেত ,হয়তো হবে কিন্তু সারাক্ষণ এরা আজও জেগে আছে সেই প্রতীক্ষায় অধীর ভাবনায়। এখানে প্রচুর পরিমাণে নীল চাষ হতো বিশেষ করে মান্ডি ,সাতমৌলি, ঘোলা এই সমস্ত অঞ্চলে এবং স্থানীয়দের
তদারকিতে এই নীল চাষ হতো এবং ইংরেজ আমলের নীল উৎপাদনের বড় ভূমিকা ছিল এ অঞ্চলের এবং নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের কথা স্থানীয়দের মুখে এখনো শোনা যায়। নীল বিদ্রোহের কিছুটা ছোঁয়া এইসব অঞ্চলে ভালই পড়েছিল। কিন্তু নীলকর সাহেবদের প্রতি প্রচন্ড ভয়ে বিক্ষুব্ধরা দানা বাঁধেনি বা বাঁধতে পারেনি। নীলকর সাহেবদের সাধারণ স্থানীয় কৃষিজীবীদের প্রতি অত্যাচার প্রায় কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে। এর দৃষ্টান্ত স্বরূপ নীলকুঠিতে কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জি কে হত্যা করেন ইংরেজরা। ইহা একটি নীল বিদ্রোহের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 1900 সালের কাছাকাছি এসব নীলকুঠি বন্ধ হয়ে যায়। 1920 সালের পর স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পিয়ারডোবা সংলগ্ন গ্রামার বনিতে ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটি গড়ে ওঠে যা পিয়ারডোবা এরোড্রাম নামে পরিচিত।B -69 বোমারু বিমান অবতরণ করতো নিয়মিতভাবে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রাক্কালে সবড়াকোন অঞ্চলে সাজো সাজো রব পড়ে যায়। বিমান ওঠানামা ইংরেজদের বুটের আওয়াজে গমগম করে সারা দিনরাত। স্থানীয়দের কাজে লাগানো থেকে অত্যাচার পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গদের উৎপাত ক্রমশ খুব বেড়ে গিয়েছিল। 1945 সালে পিয়ারডোবা বিমানবন্দরকে সিংহলে স্থানান্তরিত করা হয় এবং 1945 সালের 26 শে সেপ্টেম্বর পিয়ারডোবা এরোড্রাম কে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বদেশী
আন্দোলনেও সাবড়াকনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, পিয়ার ডোবা প্রভৃতি অঞ্চলের বেশ কিছু মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের গুপ্তচরের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে শিশু মন্ডল ব্রিটিশদের নজরে চলে আসে। স্বাধীনতা লাভের পর সাবড়াকোন অঞ্চলের জঙ্গল অধ্যুষিত এলাকার বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ছাড়া ।যারা প্রথম থেকে আজও এক কংক্রিটের একই রঙের, এক ছাতিমতলায় একই শাল গাছের বেড়ে আবদ্ধ হয়ে আছে।
দক্ষিণ বাঁকুড়ার অনাদরে 27 পাড়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডটি আজও একই রকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য জনপদের চাপেও। এ অঞ্চলের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ জিওর রাস মঞ্চ মাঘী পূর্ণিমা তে আজও রাসলীলায় ব্যস্ত । নিয়মিত রাস মেলা অনুষ্ঠিত হয় কয়েক শতক ধরে। সর্বোপরি দক্ষিণ বাঁকুড়ার মানচিত্রে পিয়ারডোবা সাবরাকোন সংলগ্ন জঙ্গল সুন্দরী শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ রাস মঞ্চ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উত্তম-সুচিত্রার “পথ শেষ না হওয়ার” গল্প আজও জনমানুষের আম কাঁঠালের গন্ধে ছাতিমতলা নীরবতা পালন করে বসে আছে। প্রতীক্ষার অবসান হয়তো একদিন হবে সেই দিন, যেদিন এই জঙ্গল সুন্দরী জনমানুষকে জাগ্রত করে এগিয়ে আনবে পর্যটক এর নিয়মিত অসমাপ্তির আগমনে। প্রত্যয় অথবা নিরবে এগিয়ে চলা থেকে প্রায় মুছে যাওয়া এই 27 পাড়া প্রতীক্ষায় রয়েছে তবুও বলতে হয় “look deep into nature and then you will understand everything better”.

